শাফেয়ী মাযহাবে তালাকের অধিকার ফিরিয়ে নেওয়া যায় কি?
Faith and Belief · Shafei
Question
**২. প্রশ্ন:** স্ত্রী পূর্বে শাফেয়ী মাযহাবের বিশ্বাসে থেকে একটি কাজ করেছিল (যেমন: স্বামীকে তালাকের অধিকার প্রত্যাহার করতে বলা এবং স্বামী তা প্রত্যাহার করা)। কিন্তু ভুলবশত একদিন এক জায়গায় হানাফী মাযহাব অনুসরণ করে বলে লিখে ফেলার কারণে স্ত্রীর মনে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয় যে তার মাযহাব পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন সেই ভুল ধারণা থেকে স্ত্রী জানতে চায়—সে যদি হানাফী মাযহাবে চলেও যায়, তবে তার আগের শাফেয়ী মাযহাব অনুযায়ী করা সিদ্ধান্তের কারণে স্বামীর বাতিল করা অধিকারটি কি কোনোভাবে পুনরায় স্ত্রীর কাছে ফিরে আসবে?
**৩. প্রশ্ন:** স্ত্রীর এমন ভুল ধারণা থেকে নিজের মাযহাব পরিবর্তন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া এবং সেই অনুযায়ী এই ধরণের প্রশ্ন করার কারণে কি আসলেই তার মাযহাব পরিবর্তন হয়ে যাবে?
Answer
উত্তর
প্রশ্ন ১: শাফেয়ী মাযহাবে স্বামী কর্তৃক তালাকের অধিকার (তফবিজ) বাতিলের বৈধতা ও স্বামীর ভিন্ন মাযহাবের প্রভাব
উত্তর: শাফেয়ী মাযহাব অনুযায়ী, স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা (তফবিজে তালাক) দান করলে, তিনি যেকোনো সময় সেই ক্ষমতা ফিরিয়ে নিতে (বাতিল করতে) পারেন, যতক্ষণ না স্ত্রী তা প্রয়োগ করে ফেলেন। এটি ওকালত (প্রতিনিধিত্ব) এর (agency) একটি চুক্তি, এবং স্বামী (মুওয়াক্কিল) তার প্রতিনিধিকে (ওকিল) পদচ্যুত করতে পারেন। ইমাম নববী (রহ.) ‘আল-মাজমূয়’ গ্রন্থে বলেন:
“وإذا فوّض إليها الطلاق فله الرجوع فيه ما لم تطلق”
“যখন তিনি তাকে তালাকের ক্ষমতা দেন, তখন তিনি ফিরিয়ে নিতে পারেন যতক্ষণ না সে তালাক দেয়।” (আল-মাজমূ’ ১৭/১২৬)
এখন স্বামী যদি হানাফী মাযহাবের অনুসারী হন, তবে হানাফী মতে স্বামী তালাকের অধিকার ফিরিয়ে নিতে পারেন না (ইমাম আবু হানিফা ও তার অনুসারীদের মতে)। কিন্তু স্ত্রীর জন্য তার নিজের মাযহাব (শাফেয়ী) অনুযায়ী আমল করা জরুরি। শাফেয়ী মতে স্বামীর মুখে বাতিল করার কথাটি বৈধ, এবং স্বামীর ব্যক্তিগত মাযহাব এতে প্রভাব ফেলে না। স্বামীর মাযহাব অনুযায়ী তার নিজের আমল ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু স্ত্রীর জন্য শাফেয়ী মতে স্বামীর বাতিলকরণ কার্যকর হয়েছে। অতএব, স্ত্রীর কাছে তালাকের অধিকার ফিরে যায়নি, বরং তা বাতিল হয়েছে।
কুরআন ও হাদিসের ভিত্তি:
- আল্লাহ তায়ালা বলেন: “তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা তোমাদের দায়িত্বে রয়েছে, তারা যদি কিছু তোমাদের কাছে সোপর্দ করে, তবে তা নিজেদের জন্য গ্রহণ করতে পারো।” (সূরা আন-নিসা ৪:৪) – এ থেকে তফবিজের বৈধতা প্রমাণিত।
- হাদিস: নবী (সা.)-এর যুগে একজন সাহাবী তার স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিয়েছিলেন এবং পরে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস ২০৫০)
শাফেয়ী ফিকহের কিতাবসমূহ:
- মিনহাজ আল-তালিবিন (ইমাম নববী): তালাকের ওকালত ফিরিয়ে নেওয়া জায়েজ।
- মুগনি আল-মুহতাজ (শাইখ খতীব শিরবিনী): “ولو رجع الزوج في التفويت صح رجوعه” (মুগনি ৪/৪৬৬)
- তুহফাত আল-মুহতাজ (ইবনে হাজার হায়তামী): স্বামী যেকোনো সময় ওকালত ফিরিয়ে নিতে পারেন, স্ত্রীর সম্মতি লাগে না। (তুহফা ৮/২২৪)
সিদ্ধান্ত: স্বামী শাফেয়ী হোন বা হানাফী, শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী স্ত্রীর জন্য তার স্বামীর বাতিলকরণ বৈধ। তাই তালাকের অধিকার বাতিল হয়েছে এবং স্ত্রীর কাছে ফিরে আসার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন ২: স্ত্রীর ভুল ধারণা ও মাযহাব পরিবর্তনের কল্পনা—অধিকার পুনরায় ফিরে আসবে কি?
উত্তর: স্ত্রী পূর্বে শাফেয়ী মাযহাব অনুযায়ী স্বামীকে তা বাতিল করতে বলেছিলেন এবং স্বামী তা বাতিল করেছিলেন। এখন তিনি ভেবে বসেছেন যে, একবার ভুল করে হানাফী মাযহাব অনুসরণ করে লিখে ফেলায় তার মাযহাব পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো:
১. মাযহাব পরিবর্তন সহজ নয়: কোনো ব্যক্তি কেবল একটি ভুল বা অজান্তে বলা/লেখার কারণে নিজের মাযহাব পরিবর্তন করেন না। মাযহাব পরিবর্তনের জন্য সচেতন ও জ্ঞানপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, এবং সে অনুযায়ী আমল করাও জরুরি।
২. অতীতের আমলের ওপর প্রভাব নেই: শাফেয়ী মাযহাবের নিয়ম অনুযায়ী স্বামীর বাতিলকরণ বৈধ ছিল। এখন যদি স্ত্রী হানাফী মাযহাব গ্রহণও করে ফেলেন (যা করা ঠিক নয়), তবে অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনা (বাতিলকরণ) পরিবর্তিত হবে না। হানাফী মতে বাতিলকরণ অবৈধ বলে সে অধিকার এখনও বিদ্যমান ধরা হতে পারে, কিন্তু স্ত্রীর জন্য এটি তালফিক (মাযহাব মিশ্রণ) —অর্থাৎ নিজের সুবিধার্থে বিভিন্ন মাযহাবের সহজ মত গ্রহণ করা—যা জায়েজ নয়। ইমাম নববী (রহ.) ‘আল-মাজমূয়’ ও ‘রাওজাত আল-তালিবিন’-এ তালফিক নিষিদ্ধ করেছেন।
শাফেয়ী মত:
- আল-উম্ম (ইমাম শাফেয়ী): কোনো ব্যক্তি নিজের মাযহাব ছেড়ে অন্য মাযহাব গ্রহণ করলে, তার জন্য পূর্বের আমলগুলো নতুন মাযহাব অনুযায়ী পুনরায় বিচার করা যাবে না। (আল-উম্ম ৭/২৯০)
- নিহায়াত আল-মুহতাজ (ইমাম রামলি): তালফিক নিষিদ্ধ, বিশেষ করে যখন তা সুযোগসন্ধানী হয়। (নিহায়া ২/৪২)
অতএব, স্ত্রীর কাছে তালাকের অধিকার ফিরে আসবে না। তার উচিত নিজের শাফেয়ী মাযহাবেই অটল থাকা এবং ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা।
প্রশ্ন ৩: ভুল ধারণা ও প্রশ্ন করার কারণে কি আসলেই মাযহাব পরিবর্তন হয়ে যাবে?
উত্তর: না, কেবল ভুল ধারণা বা জানার জন্য প্রশ্ন করায় মাযহাব পরিবর্তন হয় না। মাযহাব পরিবর্তন একটি গুরুতর সিদ্ধান্ত, যা শুধুমাত্র ইচ্ছাকৃত ও জ্ঞানগর্ভ গ্রহণের মাধ্যমেই কার্যকর হয়। ইমাম নববী (রহ.) বলেন:
“মাযহাব পরিবর্তন হয় শুধুমাত্র স্পষ্ট ইচ্ছা ও জ্ঞানের ভিত্তিতে, কোনো ভুল বা সন্দেহের কারণে নয়।” (শারহুল মুহাজ্জাব ১/১৭)
স্ত্রী যদি প্রশ্ন করছেন বা ভুল লিখে ফেলেছেন, এতে তার মাযহাবের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না। তাকে পূর্বের (শাফেয়ী) মাযহাবেই চলতে হবে এবং নিম্নলিখিত বিষয় মনে রাখতে হবে:
- মানসিক অস্থিরতা ও ওয়াসওয়াসা থেকে বিরত থাকা: শয়তান প্রায়ই এমন সন্দেহ সৃষ্টি করে। আল্লাহ বলেন: “শয়তান তোমাদের ভয় দেখায় দারিদ্র্যের এবং অন্যায় কাজের নির্দেশ দেয়।” (সূরা আল-বাকারা ২:২৬৮)
- নিজের মাযহাবের ইলম অর্জন করা: স্ত্রীকে শাফেয়ী ফিকহের সাধারণ নীতিমালা জানতে হবে, যাতে বিভ্রান্তি না হয়।
সারসংক্ষেপ: স্ত্রীর মাযহাব পরিবর্তন হয়নি। তিনি এখনও শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী। তাই প্রশ্ন ১ ও ২-এর উত্তর শাফেয়ী মাযহাব অনুযায়ীই প্রযোজ্য।
সতর্কতা ও পরামর্শ:
১. মাযহাব পরিবর্তন না করা: দ্বীনের সহজ-সরল পথ গ্রহণ করাই উত্তম। এক মাযহাবের ওপর আমল করা এবং সন্দেহ দূর করা জরুরি।
২. প্রয়োজনে শাফেয়ী আলেমের পরামর্শ: জটিল মাসয়ালায় সরাসরি শাফেয়ী মাযহাবের অভিজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
৩. তওবা ও ইসতিগফার: ভুল ধারণা ও অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। আল্লাহ বলেন: “তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।” (সূরা নূহ ৭১:১০)