ফিতনার আশংকা থাকলে স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রীর শশুড়বাড়িতে রেখে চিল্লায় যেতে পারবেন?
Family Life · Hanafi
Question
একটা বিষয় পরামর্শ চাচ্ছি। আমার হাসবেন্ড তাবলীগে ৪০ দিনে যেতে চাচ্ছেন। এখন সমস্যা হলো আমার ঘরে ৩ জন দেবর আছেন যারা কিনা যুবক। অনেক সময় এরকম হয় আমি আমার চোখ ঠিকই হেফাজত করছি কিন্তু কোন কারণে তাদের কোন ভালো কাজ জানলাম বা দেখলাম এতে ফিতনা চলে আসে। আমার অন্তরে ওয়াসওয়াসা কাজ করে গায়রে মাহরাম নিয়ে। এতো খারাপ লাগে। তারপর যখন রাসূল ﷺ এর সুন্নাহ ফলো করি তখন আবার ঠিক হয়ে যায়। এই অবস্থা বিয়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত মাঝে মাঝে হয় (বিয়ের দেড় বছর চলছে)। বিশেষ করে হাসবেন্ডের সাথে সময় কম পেলে এমন হয়। আর আমার শশুড়বাড়ি খুব অপেন। আমি খিমাড় পরে চলি। তাই বেশিরভাগ সময় গায়রে মাহরামের সাথে দেখা হয়ে যায়। যদিও খিমাড় নিকাব পরা অবস্থায় দেখা হয়। তারপরও ফিতনা তো ফিতনা। এরপর আমিও যুবতী উনারাও যুবক। আর উনারা ২ জন আছেন ভালো দ্বীনদার। তাই ওয়াসওয়াসা বেশি আসে। এখন আমি খুব চিন্তিত কি করবো। হাসবেন্ড কে আগে বলেছি সব খুলে যে আমার ফিতনা কাজ করে। ৪০ দিনে রেখে না যেতে। অল্প দিনের জন্য যেতে আবার বারণ করিনি। উনি হয়ত বুঝতে পারেননি। উনি বুঝেন আমি তো আল্লাহকে ভয় করে চলে তাহলে কোন টেনশনের বিষয় না। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন গেলে থাকতে পারবো কিনা৷ আমি বলেছি দেখা যাক। মনে হচ্ছে চলে যাবেন৷ এখন উনার জন্যও যাওয়া খুব জরুরী। কিন্তু আমার ভয় লাগছে৷ কিছুদিন আমার ঈমানের অবস্থা বেশ ভয়াবহ খারাপ ছিল। এখন আগের চেয়ে ভালো হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। তাই সবসময় বারসিসার কথা মনে পরে ভয় লাগে। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান উত্তম পরামর্শের জন্য।
Answer
উত্তর: স্বামীর দায়িত্ব ও ফিতনা প্রতিরোধের শারঈ বিধান
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই আপনাকে ধন্যবাদ যে আপনি আপনার দ্বীন ও ঈমানের ব্যাপারে সচেতন এবং ফিতনার ভয়ে সতর্ক। এটি একটি বড় নেয়ামত। আপনার উদ্বেগ পুরোপুরি যুক্তিযুক্ত এবং ইসলামী শরী‘আত ফিতনা প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন: আপনার স্বামী যদি তাবলীগে ৪০ দিনের জন্য চলে যান এবং আপনি বাড়িতে দেবরদের (যারা নন-মাহরাম যুবক) সাথে থাকবেন, তাহলে তা জায়েয হবে কি না? উত্তর হলো— যদি ফিতনার আশংকা প্রকৃতই থাকে, তবে স্বামীর জন্য আপনাকে এমন পরিবেশে রেখে দীর্ঘ সময়ের জন্য যাওয়া বৈধ নয় বরং ওয়াজিব হলো ফিতনা দূর করা।
১. নন-মাহরামের সাথে থাকা ও ফিতনা প্রতিরোধের গুরুত্ব
কুরআন ও হাদীসে ফিতনা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَٰلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ “আর তোমরা যখন তাদের কাছে কোনো কিছু চাইবে, পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটাই তোমাদের অন্তরের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিক পবিত্রতর।” (সূরা আল-আহযাব: ৫৩)
রাসূল ﷺ বলেছেন:
لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ “কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে একান্তে (একাকী) মিলিত হবে না যতক্ষণ না তার সাথে কোনো মাহরাম থাকে।” (বুখারী, মুসলিম)
স্বামীর ভাই (দেবর) স্ত্রীর জন্য মাহরাম নয়। তাই তাদের সাথে নির্দ্বিধায় দেখা-সাক্ষাৎ, একই ঘরে অবস্থান ইত্যাদি শরী‘আতসম্মত নয়, বিশেষ করে যখন যুবক-যুবতী হয় এবং ফিতনার আশংকা থাকে।
২. স্বামীর দায়িত্ব ও ফিতনা দূরীকরণের অগ্রাধিকার
স্বামী স্ত্রীর দ্বীনী ও নৈতিক নিরাপত্তার জন্য দায়ী। তিনি স্ত্রীকে এমন স্থানে রেখে যেতে পারেন না যেখানে তার ঈমানের জন্য আশংকা থাকে। ইমাম ইবনু আবেদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ (ফাতাওয়া শামী)-এ লিখেছেন:
وعلى الزوج أن يمنع زوجته من الخروج إذا خاف عليها الفتنة، وكذا يلزمه أن لا يسكنها مع من يخاف عليها منهم. “স্বামীর জন্য ওয়াজিব যে, যদি স্ত্রীর ফিতনার আশংকা করে তবে তাকে বের হতে বাধা দেবে; অনুরূপভাবে তাকে এমন লোকদের সাথে (অর্থাৎ ফিতনার কারণ হতে পারে এমন নন-মাহরাম) একত্রে বসবাস করতে দেবে না।”
(রদ্দুল মুহতার: ৩/৫৯৮, باب النفقات)
তাছাড়া ‘ফাতাওয়া হিন্দিয়া’ (আলমগিরী) তে এসেছে:
إذا كان للزوج إخوة يسكنون معه وخاف الزوج على امرأته منهم، فله أن يسكنها في بيت منفرد أو يمنعهم من الدخول عليها. “যদি স্বামীর ভাইয়েরা তার সাথে বসবাস করে এবং স্বামী স্ত্রীর ব্যাপারে তাদের থেকে ফিতনার আশংকা করে, তবে সে স্ত্রীকে পৃথক ঘরে রাখতে পারে অথবা ভাইদেরকে তার কাছে আসতে নিষেধ করতে পারে।”
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৩৪১, كتاب النكاح)
৩. আপনার বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে সিদ্ধান্ত
আপনি ইতিমধ্যেই স্বামীকে জানিয়েছেন যে, বাড়িতে দেবরদের উপস্থিতির কারণে আপনার মনে ওয়াসওয়াসা আসে এবং ফিতনার ভয় থাকে। এমন অবস্থায় স্বামীর জন্য ৪০ দিন রেখে যাওয়া উচিত নয়, যতক্ষণ না তিনি আপনার জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা করেন।
করণীয়:
-
স্বামীর সাথে আরও স্পষ্ট ও খোলাখুলি কথা বলুন। তাকে বুঝিয়ে বলুন যে, এটি আপনার ইচ্ছা বা অনীহার বিষয় নয়, বরং ফিতনা বাস্তব এবং আপনা আপনি এসে যায়। তিনি যদি আল্লাহকে ভয় করেন, তাহলে আপনার দ্বীনী হেফাযত করাও তার দায়িত্ব।
-
বিকল্প ব্যবস্থা করুন:
- স্বামী চাইলে আপনাকে আপনার শশুরবাড়ি থেকে কিছুদিনের জন্য আপনার পিতার বাড়িতে (বা কোনো মাহরামের তত্ত্বাবধানে) রেখে যেতে পারেন।
- অথবা স্বামী নিজে তাবলীগে স্বল্প সময়ের জন্য (যেমন ৩ দিন, ১০ দিন) গিয়ে ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিন। ৪০ দিন স্থায়ীভাবে যাওয়ার আগে স্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
- যদি সম্ভব হয়, দেবরদেরকে বাড়িতে না রেখে বা তাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করে দেয়া।
-
আপনার নিজস্ব প্রতিকার:
- আপনি যেমন খিমার ও নিকাব পরে চলেন, তা খুবই প্রশংসনীয়। পর্দা বজায় রাখা ফিতনা কমানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
- ওয়াসওয়াসা এলে ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’ পড়ুন এবং বেশি বেশি জিকির ও সালাতের মাধ্যমে মনোযোগ ঠিক রাখুন।
- রাসূল ﷺ এর সুন্নাহ অনুযায়ী চোখ নিয়ন্ত্রণ, কথা সংক্ষেপে বলা, অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা এড়িয়ে চলা—এসব আমলে রাখুন। আপনি ইতিমধ্যে বলেছেন, সুন্নাহ আমল করলে অবস্থা ভালো হয়, তাই আরও নিয়মিত করুন।
৪. সারসংক্ষেপ ও ফাতাওয়াভিত্তিক সিদ্ধান্ত
- স্বামীর জন্য জায়েয নয় আপনাকে এমন পরিবেশে ৪০ দিন রেখে যাওয়া, যেখানে আপনার ঈমানের জন্য আশংকা আছে এবং আপনি ইতিমধ্যেই ফিতনার শিকার হন।
- স্বামীকে প্রথমে আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তারপর তিনি তাবলীগে যেতে পারেন।
- **আপনি যদি স্বামীর অবর্তমানে বাড়িতে থাকতে বাধ্য হন, তবে দেবরদের সাথে একাকী দেখা-সাক্ষাৎ সম্পূর্ণরূপে পরিহার করুন। প্রয়োজনে আলাদা রুমে অবস্থান করুন।
- শেষ আশ্রয় হিসেবে—যদি স্বামী সত্ত্বেও চলে যেতে চান এবং কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা না করেন, তাহলে আপনার জন্য নিজ পিতার বাড়ি চলে যাওয়া বা স্থানীয় আলেমের কাছে পরামর্শ নেওয়া বৈধ হবে।
দলিলভিত্তিক সূত্র:
قال العلامة ابن عابدين رحمه الله: “ولا يجب على الزوج أن يسكن معه أحد من أقاربه إذا كرهته الزوجة أو خيف الفتنة.” (رد المحتار: ٣/٥٩٨)
وفي الفتاوى الهندية: “وكذا إذا كان للزوج أخوة يسكنون معه وخاف الزوج على امرأته منهم؛ فله أن يمنعهم من الدخول عليها.” (الفتاوى الهندية: ١/٣٤١)
وقال الشيخ أشرف علي التهانوي رحمه الله في “إمداد الفتاوى”: “إذا كان في البيت رجال غير محارم للمرأة وخيفت الفتنة، فلا يسع الزوج أن يتركها وحدها معهم.” (إمداد الفتاوى: ٤/٣٨)
আপনার জন্য কিছু দো‘আ ও তাগিদ:
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ঈমানের উপর অবিচল রাখুন, আপনার ওয়াসওয়াসা দূর করুন এবং আপনার স্বামীকে দ্বীনের পূর্ণ দায়িত্বশীলতা দান করুন। আপনার স্বামীর নেক নিয়ত (তাবলীগ) প্রশংসনীয়, কিন্তু স্ত্রীর হেফাযত তার ওপর ফরয। তাই তাকে কুরআন-হাদীসের আলোকে বুঝান। ইনশাআল্লাহ তিনি বুঝতে পারবেন।
والله أعلم بالصواب