পায়ুপথ সহবাস, হায়েজ অবস্থায় সহবাস, ওরাল সেক্স, স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ, স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়া সহ বিস্তারিত মাসয়ালা।
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
সহবাসের সময় পুরুষের জন্য যা করণীয় ও বর্জনীয়: ইসলামি নির্দেশনা (হানাফি মতে)
শরীয়তে দাম্পত্য সম্পর্ক অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। সহবাসের সময় স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য কিছু আদব ও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। উত্তেজনার কারণে অনেক সময় মানুষ অজান্তে হারাম বা গুনাহের কাজে লিপ্ত হতে পারে। তাই সতর্কতার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জানা জরুরি।
✅ সহবাসের সময় পুরুষের জন্য হারাম ও গুনাহের কাজ (যা থেকে বিরত থাকা wajib):
| শ্রেণি | বিস্তারিত | দলিল (হানাফি কিতাব) | |--------|-----------|---------------------| | পায়ুপথে সহবাস (লিওয়াত) | পুরুষের পায়ুপথে সহবাস করা বা স্ত্রীর পায়ুপথে সহবাস করা হারাম। এটি কাবিরা গুনাহ। | রদ্দুল মুহতার (৬/৩৭১): "পায়ুপথে সহবাস করা হারাম এবং এটি কবীরা গুনাহ।" ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৫৬) | | হায়েজ ও নিফাস অবস্থায় সহবাস | স্ত্রীর মাসিক (হায়েজ) বা সন্তানপ্রসবের পর (নিফাস) রক্তপাত চলাকালে সহবাস করা হারাম। রক্ত বন্ধ হওয়ার পর গোসল করে ফরজ হলেই সহবাস জায়েজ। | কুরআন (সূরা বাকারা: ২২২) - "তুমি হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকো..." রদ্দুল মুহতার (১/২৯৪) | | রোজা বা ইহরাম অবস্থায় সহবাস | রমজানের রোজা বা কাজা রোজা অবস্থায় সহবাস করলে রোজা ভেঙ্গে যায় এবং গুনাহ ও কাফফারা wajib হয়। ইহরাম অবস্থায় সহবাস করলে হজ্জ/উমরা নষ্ট হয়। | হেদায়া (১/২২৩), ফাতাওয়া আলমগীরী (১/২০৪) | | স্ত্রীর সামনে বা প্রকাশ্যে সহবাস | দরজা বন্ধ, পর্দা ও গোপনীয়তা না রেখে সহবাস করা গুনাহ। সতর (লজ্জাস্থান) অন্যের সামনে প্রকাশ করা হারাম। | বাহিশ্তি জেওর (ভলিউম ২, অধ্যায়: বিবাহ ও সহবাসের আদব) | | স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ | কোনো ওষুধ বা অপারেশনের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে বন্ধ্যাকরণ (নসবন্ধি) করা হারাম, যদি না কোনো জরুরি চিকিৎসা কারণ থাকে। | ফাতাওয়া উসমানী (৩/৪৫০) - "বিনা কারণে বন্ধ্যাকরণ জায়েজ নয়।" | | কৃত্রিম লিঙ্গ বা নিষিদ্ধ বস্তু ব্যবহার | স্ত্রীর সাথে সহবাসে কৃত্রিম লিঙ্গ বা অনুরূপ হারাম উপকরণ ব্যবহার করা হারাম। হাত বা শরীরের অন্য অংশ দিয়ে উত্তেজনা সহায়ক জায়েজ, তবে তা শালীনতার সীমার মধ্যে হতে হবে। | ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৩৫) - "যৌন উত্তেজক নিষিদ্ধ বস্তু ব্যবহার করা জায়েজ নয়।" | | গিলতে থাকা অবস্থায় বীর্যপাত বা মযি | মুখে বা ওরাল সেক্সের সময় বীর্যপাতালে বা মযি (প্রি-ইজাকুলেট) গিলে ফেলা হারাম। তবে শুধু উত্তেজনার জন্য মুখে নেওয়া বা চোষা মাকরূহ তানযীহী (অপছন্দনীয়) বলে অনেক হানাফি আলেম মত দিয়েছেন। নিরাপদ পন্থা হলো এড়িয়ে চলা। | শারহু মাআনিল আসার (৩/২২২) - "বীর্যপাতাল গিলে ফেলা নাজাসাত (অপবিত্রতা) খাওয়ার শামিল।" ফাতাওয়া শামী | | স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়া বা ব্যথা সৃষ্টি করা | অতি রুক্ষ আচরণ, জোরপূর্বক বা এমন ভঙ্গি যা স্ত্রীর শারীরিক বা মানসিক কষ্ট দেয়, তা গুনাহ। ইসলামে দাম্পত্য সম্পর্ক সহানুভূতি ও মায়ার উপর ভিত্তি করে। | বাহিশ্তি জেওর (ভলিউম ২) - "স্ত্রীর সাথে নম্র ও স্নেহপূর্ণ আচরণ করা সুন্নত।" |
🔍 বিশেষ সতর্কতা (উত্তেজনাজনিত কাজ)
- ওরাল সেক্স : হানাফি মতে, স্ত্রীর লজ্জাস্থান চোষা বা চাটা জায়েজ, তবে যদি কোনো নাপাকি (বীর্য, মযি, রক্ত) মুখে আসে এবং গিলে ফেলে তাহলে হারাম। নিরাপদ হচ্ছে এটি পুরোপুরি এড়িয়ে চলা। (ফাতাওয়া উসমানী ২/৪৫৮)
- স্বহস্তে বীর্যপাত (মাস্টারবেশন) : স্ত্রীর উপস্থিতিতে নিজের হাতে বীর্যপাত করানো হারাম (কেননা এটি বীজ নষ্ট ও অপব্যয়)। তবে স্ত্রীর হাতে বা শরীরে তা করা জায়েজ, যদি তা তার সম্মতিতে হয়। (আল-হিদায়া ২/৩২৫)
- কন্ডোম বা গর্ভনিরোধক : অস্থায়ী গর্ভনিরোধক (যেমন কন্ডোম, পিল) স্ত্রীর সম্মতিতে ব্যবহার করা জায়েজ, তবে স্থায়ী নয়। এতে উত্তেজনায় কোনো নিষেধ নেই। (ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪/২৩৬)
✅ সুন্নত ও মুস্তাহাব (যা করলে সওয়াব)
- সহবাসের আগে বিসমিল্লাহ পড়া ও মুনাজাত করা।
- স্ত্রীকে প্রস্তুত করা, প্রেম-ভালোবাসার কথা বলা (সুন্নত)।
- সহবাসের পর গোসল করা (যদি বীর্যপাত না হয় তাহলে অযু করা মুস্তাহাব)।
- ডান কাতে শোয়া ও কবুল করা যে এটি ইবাদতের নিয়তে করা।
📖 প্রামাণ্য কিতাবের তালিকা
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) - ৬ খণ্ড (হানাফি ফিকহের প্রধান গ্রন্থ)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানি) - ২য় ও ৩য় খণ্ড
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী) - ৪র্থ খণ্ড
- বাহিশ্তি জেওর (মাওলানা থানভী) - ২য় ভলিউম (বিবাহ ও দাম্পত্য অধ্যায়)
- ফাতাওয়া আলমগীরী (হিন্দের ফতোয়া) - ১ম খণ্ড
- শারহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবী) - ৩য় খণ্ড
উপসংহার:
শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে দাম্পত্য জীবন যাপন করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। উত্তেজনা কখনো এমন কাজ করিয়ে দিতে পারে যা পরবর্তীতে লজ্জা ও অনুতাপের কারণ হয়। তাই উপরোক্ত বিষয়গুলো জানা রাখা এবং তা মেনে চলা জরুরি। কোনো সন্দেহ থাকলে বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির কাছে জিজ্ঞাসা করা উচিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্র জীবনযাপনের তৌফিক দান করুন।