ইসলামে তাকদীর ও মানব কর্মের স্বাধীনতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা।
Faith and Belief · Hanafi
Question
এমন সময় তাকদীর তার ওপর প্রাধান্য লাভ করে আর তখন সে জান্নাতীদের 'আমল করা শুরু করে দেয়। ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করে।
এই হাদিস অনুযায়ী,যদি কোন ব্যক্তি সারা জীবন জান্নাতিদের মত আমল করে কিন্তু তাকদির এর উপর প্রাধান্য পেয়ে সে লোক এমন কাজ করে ফেলে তাহলে জাহান্নামী হবে।এদিকে তো তাকদিরে ছিল বলে সে জাহান্নামী হল সে তো সারাজীবন ভাল কাজ করল তাহলে সেই ভাল কাজের কোন মূল্য নেই?আর সে তো তাকদিরের জন্য জাহান্নামী হল তাহলে তার দোষ কি?
আরেকটা প্রশ্ন:আমরা যা করি আল্লাহর ইচ্ছায় করি কিন্তু সব কাজ আল্লাহর ইচ্ছায় করলেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করিনা সেগুলোর জন্য আমাদের গুনাহ হয়।যেহেতু সব কাজ আল্লাহর ইচ্ছাতেই হয় তাহলে আমি যদি আল্লাহর অন্তুষ্টি হবে এমন কোন কাজ করেও থাকি সেটা তো আল্লাহর ইচ্ছাতেই করেছি।তাহলে আমার গুনাহ কেন হবে?
আমি অবিশ্বাসী নই।ক্লাস করার পর থেকে এসব প্রশ্ন আমাকে পীড়া দিচ্ছে তাই বুঝার জন্য প্রশ্ন করা।আল্লাহুম্মাগফিরলি
Answer
তাকদীর ও মানব কর্মের স্বাধীনতা সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর
প্রথম প্রশ্নের উত্তর
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসটি সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। এই হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:
হাদিসের ব্যাখ্যা
এই হাদিসটি তাকদীরের রহস্য বোঝানোর জন্য নয়, বরং মানুষকে সতর্ক করার জন্য যে কেউ যেন নিজের আমলের উপর নির্ভর না করে বরং আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা রাখে। হাদিসটির তাৎপর্য:
১. চূড়ান্ত অবস্থা বিবেচ্য: হাদিসটি শিক্ষা দেয় যে, মানুষের জন্য চূড়ান্ত অবস্থা (খাতিমা) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ সারা জীবন ভাল কাজ করলেও যদি শেষ মুহূর্তে তার ঈমান নষ্ট হয়, তবে তার পূর্বের ভাল কাজগুলো তার কোনো কাজে আসবে না।
২. তাকদীর মানে জবরদস্তি নয়: ইসলামের দৃষ্টিতে তাকদীর মানে এই নয় যে মানুষ তার কাজের জন্য দায়ী নয়। বরং তাকদীর হলো আল্লাহর চিরন্তন জ্ঞান, যা তিনি তার অসীম জ্ঞানের ভিত্তিতে লিখে রেখেছেন। আল্লাহ জানেন মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছা দিয়ে কী করবে।
ইমামদের ব্যাখ্যা
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী ফাতহুল বারীতে লিখেছেন:
"এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে, মানুষ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক কোনো কাজ করে। বরং এর অর্থ হলো, আল্লাহ তার অসীম জ্ঞানের ভিত্তিতে জানেন যে, অমুক ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত কী করবে। আর সেই জ্ঞান অনুযায়ী তার তাকদীর লিখিত আছে।" (ফাতহুল বারী, ১১/৪৯৪)
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া বলেন:
"তাকদীরের উপর ঈমান আনা ফরজ, কিন্তু তাকদীরকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা জায়েয নয়।" (মাজমুয়াতুল ফাতাওয়া, ৮/৮৫)
ভাল কাজের মূল্য
হাদিসে বর্ণিত ব্যক্তিটি সারা জীবন ভাল কাজ করে থাকলে তার ভাল কাজের মূল্য কি হবে?
- তার ভাল কাজের জন্য সে দুনিয়াতে পুরস্কৃত হবে (সুস্থতা, রিজিক, মান-সম্মান ইত্যাদি)
- কিন্তু জান্নাত লাভের জন্য প্রয়োজন চূড়ান্ত অবস্থায় ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করা
- সুতরাং, ভাল কাজের মূল্য এই নয় যে, তা automatically জান্নাত নিশ্চিত করে
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর
আল্লাহর ইচ্ছা ও মানুষের দায়িত্ব
আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর ইচ্ছা দুই প্রকার:
১. কওনী ইচ্ছা (সৃষ্টিগত ইচ্ছা) : এটি আল্লাহর সেই ইচ্ছা যা দ্বারা সবকিছু ঘটে। ভালো-মন্দ সবকিছুই আল্লাহর এই ইচ্ছাতেই ঘটে।
২. শারঈ ইচ্ছা (বিধানগত ইচ্ছা) : এটি আল্লাহর সেই ইচ্ছা যা তিনি পছন্দ করেন এবং আদেশ করেন। যেমন, নামাজ পড়া, জাকাত দেওয়া ইত্যাদি।
কুরআনে বলা হয়েছে:
"আর আল্লাহ তোমাদের জন্য যা ইচ্ছা করেন, তা ছাড়া তোমরা ইচ্ছা করতে পার না।" (সূরা আত-তাকবীর: ২৯)
ইমাম তাহাবী《আল-আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ》
"আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো কিছুই হয় না, কিন্তু তিনি ভালো কাজ পছন্দ করেন এবং মন্দ কাজ অপছন্দ করেন। মানুষ তার কাজের জন্য দায়ী।"
দোষী হওয়ার কারণ
যদিও সবকিছু আল্লাহর কওনী ইচ্ছাতেই ঘটে, তথাপি মানুষ তার কাজের জন্য দোষী হয়, কারণ:
১. মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আছে: আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছা ও ক্ষমতা দিয়েছেন। মানুষ ইচ্ছা করলে ভালো কাজ করতে পারে, ইচ্ছা করলে মন্দ কাজ করতে পারে।
২. শারঈ ইচ্ছার বিপরীতে কাজ: যখন মানুষ আল্লাহর শারঈ ইচ্ছার (যা তিনি পছন্দ করেন ও আদেশ করেন) বিপরীতে কাজ করে, তখন সে গুনাহগার হয়।
৩. অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"প্রত্যেক মানুষই জান্নাতে বা জাহান্নামে যাওয়ার জন্য সহজ পথ পায়।" (সহীহ বুখারী, ৬৫৯৬)
উপসংহার
১. তাকদীরের উপর ঈমান আনা ফরজ, কিন্তু তাকদীরকে অজুহাত বানানো জায়েয নয়।
২. মানুষ তার কাজের জন্য পুরোপুরি দায়ী। ভাল কাজের জন্য সওয়াব, মন্দ কাজের জন্য গুনাহ।
৩. আল্লাহর কওনী ইচ্ছায় সবকিছু ঘটলেও, মানুষের শারঈ দায়িত্ব রয়েছে।
৪. চূড়ান্ত অবস্থা (খাতিমা) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই সবসময় আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করা উচিত।
আল্লাহুম্মাগফিরলি - আপনি শেষে যে দোয়াটি করেছেন, সেটিই সঠিক পথ। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং তাঁর রহমতের উপর ভরসা রাখুন।