সন্তান জন্ম ও নবজাতকের হক সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ শরয়ি প্রশ্ন

Sunnah and Bid'ah · Hanafi

Questioner: Mamunur Rashid
Question Asked: 31 May 2026, 02:50 PM
Reviewed & Published: 31 May 2026, 03:36 PM
Views: 57
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

সম্মানিত মুফতি সাহেব,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আশা করি আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমতে আপনি সুস্থ ও ভালো আছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের পরিবারে শীঘ্রই একটি সন্তানের আগমনের নিয়ামত দান করতে যাচ্ছেন। এ উপলক্ষে সন্তান জন্ম, নবজাতকের হক, আকীকা ও সংশ্লিষ্ট কিছু মাসআলা সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সহিহ দিকনির্দেশনা জানতে আগ্রহী। তাই আপনার নিকট বিনীতভাবে কয়েকটি প্রশ্ন পেশ করছি।

প্রশ্নসমূহ:
১. স্ত্রীর প্রসব বেদনার সময় স্বামীর জন্য বিশেষ কোনো দোয়া বা আমল আছে কি? থাকলে দয়া করে জানাবেন।
২. প্রসব বেদনার সময় গর্ভবতী নারী নিজে কোন কোন দোয়া, যিকির বা আমল করতে পারেন?
৩. সন্তান জন্মগ্রহণের পর তার কানে আযান কখন দেওয়া উত্তম? জন্মের সাথে সাথেই, নাকি নার্স বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার পর?
৪. নবজাতকের কানে আযান দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি কী? কতটুকু আওয়াজে দিতে হবে এবং কী কী বিষয় খেয়াল রাখতে হবে?
৫. ছেলে ও মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে আযান দেওয়ার বিধান ও পদ্ধতি কি একই, নাকি কোনো পার্থক্য রয়েছে?
৬. বাবা হিসেবে প্রথমবার সন্তানকে কোলে নেওয়ার সময় কোনো বিশেষ দোয়া বা বরকতের আমল আছে কি, যা সন্তানের জন্য কল্যাণকর হবে?
৭. নবজাতককে তাহনিক (নেককার ব্যক্তির চিবানো খেজুর বা মিষ্টি বস্তু মুখে দেওয়া) করার সুন্নত পদ্ধতি কী? এটি কখন করতে হবে মায়ের বুকের দুধ পান করানোর আগে না পরে? এ বিষয়ে বিস্তারিত জানালে উপকৃত হবো।
৮. যদি কোনো শিশু মাসের ৯ তারিখে জন্মগ্রহণ করে, তাহলে সপ্তম দিনের আকীকা কোন তারিখে হবে? হিসাব করার সঠিক নিয়মটি দয়া করে বুঝিয়ে বলবেন।
৯. আকীকা কি সপ্তম দিনেই করা আবশ্যক, নাকি ১৪তম বা ২১তম দিনেও করা যায়?
১০. আকীকার মাংস কি পরিবারের সদস্যরা খেতে পারবেন? কুরবানির মতো তিন ভাগ করা কি জরুরি?
১১. নবজাতকের মাথার চুল মুণ্ডন করার সুন্নত সময় কখন? এটি কি আকীকার দিনেই করা উত্তম?
১২. মাথার চুল মুণ্ডন করে তার ওজন অনুযায়ী রুপা সদকা করার বিধান কী? এটি কি আকীকার দিনেই করতে হবে?
১৩. রুপার সমমূল্যের অর্থ সদকা করলে কি সুন্নতের উদ্দেশ্য আদায় হবে?
১৪. শিশুকে বদনজর, হিংসা বা অকল্যাণ থেকে রক্ষার জন্য কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক কী কী আমল রয়েছে? অর্থাৎ, শিশুকে হিফাজতে রাখার জন্য প্রতিদিন পড়ার মতো কোনো মাসনুন দোয়া বা আমল আছে কি?
১৫. শিশুর কপালে বা চোখে কাজল দেওয়া কি জায়েজ? বিশেষ করে কপালে গোল চিহ্ন দিয়ে কাজল লাগানোর কোনো শরয়ি ভিত্তি আছে কি?

### আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আপনার নিকট পেশ করছি:

১৬. নবজাতকের নাম রাখার উত্তম সময় কখন? জন্মের দিন, সপ্তম দিন, নাকি অন্য কোনো সময়?
১৭. ইসলামে সন্তানের জন্য কী ধরনের নাম রাখা উত্তম এবং কোন ধরনের নাম পরিহার করা উচিত?
১৮. শিশুর ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামত দেওয়ার বিষয়ে শরিয়তের সঠিক অবস্থান কী?
১৯. সন্তান জন্মের পর আত্মীয়-স্বজনের মিষ্টি বিতরণ বা আপ্যায়নের কোনো শরয়ি বিধান আছে কি?
২০. নবজাতকের জন্য বাবা-মায়ের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো কী, যা জন্মের পর থেকেই পালন করা উচিত?
২১. বাবা-মা সন্তানের জন্য নিয়মিত কোন কোন দোয়া করবেন, যাতে সে দ্বীনদার, নেককার এবং দুনিয়া-আখিরাতে সফল হয়?

সম্মানিত হুজুর, বিষয়গুলো আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সহিহ দিকনির্দেশনা কামনা করছি। আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে উত্তর প্রদান করলে আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন, আপনার ইলম, আমল ও দাওয়াতে বরকত দান করুন এবং আপনাকে সুস্থতা ও দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন। আমীন।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রশ্নগুলোর জন্য জাযাকুমুল্লাহু খাইরান। নিম্নে কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর প্রদান করা হলো:


১. স্ত্রীর প্রসব বেদনার সময় স্বামীর জন্য দোয়া/আমল:

  • দোয়া পড়া: স্বামী সূরা ইউসুফ (১২:৮৭) এর আয়াত "لَا تَيْأَسُوا مِنْ رَوْحِ اللَّهِ" পড়তে পারেন।
  • অন্যান্য আমল:
    • সূরা ফাতিহা, সূরা ফালাক ও নাস পড়ে স্ত্রীর পেটে ফুঁ দেওয়া।
    • "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু হালিমুল কারিম, সুবহানাল্লাহি রাব্বিল আরশিল আজিম" বেশি বেশি পড়া।
  • সহায়তা: স্ত্রীর পিঠে হালকা মালিশ করা ও পানি পান করানো।

২. গর্ভবতী নারীর জন্য প্রসবকালীন দোয়া/যিকির:

  • পড়বেন:
    • "রাব্বি লা তাযারনি ফারদাও ওয়া আনতা খাইরুল ওয়ারিসিন" (সূরা আম্বিয়া: ৮৯)।
    • "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রব্বুস সামাওয়াতি ওয়া রব্বুল আরদি রব্বুল আরশিল কারিম"।
    • সূরা মারইয়াম (১৯:২৩-২৬) তেলাওয়াত করা।
  • যিকির:
    • "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ" বেশি পড়া।
    • "আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা ফীহা" বলা।

৩. সন্তান জন্মের পর কানে আযান দেওয়ার সময়:

  • উত্তম: জন্মের সাথে সাথেই বা শিশুকে পরিষ্কার করার পরপরই আযান দেওয়া উচিত। রাসূল (সা.) নবজাতকের ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামত দিয়েছেন বলে হাদিসে বর্ণিত (আবু দাউদ, হাদিস: ৫১০৫)।

৪. আযান দেওয়ার পদ্ধতি ও শর্তসমূহ:

  • পদ্ধতি:
    • ডান কানে সাধারণ আযানের শব্দ বলবেন (আল্লাহু আকবার ৪ বার, আশহাদু... ইত্যাদি)।
    • বাম কানে ইকামত বলবেন (আল্লাহু আকবার ৪ বার, আশহাদু... ইত্যাদি)।
  • আওয়াজ: স্বাভাবিক আওয়াজে, উচ্চস্বরে না।
  • খেয়াল: শিশু যেন শান্ত থাকে, গোসল করানো অবস্থায় বা কোলে নিয়ে আযান দেবেন।

৫. ছেলে-মেয়ের জন্য আযানের বিধান:

  • পার্থক্য নেই: ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্ই ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামত দেওয়া সুন্নত।

৬. বাবা হিসেবে সন্তানকে কোলে নেওয়ার দোয়া:

  • দোয়া:
    • "আল্লাহুম্মা বারিক লি ফী মা ওয়াহাবতানা, ওয়া-জালহু ছালিহিন" (হে আল্লাহ, তুমি যা দিয়েছ তাতে বরকত দাও, তাকে নেককার বানাও)।
    • আরও পড়বেন: "রাব্বি হাবলি মিনাস সালিহিন" (সূরা সাফফাত: ১০০)।

৭. তাহনিকের সুন্নত পদ্ধতি ও সময়:

  • পদ্ধতি:
    • নেককার ব্যক্তি (যেমন বাবা বা কোনো আলেম) খেজুর বা মিষ্টি চিবিয়ে শিশুর মুখে দেবেন।
  • সময়: মায়ের বুকের দুধ দেওয়ার আগে তাহনিক করা সুন্নত। হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা.) নবজাতকের মুখে পবিত্র থুথু মিশ্রিত খেজুর দিয়েছেন (বুখারি, হাদিস: ৫৪৬৭)।

৮. আকীকার তারিখ নির্ধারণ (উদাহরণসহ):

  • নিয়ম: জন্মের ৭ম দিন হিসাব করলে প্রথম দিন ধরা হবে জন্মের দিন।
  • উদাহরণ:
    • ৯ তারিখে জন্ম → ১০ (১ম), ১১ (২য়), ১২ (৩য়), ১৩ (৪র্থ), ১৪ (৫ম), ১৫ (৬ষ্ঠ), ১৬ তারিখ ৭ম দিন
    • অর্থাৎ জন্মের দিন থেকে ৭ দিন গণনা করবেন।

৯. আকীকার সময়সীমা:

  • সপ্তম দিনে করা উত্তম। যদি সম্ভব না হয়, ১৪তম বা ২১তম দিনে করা যায়। হাদিসে এসেছে, "প্রতি সন্তান তার আকীকার বিনিময়ে বন্ধক থাকে; সপ্তম দিনে পশু জবাই করো, মাথা মুণ্ডন করো এবং নাম রাখো" (আবু দাউদ, হাদিস: ২৮৩৮)।

১০. আকীকার মাংস বিতরণ ও খাওয়া:

  • খাওয়া জায়েজ: পরিবারের সদস্যরা খেতে পারবেন।
  • তিন ভাগ: কুরবানির মতো তিন ভাগ করা জরুরি নয়, তবে সুন্নত। মাংস রান্না করে আত্মীয়-স্বজন ও গরিবদের খাওয়ানো উত্তম।

১১. মাথার চুল মুণ্ডনের সময়:

  • সুন্নত: আকীকার দিনেই মাথা মুণ্ডন করা উত্তম। হাদিসে এসেছে, "সপ্তম দিনে মাথা মুণ্ডন করো" (আবু দাউদ, হাদিস: ২৮৩৮)।

১২. চুলের ওজন অনুযায়ী রুপা সদকার বিধান:

  • ফরজ নয়, সুন্নত: চুল মুণ্ডন করে ওজন পরিমাণ রুপা (বা তার মূল্য) সদকা করা মুস্তাহাব।
  • সময়: আকীকার দিনে করাই উত্তম, তবে পরে করলেও সুন্নত আদায় হবে।

১৩. রুপার মূল্য সদকা করলে সুন্নত আদায়?

  • হ্যাঁ: রুপার সমমূল্যের অর্থ সদকা করলেও সুন্নতের উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে।

১৪. বদনজর থেকে হিফাজতের দোয়া:

  • প্রতিদিন পড়বেন:
    • সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস (সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার করে)।
    • আয়াতুল কুরসি (২:২৫৫) পড়ে শিশুর শরীরে ফুঁ দেওয়া।
    • দোয়া: "আউযু কুমা বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাহ মিন কুল্লি শাইতানিন হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ" (বুখারি, হাদিস: ৩৩৭১)।

১৫. কাজল দেওয়া ও কপালে চিহ্নের হুকুম:

  • কাজল জায়েজ: শিশুর চোখে কাজল দেওয়া জায়েজ, বিশেষ করে ইয়েমেনি কাজল (ইসমিদ) মুস্তাহাব।
  • কপালে গোল চিহ্ন: শরয়ি ভিত্তি নেই। এটি বিদআত বা জাহেলি প্রথা। শুধু চোখে কাজল দেওয়া সুন্নত।

১৬. নাম রাখার উত্তম সময়:

  • জন্মের দিন বা সপ্তম দিনে নাম রাখা মুস্তাহাব। রাসূল (সা.) নবজাতকের নাম সপ্তম দিনে রাখতেন (মুসলিম, হাদিস: ২১৪৭)।

১৭. ইসলামে নামের মানদণ্ড:

  • উত্তম নাম: আব্দুল্লাহ, আব্দুর রহমান, মুহাম্মাদ, নবীদের নাম।
  • পরিহার্য: আল্লাহ ছাড়া কারও দাসত্ববাচক নাম (যেমন: আব্দুশ শামস), কুশ্রী ও অশুভ অর্থের নাম।

১৮. ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামত:

  • সহিহ: হাদিসে "যে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, তার ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামত দাও" বর্ণিত (ইবনে আবি শায়বা, হাদিস: ২৪৩৩৩)। এটি সুন্নত।

১৯. সন্তান জন্মের পর মিষ্টি বিতরণ:

  • জায়েজ: তবে বাধ্যতামূলক নয়। মিষ্টি বা তাওবা বিতরণ করা বৈধ, তবে আকীকার মাধ্যমে আপ্যায়ন করাই উত্তম।

২০. নবজাতকের প্রতি বাবা-মায়ের দায়িত্ব:

  • প্রথম দায়িত্ব:
    • কানে আযান-ইকামত দেওয়া।
    • নাম রাখা ও তাহনিক করা।
    • আকীকা ও মাথা মুণ্ডন করা।
    • সুন্দর ও হালাল খাবার খাওয়ানো।
    • দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা করা।

২১. সন্তানের জন্য নিয়মিত দোয়া:

  • উত্তম দোয়া:
    • "রাব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়াতিনা কুররাতা আইয়ুন" (সূরা ফুরকান: ৭৪)।
    • "রাব্বি হাবলি হুকমান ওয়া আলহিকনি বিস সালিহিন" (সূরা শুআরা: ৮৩)।

আল্লাহ তাআলা আপনার সন্তানকে নেককার, দ্বীনদার ও সুস্থ রাখুন। আমিন।

আল্লাহ-ই ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.