রিসেলার বা দালালি করে লাভের ২০% কমিশন নেওয়া কি হালাল? প্রি-অর্ডার নেওয়ার শরয়ী বিধান কী?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: আমি এক আপুর পেজে রিসেলার হিসাবে কাজ করতে চাচ্ছি। বিক্রির লাভের ২০% আমার কমিশন। অনেক সময় প্রি-অর্ডারও নিতে হবে। এই কাজ কি আমার জন্য হালাল হবে?
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين
আপনার প্রশ্নটি দুটি মূল বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: (১) কমিশনভিত্তিক রিসেলিং এর বৈধতা, (২) প্রি-অর্ডার গ্রহণের শরয়ী বিধান। নিচে হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. কমিশনভিত্তিক রিসেলিং (বিক্রয় প্রতিনিধি বা দালালি)
ইসলামী শরিয়তে কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রির জন্য এজেন্ট বা দালাল নিযুক্ত করা এবং তার পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা জায়েয। এটিকে আরবিতে جعالة (জুআলা) বা سِمْسَارَة (সিমসারা) বলা হয়। শর্ত হলো:
- কাজটি স্পষ্ট ও বৈধ হতে হবে।
- পারিশ্রমিক নির্ধারিত হতে হবে (যেমন লাভের ২০%)।
- কাজ করার পর পারিশ্রমিক প্রাপ্য হবে।
দলিল:
-
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ﴾ (المائدة: ১)
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।" -
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ দালালির অনুমতি দিয়েছেন। (মুআত্তা মালিক: কিতাবুল বুয়ু, বাবু বিইয়ি সিমসার; তবে সনদ নিয়ে আলোচনা আছে। ইমাম বুখারি (রহ.) একে মারফু হিসেবে সহিহ বলেছেন।) ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে দালালি জায়েয এবং তা প্রচলিত প্রথা। (রদ্দুল মুহতার: ৪/৫০৪, কিতাবুল বুয়ু, বাবুল জুআলা)
-
ফতোয়ায়ে উসমানি: "দালাল বা রিসেলার হিসেবে কাজ করা জায়েয, যদি কমিশনের পরিমাণ উভয় পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারিত হয় এবং পণ্য বৈধ হয়।" (ফতোয়ায়ে উসমানি: ২/২৫৩)
সুতরাং, আপনি আপুর পেজে তার পণ্য বিক্রি করে লাভের ২০% কমিশন নেওয়া জায়েয, যদি পণ্যটি নিজেই শরীয়তসম্মত হয় (হারাম বা নাজায়েয পণ্য নয়) এবং আপনি প্রকৃতপক্ষে বিক্রির কাজ সম্পাদন করেন।
২. প্রি-অর্ডার (অগ্রিম অর্ডার) নেওয়া
প্রি-অর্ডারের ক্ষেত্রে আপনাকে নিচের বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকতে হবে:
ক. অর্ডার নেওয়ার সময় পণ্য আপনার কাছে না থাকলে:
রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন জিনিস বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন যা আপনার কাছে নেই (بيع ما ليس عندك)। (সুনান আবু দাউদ: ৩৫০৩, তিরমিজি: ১২৩২, সহিহ ইবনে হিব্বান)
অতএব, আপনি যদি কোনো পণ্যের অর্ডার নেন, তাহলে নিশ্চিত হতে হবে যে আপনি অর্ডার পাওয়ার পর সেই পণ্য সরবরাহ করতে সক্ষম (যেমন আপুর কাছে মাল মজুত আছে অথবা সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি আছে)। যদি অনিশ্চিত থাকে, তাহলে প্রি-অর্ডার নেওয়া জায়েয হবে না।
প্রাসঙ্গিক হানাফি কিতাবের উদ্ধৃতি
- রদ্দুল মুহতার (৪/৫০৪): “দালালি ও কমিশন প্রথা জায়েয, যদি তা নির্ধারিত হয় এবং কাজ সম্পাদনের পর প্রাপ্য হয়। তবে দালালকে অবশ্যই পণ্যের অবস্থা সঠিকভাবে বর্ণনা করতে হবে।”
- ইমদাদুল ফতোয়া (২/৩২৫): “গ্রাহকের কাছ থেকে অর্ডার নেওয়ার পর দালাল যদি নিজে পণ্য ক্রয় করে গ্রাহককে দেয়, তাহলে তা জায়েয। কিন্তু অর্ডার নেওয়ার সময় পণ্য নিজের মালিকানায় না থাকলে তা ‘بيع ما ليس عندك’-এর শামিল নয়, যদি দালাল স্পষ্ট বলে যে সে এত দিনের মধ্যে সরবরাহ করবে এবং তার সরবরাহের সক্ষমতা থাকে।”
- ফতোয়ায়ে উসমানি (২/২৫৭): “প্রি-অর্ডার (ইস্তিসনা) জায়েয, বর্তমান বাজার প্রচলন অনুযায়ী যদি পণ্যের বিবরণ ও সময় নির্দিষ্ট থাকে। তবে অগ্রিম মূল্য পরিশোধের শর্ত থাকলে অবশ্যই সালামের বিধান পালন করতে হবে।”
- মাআরিফুল কুরআন (৬/৬৪৫): (ইমাম মাদরাসা মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, মূল: মুফতি মুহাম্মদ শফি) অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আছে।
সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত
আপনার জন্য কাজটি হালাল হবে যদি নিচের শর্তগুলো পূরণ হয়:
- পণ্যটি বৈধ (হারাম নয়) – আপুর পেজের পণ্য যাচাই করে নিন।
- কমিশনের হার নির্ধারিত – ইতোমধ্যে তা ২০% বলে ঠিক আছে।