স্বামী যদি ভালোবাসে না তবুও সংসার চলমান রাখতে হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার জীবনের কিছু কষ্ট আর একটা মাসালা জানতে এসেছি। উস্তাদ আমার বিয়ে হয়েছে অনেক বছর। হাসব্যান্ড প্রথম থেকেই সময় দেই না, ভালোবাসে না। বিয়ের প্রথমে অনেক অত্যাচার হতো তার সাথে তার ফ্যামিলিও করতো। এখনো অকথ্য ভাষায় কথা বলে।উস্তাদ এখন আগের চেয়ে অত্যাচার একটু কমছে। কিন্তু সমস্যা সে ওই আগের মতোই কাজের থেকে এসেই বাইরে চলে যায়, বাচ্চাকেও তেমন সময় দেই না। আমি হাত ধরো রাখলেও সে চলে যায়। সে আমার কান্না দেখে না। আমি জে মা বাবা মরা মেয়ে সে বোঝে না। ঈদেও এমন করে। ঐদিক সে রাতের বেলা ইন্টিমেট হতে চাই। আমি অনেক কষ্ট করে বাচ্চা মানুষ করি, রান্না করি, সব কাজ করি, সে না আমাকে মানসিক সাপোর্ট দেই না কাজে সাহায্য করে। তার ফামিলি আমার বাচ্চা সামান্য অন্যায় করলেও তুলে ধরে। আমি সারাদিন অনেক মানসিক পেরাই থাকি। সে কোনো দিকি দেখে না। তার এইসব কষ্ট পেতে পেতে, আর এতো কাজ করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে যায়। আমার আর ইন্টিমেট হওয়ার কোনো ইচ্ছা থাকে না। এতে কী আমার গুনাহ হবে? সে আমাকে রাতের বেলাও কোনো ভালোবাসার কথা বলে না। বাচ্চা হওয়ার পর আমার চেহারা নষ্ট হয়ে গিছে, ফিগার নষ্ট হইছে, আমি অচল, গাড়ি চলে না ইত্যাদি বাজে কথাও সে বলে, দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলে। অথচ বিয়ের প্রথম সে অক্ষম ছিলো তখনও আমাকে বাজে কথা বলতো আমি বাজে মেয়ে। তার এসব শুনে আমার তার থেকে আগ্রহ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আমি তারসাথে তেমন তর্ক করি না তাও বলে আমি তর্ক করি। সে জে বাইরে চলে যায় আমার মনটা খারাপও হওয়া যাবে না, মুখ কালো করে রাখা যাবে না, আমিওতো মানুষ। উস্তাদ আমি ডিপ্রেশনের অতলে চলে যাচ্ছি। সুইসাইড করতে ইচ্ছা করে। সে এইসব পার্সোনাল কথাও জোরে জোরে বলে। সে যদি আমাকে একটু ভালোবাসতো আমি তাহলেই ঠিক হয়ে যেতাম। তারপর ফ্যামিলি বাচ্চা হওয়ার পরেও কত কথা শুনাই। এটা কেনো ভুল করলাম ঐটা কেনো করলাম। কিন্ত নিজেরাই এই ছোট বাচ্চার সামান্য ভুল ছেড়ে দেই না। আমার বাচ্চা নিয়ে মরে যেতে ইচ্ছা করে। আমার প্রশ্ন উস্তাদ -
১. আমি যদি আমার বাচ্চা নিয়ে মরে যায় আল্লাহ কী আমায় ক্ষমা করবেন?
২.লজ্জা সত্ত্বেও প্রশ্ন করছি আমার তার সাথে মাসে কত দিন ইন্টিমেট হওয়া উচিত?যাতে তার হক নষ্ট না হয়
৩. তার প্রতি আমার আর ভালোবাসা আসে না। আমি কী এইভাবেই তার সাথে সংসার করতে পারবো দুনিয়ায় না ভালোবেসে ?
৪. আমি কী আঁখিরাতে অন্য কাউকে স্বামী হিসেবে চাইতে পারবো আল্লার কাছে?
আমার জন্য দুয়া করবেন আমি আর পারছি না উস্তাদ।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রথম প্রশ্ন: আমি যদি আমার বাচ্চা নিয়ে মরে যায়, আল্লাহ কি আমায় ক্ষমা করবেন?
ইসলামে আত্মহত্যা (Suicide) ও শিশু হত্যা (Infanticide) উভয়ই কবিরা গুনাহ (Major Sin)। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কোনো পাহাড় থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামের আগুনে চিরকাল লাফাতে থাকবে।" (বুখারি: ৫৭৭৮)
তাই আত্মহত্যা বা সন্তান নিয়ে মৃত্যু কামনা করা জায়েজ নয়। এটি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার শামিল। আপনার কষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তবে ধৈর্য ধরে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া জরুরি। দুআ করুন:
"হে আল্লাহ! আমাকে ধৈর্য দান করুন এবং আমার অবস্থার উন্নতি করুন।"
দ্বিতীয় প্রশ্ন: স্বামীর সাথে মাসে কত দিন ইন্টিমেট হওয়া উচিত?
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌন সম্পর্ক ফরজ নয়, তবে এটি স্বামীর হক (Right)। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা মাসে বাধ্যতামূলক নয়। হানাফি ফিকাহ অনুযায়ী, যদি স্ত্রী অসুস্থ বা শারীরিক-মানসিকভাবে সক্ষম না হয়, তাহলে তার ওপর জোর করা জায়েজ নয়। ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"স্ত্রীর ওপর স্বামীর যৌন চাহিদা পূরণ করা ওয়াজিব, যদি সে শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম হয়। তবে অসুস্থতা, ক্লান্তি বা মানসিক চাপের কারণে অপারগ হলে গুনাহ হবে না।" (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৬২)
আপনার মানসিক অবস্থা বিবেচনায়, যদি আপনি অত্যন্ত ক্লান্ত বা ডিপ্রেশনে থাকেন, তাহলে স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করুন। তবে পুরোপুরি অস্বীকার করবেন না। সাধ্যমতো চেষ্টা করুন।
তৃতীয় প্রশ্ন: তার প্রতি আমার ভালোবাসা না থাকলে কী সংসার চলবে?
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা থাকা উচিত, তবে ভালোবাসা না থাকলেও সংসার করা জায়েজ। তবে আপনার স্বামী যদি অত্যাচার, মানসিক নির্যাতন ও অবহেলা চালিয়ে যায়, তাহলে আপনি খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিয়ে বিচ্ছেদ) বা তালাক দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"আর যদি তোমাদের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা করো, তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত করো।" (সূরা আন-নিসা: ৩৫)
আপনার জন্য উত্তম হবে:
- প্রথমে পরিবারের মুরুব্বি বা আলেমের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করা।
- স্বামীকে ইসলামের দৃষ্টিতে দায়িত্ব সম্পর্কে বোঝানো।
- যদি কোনো পরিবর্তন না হয়, তাহলে খুলা বা তালাকের ব্যবস্থা নেওয়া।
চতুর্থ প্রশ্ন: আখিরাতে অন্য কাউকে স্বামী হিসেবে চাইতে পারবো?
আখিরাতে (পরকালে) বিয়ে বা সম্পর্ক দুনিয়ার কর্মফল অনুযায়ী হবে। আপনার বর্তমান স্বামী যদি অত্যাচারী হয় এবং আপনি ধৈর্য ধরে থাকেন, তাহলে আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন। তবে আখিরাতে নির্দিষ্ট কাউকে চাওয়া ইসলামে উল্লেখ নেই। বরং দুআ করুন:
"হে আল্লাহ! আমাকে দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম সঙ্গী দান করুন।"
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
- মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন: আপনি ডিপ্রেশনের শিকার, তাই মনোবিদ বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিন।
- আত্মহত্যার চিন্তা ত্যাগ করুন: এটি শয়তানের প্ররোচনা। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না।
- স্বামীর সাথে সংলাপ করুন: শান্তভাবে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে আপনার কী কষ্ট হচ্ছে।
- পারিবারিক সাহায্য নিন: আপনার স্বামীর পরিবার বা আপনার আত্মীয়দের সহায়তা চান।
- ইসলামী সমাধান: স্থানীয় আলেম বা ইমামের শরণাপন্ন হোন।
দুআ:
"হে আল্লাহ! আপনি এই বান্দির কষ্ট দূর করুন, তাকে ধৈর্য দান করুন এবং তার স্বামীকে সঠিক পথ দেখান। আমীন।"