স্বামীর টাকায় স্ত্রী-সন্তানের হক সম্পর্কে হানাফী ফিকহের বিস্তারিত আলোচনা।

Family Life · Hanafi

Question No: 1314
Questioner: Zakiya Sultana
Question Asked: 06 Jun 2026, 09:52 PM
Reviewed & Published: 06 Jun 2026, 10:09 PM
Views: 43
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম

আমি এবং আমার স্বামী দুইজনই দ্বীনে ফেরা প্র্যাকটিসিং মুসলিম। আমি ইউনিভার্সিটি পরা অবস্থায় হিদায়াত পাই এই জন্য চাকরি করার সুযোগ হাতছাড়া করেছি।
যায় হোক, আমি প্রেগন্যান্সির কারণে ২.৫ বছরের বাচ্চা নিয়ে বাবার বাড়ি আছি। মেডিক্যাল+ খাবার দাবার এর খরচের জন্য স্বামীর কাছে টাকা চাইতে হয়। কিন্তু আমি যখনই তার থেকে টাকা চাই তখনই উনি গড়িমসি করে টাকা দিতে, বিভিন্ন কথা শুনায়, ২য় বিয়ের ভয় দেখায়, আমার কেউ নাই ভাই নাই, বোন নাই, বৌ নাই। দিন শেষে আমি একা। আমি দিতে পারলে ভালো, না দিতে পারলে আমার মতো খারাপ কেউ নাই ইত্যাদি বলে, পরে দেখা যায় টুকটাক কথা কাটাকাটি হয় তখন উনি আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়, আমি যতক্ষণ কল না দিব, খোঁজ না নিবো উনি আর আমাদের কোনো খোঁজ খবর নেয় না। অথচ আমি ভালো ভাবেই চাই তার কাছে। ১ম প্রেগন্যান্সির সময়ও আমি বাবার বাড়িতেই থাকতাম। তখন প্রেগনেন্সির সময়ে আগে পরের যাবতীয় খরচ আমার বাবাই করেছে। বিয়ের পরে প্রায় ২ বছর আমি বাবার বাড়ি থেকেছি প্রেগন্যান্সি+ বাচ্চা+ তার পরিবারের চাপে কিন্তু ১ বছরেরও অধিক সময় উনি আমাকে কোনো টাকা দিত না ইভেন মোবাইল বিল টাও না এই টাইপের। বিয়ের ৫ মাস পর আমি প্রেগন্যান্ট হই। কিন্তু তার কোনো responsibility ছিল না। এক বছর+ পরে আমি অনেক কথা খরচের পর মাসে ২০০০ টাকা করে দিত কিন্তু তার বেতন ছিল আলহামদুলিল্লাহ্ 60k+

এখন ২য় প্রেগনেন্সির এর শুরুতেই আমি তাকে জানিয়েছি যে সেবার আব্বু করেছে কিন্তু এইবার তোমাকেই সবটা বহন করতে হবে আব্বুর ইনকাম কম যেহেতু প্রান্তিক চাষী মানুষ+ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বহুগুণে বেড়ে গিয়েছে+ এখন আবার বাচ্চার একটা আলাদা খরচও আছে। কিন্তু তার গড়িমসি কমে না। অথচ আল্লাহ তার প্রচুর সামর্থ্য দিয়েছেন আগে থেকেই, বেতন আলহামদুলিল্লাহ্ 75k


আরেকটা কথা তার বেতন এর সিংহভাগ সে রেখেছে তার দুলাভাই এর অ্যাকাউন্ট এ। তার সবগুলা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এর নমিনি তার বোন মানে আমার ননদ এর নামে। এইসব নিয়ে কিছু বললে উনি বলে আমার টাকা আমি যা খুশি করব তাতে তোমার সমস্যা কোথায়, তোমাকে কিংবা তোমার মেয়েকে নমিনি করব না, কিছুই দিব না তোমাদের, কী করবা আমার এই টাইপ। কিছু চাইলেও কথা শুনা লাগে, দিব না তুমি চেয়ে কী করবা, তোমার চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে ইত্যাদি। ২০০০ টাকা এর নিচে দাম হলে অনেক সময় দেয় কিন্তু কথা শুনা লাগে। ২০০০+ হলে আর পাইনা। এই জন্য চাইতে ইচ্ছা হয় আর, আবার না চাইলে নিজে থেকেও দিতে চায় না/দেয় না। মাঝে মধ্যে মাসে ১৫০০- ২০০০টাকা হাত খরচ দিত বাসায় থাকতে কিন্তু সেটা জমিয়ে প্রসাধনী+প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতাম মূলত এই কারণেই দিত। কোনো মাসে নিজে কিছু কিনে দিলে কিংবা আমার অসুস্থতার কারণে ডাক্তার+ মেডিসিন এর জন্য খরচ হলে সে মাসে কোনো হাত খরচ দিত না। তবে বাসায় থাকলে খাবার এর জন্য বাজার আলহামদুলিল্লাহ ভালো করে কিন্তু আমাকে কিছু দিতে গেলেই ঝামেলা শুরু হয় বেশির ভাগ।

যাই হোক আমার ১ম প্রশ্ন হলো, স্বামীর টাকায় কী স্ত্রী সন্তানের কোনো হক নেই? সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি যে আমাদের দিতে চান না এইরকম করাটা কী উচিত?



বাবার বাড়ি আছি তাই কথা শুনায় স্বামী কী খেলো, না খেলো খোঁজ নেই বাপের বাড়ি গিয়ে শুয়ে বসে খাচ্ছ। প্রেগনেন্সির অসুস্থতার কারণে ছোট বাচ্চা নিয়ে+বাচ্চার বাবা সকালে বাসা থেকে বের হয় আর আসে রাত ৯-১০টা বাজে+ যে এলাকায় বাসা সে এলাকায় ভালো মেডিক্যাল সার্ভিস নেই তাই বাবার বাড়িতে আছি। তারপরেও আমি কুরবানী ঈদের পর তার সাথে যেতে চেয়েছিলাম বাসায় কিন্তু সে নিয়ে যেতে রাজি হয়নি। বলেছে বাচ্চা হোক, তুমি সুস্থ হও তারপর এসো।

২য় প্রশ্ন হলো বাবার বাড়িতে আছি এই কারণে কী স্বামীর হক নষ্ট করছি?

Answer

উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমেই আপনার ধৈর্য ও দ্বীনের প্রতি অনুরাগের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি। আপনার প্রশ্ন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তব। আমরা ক্রমান্বয়ে উত্তর দিচ্ছি।


প্রথম প্রশ্ন: স্বামীর টাকায় স্ত্রী-সন্তানের হক আছে কী?

ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ (নাফাকা) স্বামীর উপর ফরজ। কুরআন, হাদীস ও ইজমা দ্বারা এটি প্রমাণিত।

কুরআনের দলিল:

  • আল্লাহ বলেন: “যার সামর্থ্য আছে সে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে। আর যার রিজিক সীমিত, সে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করবে।” (সূরা তালাক: ৭)
  • আরো বলেন: “পিতার দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানদের খাদ্য ও পোশাক বিধিমতে প্রদান করা।” (সূরা বাকারা: ২৩৩)

হাদীসের দলিল:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: “তোমাদের উপর তোমাদের স্ত্রীদের খাদ্য ও পোশাকের অধিকার রয়েছে।” (সহীহ মুসলিম)
  • আরো বলেন: “ব্যক্তি তার স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য যা ব্যয় করে, তা তার জন্য সদকা।” (সহীহ বুখারী)

হানাফী ফিকহের গ্রন্থসমূহ থেকে:

  • ফতোয়া আলমগীরী (১/৪০৫)-এ বলা হয়েছে: “স্ত্রীর নাফাকা স্বামীর উপর ওয়াজিব, যদিও স্ত্রী ধনী হয়।”
  • রদ্দুল মুহতার (৫/২৬০)-এ এসেছে: “সন্তানের খোরপোশ পিতার উপর ফরজ, যতক্ষণ না সে উপার্জনক্ষম হয় অথবা কন্যার বিয়ে না হয়।”
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৪৫৩)-এ উল্লেখ আছে: “স্বামী যদি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্ত্রীকে নাফাকা না দেয়, তবে সে গুনাহগার এবং স্ত্রীর জন্য নিজের প্রয়োজন মতো স্বামীর সম্পদ থেকে নেওয়া জায়েজ।”

আপনার প্রসঙ্গে:
আপনার স্বামীর বেতন ৭৫,০০০ টাকা, অথচ তিনি আপনাকে ও সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত খরচ দিচ্ছেন না – এটি সম্পূর্ণ শরিয়তবিরুদ্ধ। তিনি গড়িমসি করছেন, কথা শোনাচ্ছেন, দ্বিতীয় বিয়ের ভয় দেখাচ্ছেন – এসব ইসলাম সমর্থন করে না। তার টাকায় আপনার ও আপনার সন্তানের পূর্ণ হক রয়েছে। তিনি চাইলেই টাকা না দিয়ে নিজের ইচ্ছামতো খরচ করতে পারেন না।

বিশেষ প্রসঙ্গ: ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নমিনি ও দুলাভাইয়ের অ্যাকাউন্টে টাকা রাখা
এটি তার দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচায়ক। শরিয়তে স্বামীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, সে যেন পরিবারের প্রয়োজন আগে পূরণ করে। অতিরিক্ত সম্পদ সঞ্চয় করতে পারে, কিন্তু স্ত্রী-সন্তানের হক নষ্ট করে নয়। (আল-হিদায়া, কিতাবুন নাফাকাত)

সারমর্ম:

  • স্ত্রী ও সন্তানের নাফাকা স্বামীর উপর ফরজ।
  • সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও না দেওয়া বা গড়িমসি করা কবিরা গুনাহ।
  • আপনি চাইলে তার অজান্তে প্রয়োজনীয় খরচ নিতে পারেন, তবে উত্তম হলো তাকে বোঝানো এবং সালিশের মাধ্যমে সমাধান করা।

দ্বিতীয় প্রশ্ন: বাবার বাড়িতে থাকার কারণে কী স্বামীর হক নষ্ট হচ্ছে?

ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী স্ত্রীর উপর স্বামীর হক হলো, সে স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘরের বাইরে না যায় এবং স্বামীর বাড়িতেই থাকে। তবে এর ব্যতিক্রম আছে।

হানাফী ফিকহের বিধান:

  • ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৫৬)-এ বলা হয়েছে: “যদি স্ত্রীর কোনো বৈধ শরয়ি কারণে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র থাকতে হয়, তবে তিনি নাফাকা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন না এবং স্বামীর হক নষ্ট হবে না।”
  • বাহিশতী জেওর (৮ম অধ্যায়)-এ এসেছে: “গর্ভবতী মহিলার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না থাকলে বা শারীরিক অসুবিধা থাকলে সে নিজ পিতা-মাতার বাড়িতে থাকতে পারে, এবং তার নাফাকা বন্ধ হবে না।”

আপনার ক্ষেত্রে:
আপনি দ্বিতীয় গর্ভধারণের সময় গুরুতর শারীরিক সমস্যার কারণে ডাক্তারি সুবিধাহীন এলাকায় স্বামীর বাড়িতে থাকতে পারছেন না। এটি একটি বৈধ ওযর (অজুহাত)। আপনি স্বামীকে সাথে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি রাজি হননি। এমতাবস্থায় বাবার বাড়িতে আপনার থাকা জায়েজ এবং স্বামীর হক নষ্ট হয় না। বরং সংকটময় সময়ে আপনার পাশে না দাঁড়ানো এবং উপরোক্ত কথাবার্তা বলা তার জন্য অনুচিত।

হাদীসে এসেছে:
“তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম ব্যবহার করে।” (সুনান তিরমিযী)

সারমর্ম:

  • আপনার বর্তমান অবস্থা (চিকিৎসা সংকট, শিশু যত্ন, স্বামীর দূরত্ব) বৈধ ওজর।
  • তাই স্বামীর হক নষ্ট হচ্ছে না, বরং আপনি শরিয়তের আওতায়ই আছেন।
  • একবার সুস্থ হয়ে উঠলে স্বামীর বাড়ি ফেরার চেষ্টা করা উচিত, তবে শর্তহীন নয় – বরং শর্ত হলো স্বামী যেন তার দায়িত্ব পালন করেন।

প্রস্তাবিত সমাধান ও পরামর্শ

  1. পরিবার ও সালিশ: এলাকার কোনো আলেম বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন। স্বামীকে কুরআন-হাদীসের আলোকে বোঝান।
  2. ইসলামি আদালতে যাওয়া: যদি পারিবারিক সমাধান না হয়, তাহলে স্থানীয় ইসলামি আদালতে বা মিডিয়েশন সেন্টারে নালিশ করতে পারেন।
  3. সন্তানের খরচের জন্য ব্যবস্থা: আপনি যদি তার অজান্তে প্রয়োজন মতো টাকা নিতে চান, তাহলে রদ্দুল মুহতার মতে সেটি জায়েজ, তবে সতর্কতার সাথে ব্যবহার করুন।
  4. ধৈর্য ও দোয়া: আল্লামা ইবনে আবেদীন রহ. বলেছেন: “স্বামী যদি নাফাকা না দেয়, তবে স্ত্রীর জন্য ধৈর্য ধরা এবং দোয়া করা উত্তম।” তবে অধিকারের ব্যাপারে নীরব থাকা জরুরি নয়।

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা
اللهم أصلح بينهما واجعل لهما من أمرهما رشداً
(হে আল্লাহ! তাদের মধ্যে সদ্ভাব সৃষ্টি করুন এবং তাদের কাজে কল্যাণ দিন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.