যিনার ফলে গর্ভধারণ হয়েছে এখন এটাকে ওষুধের মাধ্যমে নষ্ট করে বিয়ে করা যাবে??

Family Life · Hanafi

Question No: 2960
Questioner: Ish Mamun
Question Asked: 21 Jul 2026, 02:58 PM
Reviewed & Published: 21 Jul 2026, 03:10 PM
Views: 33
Tokens: 9,091
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি আল মামুন রশিদ।। আমার এক বন্ধু নাম সোহরাব।। সে অনার্স তৃতীয় বর্ষের স্টুডেন্ট। কলেজ লাইফ চলাকালীন বিগত সাত মাসের বেশি সময় ধরে সে একটা মেয়ের সাথে হারাম প্রেমে জড়িত।। মেয়েও তার সাথে অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ে।। লজ্জা ও আফসোসের সাথে বলছি তারা দুজনে গত ৩৬ দিন আগে অবৈধ শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে(আস্তাগফিরুল্লাহ)..
গত তিনদিন ধরে মেয়ের শারীরিক অবস্থা গর্ভধারণের মত সিমটম দেখা দিলে প্রেগনেন্সি টেস্ট করে আজকে জানতে পারে মেয়ে গর্ভবতী। । এমত অবস্থায় তারা দুজনে ভীত, লজ্জিত ও এর উত্তম সমাধান খুজছে।। তাদের দুজনের ফ্যামিলিতে বিয়ের বিষয়ে কথা বললে বিয়ে নিয়ে ঝামেলা করলেও পরবর্তীতে বিয়ে দিবে এটা তাদের দুজনের বিশ্বাস। কিন্তু এই অবস্থা বাসায় জানালে তাদের ফ্যামিলি মানবেই না, সেই সাথে সামাজিক, পারিবারিক ভাবে বাচ্চা নিয়ে নানা রকম হ্যারেজমেন্ট এর শিকার হতে পারে।। সেই সাথে বাচ্চাকে দুনিয়াতে আনার মত সামর্থ্য তাদের নাই আর্থিকভাবে। ।আর বাচ্চা নষ্ট করা তো হত্যা।। এখন তাদের প্রশ্ন হচ্ছে এই অবস্থায় তারা দুজনেই বিয়ে করলে কিন্তু গর্ভের এই ভ্রুণকে নষ্ট করলে এটা কি তা হত্যা হবে?
নাকি এ অবস্থায় কোনভাবেই নষ্ট করা যাবে না, বিয়ে করে বাচ্চাকে দুনিয়ার আলো দেখার ব্যবস্থা করতে হবে।। তারা এই মুহূর্তে বিয়ে করতে চাচ্ছে কিন্তু পেটের এই ভ্রণকে বাচ্চা জন্মদান করলে, এতে তাদের পারিবারিকভাবে মানসম্মান নষ্ট হবে, পরিবার তাদেরকে মেনে নিবে না, সে সাথে সমাজ ও আশপাশের সবার কাছে সারা জীবন এই বাচ্চা একটা খারাপ পরিচয় বহন করবে,অবৈধ বাচ্চা বলবে ।। অনুগ্রহপূর্বক জানাবেন এখন তাদের জন্য কোনটা করণীয় হবে? ?
যেহেতু ভ্রুণের বয়স ৩৬ দিনের মতো, তারা চাচ্ছে এটাকে ওষুধের মাধ্যমে ঠিক করতে, , এরপর বাসায় বলে এটাকে গোপন রেখে বিয়ে করতে তারপর নতুন করে বিয়ে বাচ্চা নিতে। । এটা করা কি নাজায়েজ হবে??

Answer

উত্তর প্রদানে সম্মানিত আলেমগণ বলেছেন:

প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, আপনাদের বন্ধু ও তার সঙ্গিনী জিনা (অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক) করে গর্ভবতী হয়েছেন। বর্তমানে গর্ভের ভ্রূণের বয়স প্রায় ৩৬ দিন (প্রায় ৫ সপ্তাহ)। তারা এই ভ্রূণকে ওষুধের মাধ্যমে নষ্ট করে, তারপর বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছেন যাতে পরিবার ও সমাজের লজ্জা এড়ানো যায়। কিন্তু ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহের কাজ।

প্রথমত: গর্ভপাত (Abortion) এর বিধান

ইসলামী শরীয়াহতে গর্ভপাত সাধারণত হারাম। হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, গর্ভের ভ্রূণ ১২০ দিন (৪ মাস) পূর্ণ হওয়ার পর আত্মা ফুঁকানো হয় এবং এর পর গর্ভপাত করা হারাম ও হত্যার সমান। তবে ১২০ দিনের আগেও যদি কোনও বৈধ শরয়ী কারণ (যেমন মায়ের জীবন রক্ষার প্রয়োজন, বা গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা) না থাকে, তাহলে গর্ভপাত করা জায়েয নয়। এখানে মায়ের জীবন হুমকির কোনো কারণ নেই, শুধু সামাজিক লজ্জা ও আর্থিক অসামর্থ্য গর্ভপাতের বৈধ কারণ নয়।

হাদীসে এসেছে:
عن عبد اللَّهِ بن مسعود رضي اللَّه عنه قال: حدثنا رسول اللَّهِ صلى اللَّه عليه وسلم وهو الصادق المصدوق: إن أحدكم يجمع خلقه في بطن أمه أربعين يوما نطفة، ثم يكون علقة مثل ذلك، ثم يكون مضغة مثل ذلك، ثم يرسل إليه الملك فينفخ فيه الروح... (صحيح البخاري: 3208, صحيح مسلم: 2643)
অর্থ: "তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত নুতফা (শুক্রাণু) হিসেবে, পরে চল্লিশ দিন জমাট রক্ত (আলাকা) হিসেবে, পরে চল্লিশ দিন গোশতপিণ্ড (মুদগা) হিসেবে থাকে। তারপর তার কাছে ফেরেশতা প্রেরণ করা হয় এবং তাতে রূহ ফুঁকানো হয়।"

এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, ১২০ দিন পর্যন্ত ভ্রূণের আত্মা সঞ্চার হয় না। তবে তারপরও নিষিদ্ধ সময়ের আগে গর্ভপাত করা শুধুমাত্র জরুরি অবস্থায় বৈধ, যেমন ডাক্তারি কারণে মায়ের জীবন রক্ষা। সাধারণ লজ্জা বা অস্বচ্ছলতার কারণে গর্ভপাত করা জায়েয নয়। ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) বলেন:
"لا يجوز إسقاط الحمل بعد نفخ الروح إجماعا، وقبل نفخ الروح فيه خلاف، والمختار أنه لا يجوز إلا لعذر كخوف الهلاك على الأم." (رد المحتار: 6/590)
অর্থ: "রূহ ফুঁকানোর পর সর্বসম্মতিক্রমে গর্ভপাত জায়েয নয়। আর রূহ ফুঁকানোর আগেও এটি জায়েয নয়, তবে মায়ের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকলে জায়েয।"

অতএব, শুধুমাত্র সামাজিক লজ্জা বা আর্থিক অসামর্থ্যের কারণে গর্ভপাত করা নাজায়েজ ও কবীরা গুনাহ। এটি একটি নিরপরাধ প্রাণ হত্যার শামিল।

দ্বিতীয়ত: জিনার পর তওবা ও বিয়ে

তারা উভয়ের উচিত এখনই তওবা করা (আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা) এবং আর কখনও এ গুনাহ না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা। অতঃপর তারা যদি ইচ্ছা করেন, তাহলে উভয় পরিবারের সম্মতি নিয়ে (যদি সম্ভব হয়) বা ওলী (অভিভাবক) ব্যতীত নিজেরাও বিবাহ পড়িয়ে নিতে পারেন, কারণ হানাফী ফিকহে কোনো নারী তার সম্মতি সহকারে নিজে নিজেই বিবাহ করতে পারেন (যদি সে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থমস্তিষ্ক হয়)। তবে উত্তম হলো পরিবারের সাথে আলোচনা করা।

বিয়ের পর সন্তানের বৈধতা:
তাদের এখনই বিয়ে করলে এই গর্ভস্থ শিশুটি যদি বিয়ে করার ছয় মাস বা তার পরে জন্মগ্রহণ করে, তাহলে ইসলামী আইন অনুসারে এটি তাদের বৈধ সন্তান হবে এবং স্বামীর সন্তান হিসেবেই গণ্য হবে। কেননা, বিয়ের পর যদি সন্তান জন্ম নেয় এবং স্বামী তা অস্বীকার না করে, তবে তা স্বামীরই সন্তান। এ সম্পর্কে হানাফী ফিকহে বিস্তারিত বর্ণনা আছে।

الهداية এ লেখা আছে:
"إذا تزوجها وهي حامل من غيره، فجاءت بولد لأقل من ستة أشهر من وقت العقد لم يثبت نسبه منه، وإن جاءت به لستة أشهر فصاعدا ثبت نسبه."
অর্থ: "যদি কোনো ব্যক্তি একজন গর্ভবতী নারীকে বিয়ে করে এবং সে যদি বিয়ের ছয় মাসের কম সময়ে সন্তান প্রসব করে, তাহলে সন্তানের বংশ স্বামীর সাথে প্রতিষ্ঠিত হবে না। আর যদি ছয় মাস বা তার বেশি সময়ে সন্তান প্রসব করে, তাহলে বংশ স্বামীর সাথেই প্রতিষ্ঠিত হবে।" (الهداية: 3/213)

আপনার বন্ধুদের ক্ষেত্রে বর্তমান গর্ভকাল প্রায় ৩৬ দিন। তারা এখন বিয়ে করলে সন্তান জন্ম দিতে প্রায় ৮ মাস লাগবে (যেহেতু স্বাভাবিক গর্ভধারণ ৯ মাস)। বিয়ের তারিখ থেকে ছয় মাসের বেশি হবে, সুতরাং সন্তানটি বৈধ গণ্য হবে।

তৃতীয়ত: করণীয়

১. তওবা ও ইস্তিগফার: গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং জোর দিয়ে বলবেন আর কখনো জিনার ধারে কাছেও যাবেন না।
২. গর্ভপাত না করা: কোনও অবস্থাতেই ভ্রূণ নষ্ট করবেন না। এটি হারাম ও হত্যার গুনাহ।
৩. উভয়ের মধ্যে বিবাহ: এখনই বিবাহ করে নিন। পরিবারকে জানান বা না জানান, তবে বিবাহ সম্পন্ন করে নেওয়া জরুরি। হানাফী ফিকহে মেয়েটির ওলী (পিতা বা অভিভাবক) ছাড়াও যদি সে সাবালিকা হয়, তাহলে সে নিজে ইজাব-কবুল করে বিবাহ করতে পারে। তবে উত্তম হলো পরিবারের সম্মতি নেওয়া, কিন্তু জরুরি অবস্থায় নিজেরাই বিবাহ করতে পারেন।
৪. সন্তানকে গ্রহণ করা: এই সন্তানকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা ও রহমত মনে করে তাকে দুনিয়ায় আনবেন। আল্লাহ তাদের রিজিক দেবেন।
৫. গোপন রেখে বিয়ে বা বাচ্চা নষ্ট করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ: তারা যা ভাবছেন—অর্থাৎ ওষুধ দিয়ে বাচ্চা নষ্ট করে তারপর বিয়ের পর নতুন বাচ্চা নেওয়া—এটি মোটেই জায়েয নয়। বর্তমান গর্ভধারণ একটি জীবিত প্রাণী, তাকে হত্যা করা জঘন্য পাপ।
৬. পরিবার ও সমাজের ভয়: পরিবার ও সমাজের ভয়ে এই হত্যাকাণ্ড করবেন না। আল্লাহই যথেষ্ট সাহায্যকারী। তাদের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখুন।

উপসংহার:

প্রশ্নকারী বন্ধুদের জন্য শরীয়তের নির্দেশ হলো: গর্ভের ভ্রূণ নষ্ট করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ, হারাম ও কবীরা গুনাহ। তারা উভয়ে বিবাহ করবেন এবং এই সন্তানকে গ্রহণ করবেন। আল্লাহর কাছে তওবা করে ভবিষ্যতে পাপ থেকে সাবধান থাকবেন।

আল্লাহু তায়ালা তাদের তওবা কবুল করুন এবং তাদের পাপ ক্ষমা করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.