রবি, গ্রামীণফোন ও বিকাশে চাকরি করা জায়েজ কি না?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 1333
Questioner: Abdullah Al Noman
Question Asked: 07 Jun 2026, 02:22 PM
Reviewed & Published: 07 Jun 2026, 02:34 PM
Views: 56
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

রবি, বিকাশ, গ্রামীণফোন এ চাকরি জায়েজ কিনা

Answer

উত্তর:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين।

আপনার প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে একটি মূলনীতি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—ইসলামে উপার্জনের পবিত্রতা ও হালাল-হারামের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ
“হে মুমিনগণ! আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি তা থেকে খাও।” (সূরা বাকারা ২:১৭২)

এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ব্যতীত কিছু গ্রহণ করেন না।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০১৫)

সুতরাং চাকরি বা ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ হালাল ও পবিত্র হতে হবে। যে প্রতিষ্ঠানের মূল আয়ের উৎস সুদ (রিবা), জুয়া, মদ, অশ্লীলতা বা অন্য কোনো স্পষ্ট হারামের সাথে জড়িত, সেখানে সাধারণত চাকরি করা জায়েয নয়। তবে যদি প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হালাল হয় এবং কোনো ব্যক্তি সরাসরি হারাম কার্যক্রমে লিপ্ত না থাকে, তাহলে সেটি জায়েয হতে পারে—কিন্তু শর্তসাপেক্ষে।

এখন প্রশ্নে উল্লেখিত রবি (Robi), গ্রামীণফোন (Grameenphone) এবং বিকাশ (bKash) প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃতি ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা দরকার।


১. রবি ও গ্রামীণফোন (টেলিকম অপারেটর)

এই দুটি প্রতিষ্ঠান মূলত টেলিকমিউনিকেশন সেবা দিয়ে থাকে—ভয়েস কল, ডেটা, এসএমএস ইত্যাদি। এগুলো মৌলিকভাবে হালাল ব্যবসা। তবে এদের কিছু কিছু শাখায় বা পণ্যে হারাম উপাদান থাকতে পারে, যেমন:

  • বিমা বা ইন্সুরেন্স পণ্য: যদি কোম্পানি সুদভিত্তিক জীবনবিমা বা সাধারণ বিমা বিক্রি করে (যা জুয়া ও সুদের সম্মিলিত রূপ), তাহলে সেটি হারাম।
  • সুদভিত্তিক লোন বা ডিপোজিট: যদি গ্রাহকদের কাছ থেকে সুদের ভিত্তিতে টাকা সংগ্রহ করে বা লোন দেয় (যেমন: প্রিপেইড ব্যালেন্সের উপর সুদ দেওয়া)।
  • অশ্লীল কন্টেন্টের প্রচার: কোনো বিজ্ঞাপন বা সার্ভিসের মাধ্যমে অশ্লীলতা ছড়ানো।
  • সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ: অনেক টেলিকম কোম্পানি সরকারি সুদী বন্ডে বিনিয়োগ করে, যা রিবা (সুদ)।

তবে মূল কাজ (নেটওয়ার্ক পরিচালনা, গ্রাহক সেবা, টেকনিক্যাল সাপোর্ট) হালাল। তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে:

  • সাধারণ চাকরি (যেমন ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট, এইচআর, গ্রাহক সেবা)—যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি সরাসরি সুদী পণ্য বিক্রি বা প্রচারে লিপ্ত না হন, ততক্ষণ তা জায়েয বলে গণ্য হবে, তবে এর জন্য সতর্কতা জরুরি।
  • যে চাকরি সরাসরি হারাম পণ্যের সাথে জড়িত—যেমন ইন্সুরেন্স পণ্যের মার্কেটিং বা সুদী লোনের প্রচার—তা হারাম

(ফতোয়ায়ে উসমানী, ২/৪৫১; ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/৩৬; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫)

সতর্কতা: যদি কোম্পানির মোট আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সুদ বা অবৈধ উৎস থেকে আসে, তাহলে আলিমগণ বলেন, সেখানে চাকরি করা মাকরূহ তাহরীমী (হারামের নিকটবর্তী) হতে পারে। সুতরাং এ বিষয়ে স্থানীয় আলিমের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া ভালো।


২. বিকাশ (bKash)

বিকাশ একটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)। এটি মূলত টাকা স্থানান্তর, মোবাইল রিচার্জ, বিল পেমেন্ট, মার্চেন্ট পেমেন্ট ইত্যাদি সেবা প্রদান করে। এর বৈধতা নিয়ে হানাফী ফিকহে দুটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে:

  • প্রথম মত: বিকাশের মূল সেবা (টাকা স্থানান্তর, এজেন্ট ক্যাশ আউট ইত্যাদি) হালাল। কারণ এতে লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে বৈধ ফি নেওয়া হয়েছে এবং এটি ব্যাংকের মতো সুদভিত্তিক ঋণ দেয় না। বিকাশ নিজে কোনো সুদ দেয় না বা নেয় না। তবে গ্রাহকদের টাকা কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকে জমা থাকলে সেই ব্যাংক সুদের লেনদেনে ব্যবহার করতে পারে—এটি পরোক্ষ বিষয় এবং চাকরিজীবী এর জন্য দায়ী নয়।

  • দ্বিতীয় মত (অধিকাংশ বাংলাদেশি হানাফী আলিম): বিকাশের কিছু কিছু পণ্য সরাসরি সুদের সাথে জড়িত, যেমন ‘বিকাশ সেভিংস’ (যেখানে গ্রাহকরা টাকা জমা রেখে সুদ পান) বা ‘বিকাশ লোন’ (সুদে টাকা ধার দেওয়া)। যদি কোম্পানি এ ধরনের পণ্য পরিচালনা করে, তাহলে পুরো প্রতিষ্ঠানটিকে সুদী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সেখানে চাকরি করা হারাম

(ফতোয়ায়ে উসমানী, ২/৫২৭; ফতোয়ায়ে রহীমিয়া, ৮/২৪৭; মাআরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি, ২/২৩৪)

বর্তমান বাস্তবতা: বাংলাদেশে বিকাশ বর্তমানে ‘বিকাশ সেভিংস’ নামে একটি পণ্য চালু করেছে যা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে স্পষ্ট সুদভিত্তিক। কারণ এতে গ্রাহককে নির্দিষ্ট মুনাফা (সুদ) দেওয়া হয়। এছাড়া বিকাশ ব্যাংকগুলোর সাথে চুক্তি করে তারল্য ব্যবস্থাপনায় সুদী বিনিয়োগ করে। ফলে অধিকাংশ আধুনিক আলিমের মতে বিকাশে চাকরি করা জায়েয নয়। তবে যদি কোনো ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে সুদ-মুক্ত বিভাগে কাজ করে এবং তার কাজ সুদের লেনদেনের সাথে সম্পর্কিত না হয়, তবুও মূল প্রতিষ্ঠানকে সমর্থন করার কারণে তা মাকরূহ থাকবে।

বিশেষ উল্লেখ: মুফতি তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম বলেছেন, এমন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা জায়েয নয় যার মূল কার্যক্রম সুদের সাথে জড়িত। (ইসলাহী খুতুবাত, ২/২৩৪)


আপনার জন্য পরামর্শ:

  1. রবি/গ্রামীণফোনে চাকরি করলে নিশ্চিত হয়ে নিন যে আপনার কাজের সাথে সুদী পণ্য বা ইন্সুরেন্সের কোনো সম্পর্ক নেই। যদি সম্ভব হয়, এমন বিভাগে চাকরি করুন যেখানে মূল টেলিকম সেবা পরিচালিত হয়।
  2. যেকোনো চাকরি গ্রহণের আগে প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ আয়ের উৎস ও আপনার কাজের প্রকৃতি সম্পর্কে ভালোভাবে জানুন এবং কোনো দ্বিধা থাকলে স্থানীয় আলিমের নিকট ফতোয়া জিজ্ঞেস করুন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক দান করুন এবং হারাম থেকে দূরে রাখুন। (আমিন)

রেফারেন্সসমূহ:

  • কুরআন: সূরা বাকারা ২:১৭২, ২:২৭৫-২৭৮
  • সহীহ মুসলিম: হাদীস নং ১০১৫
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): ৬/৩৮৫, ৭/২৯০
  • ফতোয়ায়ে আলমগীরী: ৫/৩৪৩
  • ইমদাদুল ফতোয়া: ৪/৩৬, ৪/৪৮
  • ফতোয়ায়ে উসমানী: ২/৪৫১, ২/৫২৭
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি): ২/২৩৪
  • বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলি থানভি): ৭: কিতাবুল হালাল ওয়া হারাম
  • ফতোয়ায়ে রহীমিয়া: ৮/২৪৭
  • ইসলাহী খুতুবাত (মুফতি তাকি উসমানি): ২/২৩৪

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.