নারী পুরুষ উভয়ের জন্য কি ইদাদ ফরজ ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পূর্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি:
বর্তমান প্রেক্ষাপটে জিহাদ ফরজ হওয়ার শর্ত (যেমন: খলিফা বা মুসলিম শাসকের ঘোষণা, ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা, শত্রুর সরাসরি আক্রমণ ইত্যাদি) পূরণ হয় কিনা, তা নির্ধারণ করা ফিকহবিদদের কাজ। সাধারণ মুসলিমদের জন্য ইদাদ (যুদ্ধের প্রস্তুতি) কখন ফরজ বা ওয়াজিব হয়, তা নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি কিতাবের আলোকে বর্ণনা করা হলো।
১. ইদাদ (যুদ্ধ প্রস্তুতি) কি ফরজ?
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"তোমরা তাদের মোকাবেলায় যতটুকু সম্ভব শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখো..." (সূরা আনফাল: ৬০)
হানাফি ফিকহের মতে:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: ইদাদ মূলত ফরযে কিফায়া (সামষ্টিক দায়িত্ব)। অর্থাৎ কিছু সংখ্যক মুসলিম তা পালন করলে সবার দায়িত্ব মাফ হবে। তবে শর্ত হলো:
- মুসলিম শাসক বা খলিফার আদেশ থাকা।
- ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা শত্রুর হাত থেকে রক্ষার প্রয়োজন।
- যুদ্ধের জন্য সেনা সংগ্রহের ঘোষণা থাকা।
- বর্তমানে খলিফা বা ঐক্যবদ্ধ ইসলামী রাষ্ট্র না থাকায়, ব্যক্তিগতভাবে ইদাদ সবার জন্য ফরজ নয়। তবে কোনো এলাকায় শত্রু সরাসরি আক্রমণ করলে সেখানকার মানুষের ওপর ফরযে আইন হয় (রাদ্দুল মুহতার, ৪/১২৩; আল-হিদায়া, ২/১৪০)।
নারি ও পুরুষের জন্য ভিন্নতা:
- পুরুষের জন্য ইদাদ সাধারণত শারীরিক সামর্থ্য (যেমন: অস্ত্র চালনা, প্রশিক্ষণ) ও অর্থনৈতিক সহায়তা (যুদ্ধের খরচ জোগান) এর মাধ্যমে হয়।
- নারীর জন্য সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ প্রয়োজনীয় নয়, তবে প্রয়োজনে তারা চিকিৎসা, সেবা, অস্ত্র পরিবহণ ও অর্থসহায়তা দিয়ে ইমদাদ করতে পারে (বাহিশতী জেওর, ১০/৪২)।
২. নারীরা কীভাবে ইদাদের প্রস্তুতি নিবে?
বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নারীরা নিচের উপায়ে ইদাদ পালন করতে পারেন:
ক. জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন:
- চিকিৎসা প্রশিক্ষণ: প্রাথমিক চিকিৎসা (first aid), নার্সিং, যুদ্ধক্ষেত্রে জরুরি সেবা।
- অস্ত্র ব্যবহারের জ্ঞান: যদি প্রয়োজন হয়, অস্ত্র চালানোর তালিম (ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এর মতে, নারীর জন্য শুধুমাত্র আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র শিক্ষা জায়েজ)।
- প্রযুক্তিগত দক্ষতা: যোগাযোগ ব্যবস্থা, তথ্য আদান-প্রদান, সাইবার নিরাপত্তা।
খ. আর্থিক ও সম্পদগত সহায়তা:
- যুদ্ধের তহবিলে দান: রাসুল (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় একটি অস্ত্র বা ঘোড়া দান করে, সে যেন সরাসরি জিহাদ করল" (বুখারি ২৮৯৮)।
- গৃহস্থালি সম্পদ: খাদ্য, কাপড়, ওষুধ তৈরি এবং জোগান।
গ. নৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি:
- সন্তানদের জিহাদের চেতনায় গড়ে তোলা: তাদের ইতিহাস, সাহস, ও ত্যাগের শিক্ষা দেওয়া।
- সমাজে সহযোগিতা: যুদ্ধাহতদের সেবা, পরিবারকে সান্ত্বনা, ও প্রয়োজনে উকিল বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা।
ঘ. নিজের ইচ্ছাকে শুদ্ধ করা:
- নিয়তের সংস্কার: ইবাদত ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
- দোয়া ও ইস্তিগফার: যুদ্ধের সময় আল্লাহর সাহায্য কামনা করা।
৩. হানাফি রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (৪/১২৩): "ইমামের অনুমতি ছাড়া জিহাদ করা জায়েজ নয়, তবে প্রতিরক্ষা মূলক জিহাদ শর্তাধীন ফরজ।"
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৭): "যদি শত্রু ইসলামী অঞ্চলে আক্রমণ করে, তাহলে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও আত্মরক্ষায় অংশ নিতে পারে।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২১): "নারীর মূল কাজ সেবা ও চিকিৎসা। তাদের যুদ্ধের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ফরজ নয়, তবে উৎসাহিত করা হয়েছে।"
সারসংক্ষেপ:
- ইদাদ বর্তমানে সকলের জন্য ফরজ নয়, তবে যারা সামর্থ্য রাখে তাদের জন্য ফরযে কিফায়া।
- নারীরা সেবা, শিক্ষা, দান ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে ইদাদে অংশ নিতে পারেন।
- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত ও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে দ্বীন বুঝার ও পালন করার তাওফিক দান করুন।