অনলাইনে প্রতারণা করে টাকা নেওয়ার পর তওবা ও টাকা ফেরতের শরয়ি পদ্ধতি কি হতে পারে?
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
১. সে তওবা করেছে ভবিষ্যতে এই কাজ আর করবে না।
২. সমপরিমাণ টাকা তাদের নামে দান করে দিলে হবে? নাকি অতিরিক্ত বাড়তি টাকা দিতে হবে? টাকার মান কমে যাওয়ার কি সমপরিমাণ টাকা দিলেই হবে?
৩. উনি মূলত জানেন না একুরেট কত টাকা নিয়েছেন, সে কি তাহলে এভাবে বলবে দান করার পর, হে আল্লাহ আমার জীবনে যত টাকা দান করেছি, আর আমি যাদের হক নষ্ট করেছি, আপনি আমার দান থেকে তাদের হক পরিমাণ টাকা তাদের জন্য দান হিসেবে কবুল করুন।
৪. যদি উক্ত ব্যক্তি অনুতপ্ত হয় এবং তওবা করে, কিন্তু টাকা না থাকার দরুন তাদের নামে দান করতে না পারে তাহলে তাঁর কি হবে?
৫. অথবা অন্য কোন ভাবে তাদের হক পরিশোধ করার উপায় আছে? বিস্তারিত জানতে চাই।
Answer
উত্তর:
আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়া ওয়াজিব। যাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে তাদের খোঁজ বের করে টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব না হলে শরিয়তের নির্দেশনা নিম্নরূপ:
১. তওবা ও ভবিষ্যতে না করার অঙ্গীকার
তওবা করতে হবে তিনটি শর্তসহ:
- প্রতারণা করা কাজ থেকে বিরত থাকা।
- কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
- দৃঢ় সংকল্প করা যে ভবিষ্যতে আর এ কাজ করবে না।
এ সাথে যাদের হক নষ্ট করা হয়েছে তাদের টাকা ফেরত দেওয়া অপরিহার্য, কেননা আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ করেন যে, তোমরা আমানত তার প্রকৃত অধিকারীকে ফিরিয়ে দাও।” (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَن ظَلَمَ أَخَاهُ مِن عِرْضِهِ أو شيءٍ، فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ اليَومَ، قَبْلَ أنْ لا يَكونَ دِينَارٌ ولا دِرْهَمٌ
“যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রম বা অন্য কিছুর ব্যাপারে জুলুম করেছে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়, আগে সেই দিন আসে যখন দীনার-দিরহাম কিছুই কাজে আসবে না।” (বুখারি, ২৪৪৯)
সুতরাং শুধু তওবা করলেই হবে না; টাকা ফেরত দিতে হবে।
২. টাকা ফেরত দেয়ার পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় পরিমাণ
ক. তাদের ঠিকানা না জানলে:
যদি প্রকৃত মালিকদের খুঁজে বের করা সম্ভব না হয়, তাহলে তাদের পক্ষ থেকে সমপরিমাণ টাকা সদকা করতে হবে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
“যখন মালিককে খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন তার মাল সদকা করা ওয়াজিব, আর এটাই তার মাল থেকে মুক্ত হওয়ার উপায়।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ৩০/২৯৬)
খ. অতিরিক্ত টাকা বা ক্ষতিপূরণ:
প্রতারণার সময় টাকার যে মান ছিল, সেই অনুপাতে সমমূল্যের টাকা ফেরত দিলেই হবে। যদি টাকার মান কমে গেছে, তাহলে প্রকৃত প্রতারণার সময়ের সমমূল্য পরিশোধ করতে হবে। ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন:
“যদি মূল্য পরে বাড়ে-কমে, তাহলে মূল্যের দিকে লক্ষ্য করা হবে, সংখ্যার দিকে নয়। তবে যদি জিনিসটি একই রকম (যেমন সোনা-রূপা বা নির্দিষ্ট মুদ্রা) থাকে, তাহলে সেটাই ফেরত দিতে হবে।” (আশ-শারহুল মুমতি‘, ৪/১২৯)
অর্থাৎ টাকার অংক ২০০০০ টাকা হলেই যথেষ্ট; অতিরিক্ত দিতে হবে না, যদি না টাকার মান এত কমে যায় যে প্রকৃত পাওনা টিকার থেকে কমে যায়—সেক্ষেত্রে বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী সমমূল্য দিতে হবে। তবে সতর্কতার জন্য একটু বেশি দেওয়া উত্তম (যেমন ২০,০০০ বা তার চেয়ে কিছু বেশি)।
গ. সঠিক পরিমাণ না জানলে:
যদি নিশ্চিতভাবে জানা না থাকে কত টাকা প্রতারণা করা হয়েছে, তাহলে প্রবল ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ অংক ধরে তা সদকা করা উচিত। শায়খ আলবানী (রহ.) বলেন:
“যদি সঠিক সংখ্যা স্মরণ না থাকে, তাহলে নিজের ধারণা অনুযায়ী সদকা করবে, আর যাতে নিশ্চিত হতে পারে, তার চেয়ে বেশি সদকা করাই ভালো।” (সিলসিলা সহীহাহ, ২/১৪৫)
ঘ. দান করার পর দোয়া পড়া:
আপনি বলেছেন: “হে আল্লাহ আমার জীবনে যত টাকা দান করেছি, আর আমি যাদের হক নষ্ট করেছি, আপনি আমার দান থেকে তাদের হক পরিমাণ টাকা তাদের জন্য দান হিসেবে কবুল করুন” — এটি সরাসরি যথেষ্ট নয়। বরং উদ্দেশ্য করে তাদের পক্ষ থেকে সদকা করতে হবে এবং মনে মনে নিয়ত করতে হবে যে, আমি এই সদকার সওয়াব অমুক ব্যক্তি বা অজ্ঞাত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য করছি। এরপর আল্লাহর কাছে দোয়া করবে যে, এই সদকা যেন তাদের জন্য কবুল হয় এবং তুমি দায়মুক্ত হও। তবে সঠিক পদ্ধতি হলো: প্রথমে টাকা সদকা করবে, তারপর দোয়া করবে। কিন্তু শুধু পূর্বের দান থেকে গুনে দেওয়া যথেষ্ট নয়, কারণ পূর্বের দান তো অন্য নিয়তে ছিল।
৩. টাকা না থাকলে করণীয়
যদি বর্তমানে তার কাছে টাকা না থাকে, তাহলে:
- তওবা কবুলের জন্য তওবার বাকি শর্ত (অনুতাপ ও ভবিষ্যতে না করার সংকল্প) থাকলেও টাকা ফেরত দেওয়া ওয়াজিব থাকবে। ইবন হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন:
“জুলুমের কাফফারা হলো তা ফেরত দেওয়া। যদি ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে সে ব্যক্তি যতক্ষণ না ফেরত দেবে, ততক্ষণ জিম্মায় (দায়িত্বে) থাকবে।” (ফাতহুল বারি, ৫/৮৮)
- তাই সে তার সাধ্যমতো চেষ্টা করবে টাকা জমা করে ফেরত দেওয়ার বা তাদের নামে সদকা করার। যতক্ষণ না পারে, ততক্ষণ আল্লাহর কাছে দোয়া করবে এবং টাকা পাওয়ার পর দ্রুত তা আদায় করবে।
- শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেছেন:
“যদি প্রকৃত মালিককে চেনে না এবং টাকাও তার কাছে না থাকে, তাহলে সে যেন আল্লাহর কাছে তওবা করে এবং টাকা জোগাড় করে সদকা করে। আর যদি কখনোই জোগাড় করতে না পারে, তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করা যাবে না।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ফাওযান, ১১/২৩৫)
৪. অন্য কোনো উপায়
হ্যাঁ, যদি কোনো দিন প্রকৃত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা যায়, তাহলে তাদের খোঁজ বের করে সরাসরি ফেরত দেওয়াই উত্তম। আর যদি না-ই জানা যায়, তাহলে তাদের পক্ষ থেকে সদকাই একমাত্র পথ। এছাড়া মসজিদ, এতিমখানা ইত্যাদিতে তাদের নামে দান করা যায়। তবে উল্লিখিত সদকার বিনিময়ে নিজের জন্য সওয়াবের আশা না করে শুধু প্রকৃত মালিকের হক আদায়ের নিয়ত করতে হবে।
সারকথা:
- তওবা করবে এবং টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করবে।
- ঠিকানা না জানলে সমপরিমাণ (বা মূল্যমান অনুযায়ী সমান) টাকা তাদের পক্ষ থেকে সদকা করবে।
- সঠিক অংক না জানলে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ অংক ধরে সদকা করবে।
- বর্তমানে টাকা না থাকলে তওবা কবুল হবে, কিন্তু দায়িত্ব বহাল থাকবে; যখনই সক্ষম হবে তখনই সদকা করবে।
- অন্য কোনো পদ্ধতি (যেমন পুরনো দান কেটে নেওয়া) যথেষ্ট নয়; বরং স্বতন্ত্রভাবে তাদের নামে নতুন সদকা করতে হবে।
আল্লাহ তওবা কবুল করুন এবং সকল জুলুম থেকে হেফাজত করুন।
والله أعلم بالصواب