ভাবির রূঢ় আচরণে কষ্ট পেয়ে প্রয়োজন ছাড়া কথা না বললে কি কোনো গোনাহ হবে?
Family Life · Hanafi
Question
আমার ভাবি তিনি অত্যান্ত এক ঘুয়ে মানে সে একা থাকে আমি তার ননদ অবিবাহিত,তার রুমের সামনে আমার রুম আমার রুমের দরজা জানালা খোলা থাকলে উনি আমার মুখের উপর দরজা পর্দা টানিয়ে দেয়। তার রুমে আমি প্রয়োজন ছাড়া কখনো যাই না প্রয়োজন পড়লে গেলে সে বিরক্ত ফিল করে মানে সে এমন ভাব করে আমাকে তুচ্ছ করে তার এই ব্যবহার এ আমি অনেক কষ্ট পাই।
এখন আমি যদি তার সাথে সহযে একদম কোনো প্রয়োজন ছাড়া না ডাক দেই আমার কি গুনাহ হবে।
যেমন:খাবার সময়,যে কোনো সময়।
আমি তাকে একদম ভদ্র ভাবে পরিহার করতে চাই কি ভাবে করব।
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রিয় বোন, আপনার কষ্ট বুঝতে পারছি। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে, তবে কেউ যদি অমর্যাদাকর আচরণ করে এবং আপনার ক্ষতি বা কষ্টের কারণ হয়, তাহলে আপনি সীমিত আকারে সম্পর্ক রাখতে পারেন। আপনার ভাবি যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে আপনাকে উপেক্ষা করে ও তুচ্ছ করে, তাহলে তার সাথে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ না রাখার জন্য আপনি পাপী হবেন না, যতক্ষণ না আপনি সম্পূর্ণরূপে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন বা তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করছেন।
ইসলামী নির্দেশনা:
-
সিলাতুর রাহিম (আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা) ফরজ বা ওয়াজিব নয়; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও মুস্তাহাব। তবে যদি সম্পর্ক রাখা আপনার জন্য কষ্টদায়ক হয় বা ব্যক্তিটি আপনার ক্ষতি করে, তাহলে আপনি ন্যূনতম সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন।
- কুরআনে বলা হয়েছে: "তাদেরকে সৎকর্ম ও তাকওয়ায় সাহায্য কর, পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সাহায্য করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
- হাদিসে এসেছে: "সিলাতুর রাহিম শুধু প্রতিদানদানের নাম নয়, বরং প্রকৃত সিলাতুর রাহিম হলো তাকে সম্পর্ক বজায় রাখা যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।" (বুখারী, হাদিস: ৫৯৯১)
অর্থাৎ, প্রতিকূল অবস্থায়ও আপনি সালাম দেওয়া, প্রয়োজনে কথা বলা—এটুকু অন্তত করতে পারেন।
-
আপনার করণীয়:
- প্রয়োজন ছাড়া ডাক না দেওয়া: আপনার ভাবি যদি বিরক্তি প্রকাশ করে এবং আপনি নিশ্চিত যে তার সাথে কথা বলায় আপনি আরও কষ্ট পাবেন, তাহলে অপ্রয়োজনে তাকে ডাকা বা কথা বলা থেকে বিরত থাকতে পারেন। এতে আপনার কোনো গুনাহ হবে না, কারণ এটি আপনার অন্তরের শান্তি রক্ষার জন্য। তবে খাবার সময় বা পরিবারের অন্যান্য সাধারণ প্রয়োজনে যদি তাকে ডাকতে হয়, তাহলে ডাকবেন; কিন্তু তা সংক্ষিপ্ত ও ভদ্রভাবে।
- ভদ্রভাবে পরিহার করা: আপনি সরাসরি তার সাথে কোনো ঝামেলা বা বাদানুবাদ না করেই নিজেকে সংযত রাখতে পারেন। যেমন:
- তার রুমের কাছে গেলে প্রয়োজন ছাড়া না যাওয়া।
- দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখা, যাতে পর্দা টানানোর সুযোগ না হয়।
- তাকে সালাম দেওয়া বা উত্তর দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।
- মনে রাখবেন, "মুযারাত ও কষ্ট দেওয়া" ইসলামে নিষিদ্ধ (সূরা হুজুরাত: ১১)। তাই আপনার পক্ষ থেকে কোনো আগ্রাসী আচরণ করা যাবে না।
-
গুরুত্বপূর্ণ নীতি:
- ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: "আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ হলো ভালো ব্যবহার ও যোগাযোগ, তবে যদি সম্পর্ক রাখা ক্ষতিকর হয়, তাহলে তা ওয়াজিব নয়।" (রদ্দুল মুহতার: ৬/৪১৯)
- মুফতি তাকী উসমানী (দা. বা.) বলেন: "যদি কোনো আত্মীয় আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করে এবং আপনি সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে বেশি কষ্ট পান, তাহলে আপনি ন্যূনতম সম্পর্ক যথাসম্ভব বজায় রাখবেন, কিন্তু সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা বৈধ নয়।" (ফাতাওয়া উসমানী: ৫/৩৪২)
-
আপনার মানসিক শান্তির জন্য:
- আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যে তিনি আপনার ভাবির মনোভাব পরিবর্তন করুন।
- একান্ত প্রয়োজনে আপনার বড় ভাই বা পরিবারের অন্য বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির মাধ্যমে বিষয়টি শালীনভাবে সমাধানের চেষ্টা করুন।
- নিজের উপর জোর করবেন না। আপনি যদি তাকে ডাকলে বিরক্তি প্রকাশ করেন, তবে আপনি ডাকবেন না; তার ওপর জবরদস্তি করে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা আপনার দায়িত্ব নয়।
সংক্ষেপে উত্তর:
- আপনি পাপী হবেন না যদি অপ্রয়োজনে তাকে ডাক বা কথা না বলেন, যতক্ষণ আপনি তার প্রতি ঘৃণা বা শত্রুতা পোষণ না করছেন।
- তবে প্রয়োজনে (যেমন খাবার সময়) তাকে ডাকতে বাধ্য হলে সংক্ষেপে ডাকবেন, এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
- ভদ্র উপায়ে পরিহার: নিজের কাজে ব্যস্ত থাকুন, তার সাথে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা না করে প্রয়োজনীয় সময়ে সালাম ও সংক্ষিপ্ত কথার মাধ্যমে সম্পর্ক বজায় রাখুন।
- মনে রাখবেন, "উত্তম চরিত্রের দাবি হলো প্রতিকূল অবস্থায়ও সুন্দর আচরণ করা।" (তিরমিযী, হাদিস: ২০০৩)
আল্লাহ আপনার ধৈর্য ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান দান করুন। আমিন।