নেসাবের বৎসর পুর্ণ হওয়ার আগে কি যাকাত দেয়া যাবে?
Zakat and Charity · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেবগণ,
গতো রমজানে জেনেছিলাম এ বছরের যাকাতের নিসাব ৫২.৫ রুপার (২২ ক্যারেট) পাইকারি দাম অনুসারে ২ লাখ ২৯ হাজার টাকার মতো।
আমার ব্যাংক একাউন্টে গতো ফেব্রুয়ারিতে জমা হয়েছিলো ২ লাখ ১৩ হাজার টাকা। এবং মার্চে জমা হয়েছিলো ২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এবং এপ্রিলে জমা হয় ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
তাহলে রুপার নেসাবের হিসাবে আমার এই বছরের মার্চ মাসের ৯ তারিখ তথা ১৯ রমজান থেকে আগামী বছর ১৯ রমজান হবে আমার মালের উপর অতিবাহিত হওয়ার সময়কাল।
এখন আমার প্রশ্ন হলো আমি চাই রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই কিংবা পরে যাকাত আদায় করে ফেলতে। এখন নেসাবের সময় পুর্ণ হওয়ার আগে বা পরে আমি যাকাত আদায় করতে পারবো কি না এটা যদি জানাতেন খুবই ভালো হতো।
জাযাকাল্লাহু খাইরান কাসিরান।
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
মুফতি সাহেবগণের নিকট থেকে জবাব:
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় হলো: যাকাতের নেসাব পূর্ণ হওয়ার পূর্বে বা পরে যাকাত আদায় করা জায়েয কি না?
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য দুটি শর্ত পূরণ হওয়া জরুরি:
- নেসাবের পরিমাণ (৫২.৫ তোলা রুপার মূল্য) সম্পদের উপর বিদ্যমান থাকা।
- এক চান্দ্র বছর (৩৫৪ দিন) নেসাব পরিমাণ সম্পদ মালিকানায় থাকা।
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- ফেব্রুয়ারি মাসে আপনার ব্যাংক ব্যালেন্স ছিল ২,১৩,০০০ টাকা (যা নেসাবের নিচে)।
- মার্চ মাসে তা বেড়ে ২,৪৮,০০০ টাকা হয় (যা নেসাবের উপরে)।
- এপ্রিল মাসে তা ২,৮৫,০০০ টাকা হয়।
সুতরাং, আপনার উপর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার সময় শুরু হয়েছে মার্চ মাসের ৯ তারিখ (১৯ রমজান) থেকে, যখন আপনার সম্পদ প্রথমবার নেসাবের উপরে পৌঁছেছে। আর এই তারিখ থেকে পরবর্তী বছর পর্যন্ত আপনার সম্পদ নেসাবের উপরে থাকলে পরবর্তী বছরের ১৯ রমজান আপনার যাকাতের বছর পূর্ণ হবে।
যাকাত আদায়ের সময়সীমা সম্পর্কে হানাফি ফিকহের বিধান:
১. নেসাব পূর্ণ হওয়ার পূর্বে যাকাত আদায় করা:
- অনুমোদিত নয়। কারণ তখন যাকাত ওয়াজিব হয়নি। আপনি যদি নেসাব পূর্ণ হওয়ার আগে (যেমন ফেব্রুয়ারি মাসে) যাকাত দেন, তবে তা যাকাত হিসেবে গণ্য হবে না; বরং নফল সদকা হবে। (রদ্দুল মুহতার, ২/২৬৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৭১)
২. নেসাব পূর্ণ হওয়ার পর কিন্তু বছর পূর্ণ হওয়ার আগে যাকাত আদায় করা:
- জায়েয। অর্থাৎ, আপনি যদি মার্চ মাসের ৯ তারিখ (নেসাব পূর্ণ হওয়ার পর) থেকে পরবর্তী বছরের ১৯ রমজানের মধ্যে যাকাত আদায় করেন, তবে তা সহীহ হবে। তবে শর্ত হলো, আপনি নিশ্চিত হবেন যে আগামী বছরের শেষ পর্যন্ত আপনার সম্পদ নেসাবের নিচে নামবে না। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৩; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩২)
- উদাহরণ: আপনি যদি ২০২৭ সালের রমজানের শুরুতে (যেমন ১লা রমজান) যাকাত দিতে চান, কিন্তু আপনার বছর পূর্ণ হচ্ছে ১৯ রমজান, তাহলে তা জায়েয হবে যদি আপনার নিকট বর্তমানে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে এবং আপনি নিশ্চিত হন যে তা বছরের শেষ পর্যন্ত থাকবে।
৩. বছর পূর্ণ হওয়ার পর যাকাত আদায় করা:
- ওয়াজিব। এটি সময়মতো আদায় করা সবচেয়ে উত্তম। তবে বিলম্ব করলে গুনাহ হবে না, তবে দেরি করা মাকরুহ। (রদ্দুল মুহতার, ২/২৬৯)
আপনার জন্য করণীয়:
- আপনার যাকাতের বছর শুরু হয়েছে ২০২৪ সালের মার্চ মাসের ৯ তারিখ থেকে (১৯ রমজান)।
- আপনি চাইলে ১৯ রমজানের আগে (যেমন রমজানের শুরুর দিকে) যাকাত দিতে পারবেন না, কারণ তখন আপনার নেসাব পূর্ণ হওয়ার সময় পূর্ণ হয়নি (ফেব্রুয়ারিতে আপনার সম্পদ নেসাবের নিচে ছিল)।
- আপনি চাইলে ১৯ রমজানের পর যে কোনো সময় (যেমন শাওয়াল মাসে) যাকাত দিতে পারেন। তবে সবচেয়ে ভালো হবে রমজান মাসেই যাকাত আদায় করা, কারণ এতে সওয়াব বেশি।
- বছর পূর্ণ হওয়ার পর (অর্থাৎ পরবর্তী ১৯ রমজান পর্যন্ত অপেক্ষা না করে) যাকাত আদায় করে ফেলা জায়েয, তবে এতে বছর পূর্ণ হওয়ার আগে যাকাত দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করুন (যেমন আপনার নেসাব বজায় থাকার নিশ্চয়তা থাকলে)।
মোট কথা:
- নেসাব পূর্ণ হওয়ার আগে যাকাত দেওয়া জায়েয নেই।
- নেসাব পূর্ণ হওয়ার পর (মার্চের ৯ তারিখ থেকে) আপনি যেকোনো সময় যাকাত দিতে পারেন, তবে বছর পূর্ণ হওয়ার আগে দিলে তা সহীহ হবে শর্তসাপেক্ষে।
- সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি: ১৯ রমজান (মার্চের ৯ তারিখ) থেকে আপনার বছর শুরু, তাই আপনি ১৯ রমজান বা তার পরবর্তী বছর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে একই বছরের যেকোনো সময় যাকাত দিয়ে দিন।
উত্তম পদ্ধতি:
আপনার যাকাতের হিসাব সহজ করতে প্রতি বছর রমজান মাসের প্রথম দিকে আপনার সমস্ত সম্পদের হিসাব করে যাকাত আদায় করুন। এটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ও সহজ পদ্ধতি।
আল্লাহ তাআলা আপনার যাকাত কবুল করুন এবং আপনার সম্পদে বরকত দিন।