সুদি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পুত্রের করণীয় কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
বাবা তার ব্যাংকের আয় থেকেই কিছু জমি ক্রয় করেন এবং একটি পাঁচতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। বর্তমানে তিনি অবসরপ্রাপ্ত। এখন পরিবারের খরচ মূলত ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত পেনশন এবং সেই বাড়ির ভাড়া থেকে চলে, যে বাড়িটি মূলত ব্যাংকের বেতনের অর্থেই নির্মিত হয়েছে।
এ অবস্থায় সম্মানিত মুফতী সাহেবের নিকট নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে শরয়ী নির্দেশনা জানতে চাই:
১. আমি দীর্ঘদিন যাবৎ বাবার কাছ থেকেই ভরণপোষণ গ্রহণ করেছি, কারণ তখন আমার নিজস্ব কোনো আয় ছিল না। কিছুদিন আগে চাকরি পাওয়ার পর থেকে আর তার কাছ থেকে খরচ নিচ্ছি না। এতদিন যে ভরণপোষণ গ্রহণ করেছি, সে সম্পর্কে আমার করণীয় কী?
২. যে বাড়িটি সুদি ব্যাংকের আয় দ্বারা নির্মিত হয়েছে, সেই বাড়ির ভাড়া গ্রহণের শরয়ী হুকুম কী? সেটি কি সুদের টাকার মতোই হারাম গণ্য হবে?
৩. ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত পেনশনের শরয়ী হুকুম কী?
৪. পেনশন এবং বাড়িভাড়ার টাকা একসাথে মিশে গেলে সেই মিশ্র টাকার হুকুম কী হবে?
৫. বর্তমানে আমি যখন বাবার বাড়িতে যাই, তখন সেখানে যে খাবার খাই তা মূলত পেনশন ও বাড়িভাড়ার টাকা থেকেই আসে। এ অবস্থায় আমার জন্য সেই খাবার খাওয়া বৈধ হবে কি?
৬. যদি পেনশন ও বাড়িভাড়ার আয় শরিয়ত অনুযায়ী অবৈধ হয়, তাহলে এই টাকা দিয়ে বিয়ের মোহর আদায় করা যাবে কি?
৭. সুদি আয় দ্বারা নির্মিত বাড়ি এবং সেই অর্থ দিয়ে ক্রয়কৃত জমি বাবার মৃত্যুর পর ওয়ারিশ হিসেবে গ্রহণ করা আমার জন্য বৈধ হবে কি না?
৮. যদি পড়াশুনা বা উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে হারাম টাকা নেই, তাহলে কি তা সুদের মতোই নাজায়েজ হবে, নাকি পড়াশুনার খাতিরে কিছুটা শিথিলতা আছে?
Answer
প্রশ্নের উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তব জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। সুদ একটি কবীরা গুনাহ এবং ইসলামে স্পষ্টভাবে হারাম। তাই সুদের সাথে জড়িত আয় ও সম্পদের শরয়ী বিধান জানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের কিতাবের আলোকে প্রদান করা হলো।
১. বাবার কাছ থেকে পূর্বে গৃহীত ভরণপোষণ সম্পর্কে করণীয়
উত্তর:
আপনি যখন নাবালক ছিলেন বা নিজের আয় না থাকার কারণে অসহায় অবস্থায় ছিলেন, তখন আপনার পিতার জন্য আপনার ভরণপোষণ প্রদান করা ওয়াজিব ছিল। আপনার পিতা যদি সুদি আয় থেকেও আপনাকে ভরণপোষণ দিয়ে থাকেন, তবে সেটি আপনার জন্য জায়েয ছিল, কারণ আপনি তখন তার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে আপনার নিজস্ব আয় আছে, তাই এখন থেকে তার কাছ থেকে কোনো ভরণপোষণ গ্রহণ করা জায়েয হবে না যদি তার আয় সম্পূর্ণরূপে হারাম হয়। পূর্বে গৃহীত ভরণপোষণের জন্য আপনার ওপর কোনো গুনাহ নেই, কারণ আপনি তখন বাধ্য ছিলেন। তবে এখন আপনার পিতাকে নসীহত করা এবং তাকে হারাম আয় থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া উচিত।
উল্লেখযোগ্য:
- কুরআনে বলা হয়েছে: "وَلاَ تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى" (অর্থ: কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না) [সূরা ফাতির: ১৮]
- হাদীসে এসেছে: "الْحَلاَلُ بَيِّنٌ وَالْحَرَامُ بَيِّنٌ" (হালাল স্পষ্ট এবং হারাম স্পষ্ট) [বুখারী ও মুসলিম]
- ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: "যদি কেউ হারাম আয় থেকে তার সন্তানকে খাওয়ায়, তবে সন্তানের জন্য তা জায়েয, যদি না সে জানে যে তা হারাম।" [রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৫]
২. সুদি আয় দ্বারা নির্মিত বাড়ির ভাড়া গ্রহণের হুকুম
উত্তর:
সুদি ব্যাংকের আয় দ্বারা নির্মিত বাড়ির ভাড়া গ্রহণ করা জায়েয নয়। কারণ সেই অর্থ সম্পূর্ণরূপে হারাম। তবে যদি বাড়িটি নির্মাণের সময় কিছু হালাল টাকাও মিশে থাকে, তাহলে সেই অংশ অনুযায়ী ভাড়া হালাল হবে, আর অবশিষ্ট অংশ সদকা করতে হবে। কিন্তু যেহেতু আপনার পিতা মূলত সুদি আয় দিয়েই বাড়ি তৈরি করেছেন, তাই পুরো ভাড়াই হারাম বলে গণ্য হবে।
উল্লেখযোগ্য:
- হাদীসে এসেছে: "إِنَّ اللَّهَ إِذَا حَرَّمَ شَيْئًا حَرَّمَ ثَمَنَهُ" (আল্লাহ যখন কোনো বস্তু হারাম করেন, তার মূল্যও হারাম করেন) [আবু দাউদ]
- ফতোয়া আলমগীরীতে বলা হয়েছে: "হারাম উপার্জন দিয়ে তৈরি বাড়ি ভাড়া দেওয়া জায়েয নয়।" [ফতোয়া আলমগীরী, ৫/৩৪৫]
- ইমদাদুল ফতোয়ায় আছেঃ "সুদি লেনদেনের টাকা দিয়ে কেনা জমি ও বাড়ির ভাড়া গ্রহণ করা জায়েয নয়।" [ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২৯৫]
৩. ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত পেনশনের হুকুম
উত্তর:
যেহেতু আপনার পিতা সুদি ব্যাংকে চাকরি করেছেন এবং তার বেতন ও পেনশন সুদি লেনদেনের মাধ্যমেই এসেছে, তাই পেনশনের টাকা সম্পূর্ণরূপে হারাম। কারণ চাকরি ছিল সুদি প্রতিষ্ঠানে এবং বেতন ও পেনশন সেই প্রতিষ্ঠানের সম্পদ থেকে প্রদান করা হয়েছে, যা সুদমুক্ত নয়।
উল্লেখযোগ্য:
- রদ্দুল মুহতার: "সুদি ব্যাংকে চাকরি করা এবং তার বেতন নেওয়া জায়েয নয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৫৫)
- ফতোয়া উসমানী: "সুদি প্রতিষ্ঠানের চাকরি এবং তার বেতন ও পেনশন সবই হারাম।" [ফতোয়া উসমানী, ২/১০৫]
৪. পেনশন ও বাড়িভাড়ার টাকা মিশে গেলে তার হুকুম
উত্তর:
যদি পেনশন (হারাম) এবং বাড়িভাড়ার টাকা (হারাম) মিশে যায়, তাহলে পুরো টাকাই হারাম হবে। কারণ উভয় উৎসই হারাম। কিন্তু যদি কোনো হালাল উৎসের টাকা মিশে থাকে, তাহলে সেই অনুপাতে টাকা হালাল হবে। যেহেতু এখানে উভয়ই হারাম, তাই পুরো টাকা হারাম বলে গণ্য হবে এবং এই টাকা গ্রহণ করা জায়েয নয়।
উল্লেখযোগ্য:
- কুরআনে বলা হয়েছে: "يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا" (হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা ছেড়ে দাও) [সূরা বাকারা: ২৭৮]
- হাদীসে এসেছে: "كُلُّ لَحْمٍ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ فَالنَّارُ أَوْلَى بِهِ" (যে মাংস হারাম উপার্জন থেকে বেড়ে উঠে, তার জন্য জাহান্নাম উপযুক্ত) [তিরমিযী]
৫. বাবার বাড়িতে হারাম টাকার খাবার খাওয়া
উত্তর:
আপনি যদি নিশ্চিত হন যে আপনার বাবার বাড়ির সব খাবারই হারাম টাকায় কেনা, তাহলে সেখানে খাওয়া জায়েয হবে না। কিন্তু যদি আপনি নিশ্চিত না হন বা কোনো হালাল উৎসের টাকা মিশে থাকে, তাহলে সামগ্রিকভাবে খাওয়া জায়েয হতে পারে। তবে আপনার পিতাকে নসীহত করা উচিত যাতে তিনি হারাম আয় ত্যাগ করেন এবং হালাল উপার্জন করেন।
উল্লেখযোগ্য:
- হাদীসে এসেছে: "إِنَّ الْحَلاَلَ بَيِّنٌ وَإِنَّ الْحَرَامَ بَيِّنٌ" (নিশ্চয়ই হালাল স্পষ্ট এবং হারাম স্পষ্ট) [বুখারী ও মুসলিম]
- ইমদাদুল ফতোয়া: "যদি কোনো ব্যক্তি নিশ্চিত হয় যে, খাবার হারাম টাকায় কেনা, তাহলে তা খাওয়া জায়েয নয়।" [ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২৯৮]
৬. হারাম টাকা দিয়ে বিয়ের মোহর আদায়
উত্তর:
হারাম টাকা দিয়ে বিয়ের মোহর আদায় করা জায়েয নয়। মোহর স্ত্রীর অধিকার, এবং তা হালাল উপার্জন থেকে দিতে হবে। যদি কেউ হারাম টাকা মোহর হিসেবে দেয়, তাহলে মোহর আদায় হবে, কিন্তু গুনাহ হবে। তাই তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব।
উল্লেখযোগ্য:
- কুরআনে বলা হয়েছে: "وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً" (স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর খুশির সাথে দিয়ে দাও) [সূরা নিসা: ৪]
- ফতোয়া আলমগীরী: "হারাম টাকা দিয়ে মোহর আদায় করা মাকরূহ তাহরীমী।" [ফতোয়া আলমগীরী, ২/৫০]
৭. সুদি আয় দ্বারা নির্মিত বাড়ি ও জমি ওয়ারিশ হিসেবে গ্রহণ
উত্তর:
সুদি আয় দ্বারা ক্রয়কৃত বাড়ি ও জমি যদি আপনার পিতার মৃত্যুর পর ওয়ারিশগণ গ্রহণ করেন, তবে তা জায়েয হবে, কিন্তু সম্পদের মধ্যকার হারাম অংশের দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ওয়ারিশদেরকে সেই সম্পদ সদকা করে দেওয়া বা অন্তত হারাম অংশ বের করে দান করা উচিত। তবে সম্পদ নিজে ভোগ করা জায়েয হবে না যদি সম্পূর্ণরূপে হারাম হয়।
উল্লেখযোগ্য:
- ফতোয়া উসমানী: "সুদি আয় দিয়ে কেনা সম্পত্তি ওয়ারিশগণ গ্রহণ করতে পারবেন, কিন্তু তাতে গুনাহ হবে না যদি তারা জানে না যে এটি হারাম। তবে জানার পর তা সদকা করা উত্তম।" [ফতোয়া উসমানী, ২/৫২]
- ইমদাদুল ফতোয়া: "ওয়ারিশ যদি সম্পদ গ্রহণ করে, তবে তা জায়েয। কিন্তু সওয়াবের নিয়তে সদকা করা ভালো।" [ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/৩০০]
৮. শিক্ষার জন্য হারাম টাকা ব্যবহার
উত্তর:
হারাম টাকা শিক্ষা বা অন্য কোনো ভালো কাজের জন্যও ব্যবহার করা জায়েয নয়। কারণ হারাম সম্পদ থেকে উপকার লাভ করা শরীয়তে নিষিদ্ধ। তবে চরম প্রয়োজন বা অপারগতার ক্ষেত্রে কিছু শিথিলতা থাকতে পারে, কিন্তু তা সাধারণ নিয়ম নয়। শিক্ষার জন্যও হালাল উপার্জন ব্যবহার করা উচিত।
উল্লেখযোগ্য:
- হাদীসে এসেছে: "إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا" (আল্লাহ পবিত্র, তিনি শুধু পবিত্র জিনিসই কবুল করেন) [মুসলিম]
- ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: "হারাম টাকা দিয়ে জ্ঞানার্জন করাও জায়েয নয়।" [রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৮]
উপসংহার ও পরামর্শ
আপনার পিতার জন্য প্রয়োজন তাওবা করা এবং সুদি ব্যাংকের সাথে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করা। যদি অবসর নেওয়ার পরেও তিনি পেনশন নেন, তবে তা ত্যাগ করা উচিত। বাড়িভাড়া ও পেনশনের টাকা সম্পূর্ণরূপে হারাম হওয়ায় তা গ্রহণ করা জায়েয না। তবে সম্পূর্ণ ত্যাগ করা কঠিন হলে, অন্তত হারাম অংশ সদকা করে দেওয়া উচিত। আপনার পিতাকে নরম ভাষায় নসীহত করুন এবং হালাল উপার্জনের পথে উৎসাহিত করুন।