অনিদ্রা দূর করার ইসলামিক উপায় কি?

Faith and Belief · Ahle Hadith / Salafi

Questioner: Al Aisha
Question Asked: 05 Jun 2026, 11:09 PM
Reviewed & Published: 05 Jun 2026, 11:12 PM
Views: 6
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ঘুম না আসার কারন এবং ঘুম না আসলে সহিহ হাদিস অনুযায়ী কি কি আমল করতে পারি?

Answer

প্রশ্ন: ঘুম না আসার কারণ এবং ঘুম না আসলে সহিহ হাদিস অনুযায়ী কি কি আমল করতে পারি?

উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আলহামদুলিল্লাহ ওয়াস্সালাতু ওয়াস্সালামু আলা রাসুলিল্লাহ।

ঘুম না আসার কারণ শারীরিক (যেমন উদ্বেগ, মানসিক চাপ, রোগ, ক্যাফেইন) এবং আধ্যাত্মিক (যেমন গুনাহের কারণে বরকত কমে যাওয়া, শয়তানের ওয়াসওয়াসা) উভয়ই হতে পারে। শরিয়ত নির্দেশিত আমল ও দু‘আর মাধ্যমে ঘুমের ব্যাঘাত দূর করা সম্ভব। নিচে সহিহ হাদিস ও সালাফে সালেহীনের নির্দেশনা অনুযায়ী আমলসমূহ উল্লেখ করা হলো।


ঘুমানোর আগে করণীয় আমল (সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে)

  1. ওযু করে ডান কাতে শোয়া
    রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “তুমি যখন শোতে চাও, তাহলে নামাজের ওযুর মতো ওযু করো, তারপর ডান কাতে শোও।”
    (সহিহ বুখারী, হাদীস: ২৪৭; সহিহ মুসলিম, হাদীস: ২৭১০)

  2. আয়াতুল কুরসি ও শেষ তিন সূরা (ইখলাস, ফালাক, নাস) পড়া
    রাসূল (ﷺ) প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে দু’হাত একত্র করে ‘কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’, ‘কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক’ ও ‘কুল আউযু বিরাব্বিন্নাস’ পড়ে ফুঁ দিয়ে সারা শরীরে হাত বুলাতেন। (সহিহ বুখারী, হাদীস: ৫০১৭)
    আর আয়াতুল কুরসি পড়লে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক থাকে এবং শয়তান সকাল পর্যন্ত কাছে আসতে পারে না। (সহিহ বুখারী, হাদীস: ২৩১১)

  3. শেষ দুই আয়াত সূরা বাকারা (২৭৫-২৮৬) পড়া
    রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়বে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে (রক্ষাকারী হিসেবে)।”
    (সহিহ বুখারী, হাদীস: ৫০০৮; সহিহ মুসলিম, হাদীস: ৮০৭)

  4. ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা আমুতু ওয়া আহয়া’ পড়া
    ঘুমানোর সময় বলবেন: اللَّهُمَّ بِاسْمِكَ أَمُوتُ وَأَحْيَا
    (উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহয়া)
    (সহিহ বুখারী, হাদীস: ৬৩১৪)

  5. তাসবীহ (৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৪ বার আল্লাহু আকবার) পড়া
    রাসূল (ﷺ) ফাতিমা (রা.)-কে শিখিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারী, হাদীস: ৩১১৩; সহিহ মুসলিম, হাদীস: ২৭২৭)

  6. দু‘আ পড়া
    بِاسْمِكَ رَبِّ وَضَعْتُ جَنْبِي، وَبِكَ أَرْفَعُهُ، فَإِنْ أَمْسَكْتَ نَفْسِي فَارْحَمْهَا، وَإِنْ أَرْسَلْتَهَا فَاحْفَظْهَا بِمَا تَحْفَظُ بِهِ عِبَادَكَ الصَّالِحِينَ
    (উচ্চারণ: বিসমিকা রাব্বি ওয়াদা‘আতু জানবী, ওয়া বিকা আরফাউহু, ফাঈন আমসাকতা নাফসী ফারহামহা, ওয়া ইন আরসালতাহা ফাহফাজহা বিমা তাহফাজু বিহি ‘ইবাদাকাস সালিহীন।)
    (সহিহ বুখারী, হাদীস: ৬৩২০)


ঘুম না আসলে করণীয় আমল (সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে)

  1. নিম্নোক্ত দু‘আ পড়া
    এক সাহাবী রাসূল (ﷺ)-এর কাছে ঘুম না আসার অভিযোগ করলে তিনি বললেন:
    “তুমি যখন শোবে, তখন বলো: لا إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ، رَبُّ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا الْعَزِيزُ الْغَفَّارُ
    (সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস: ৩৪০০; সহিহুল জামে, হাদীস: ৪১৩১)
    আরেকটি বর্ণনায় এসেছে:
    اللَّهُمَّ غَارَتِ النُّجُومُ وَهَدَأَتِ الْعُيُونُ وَأَنْتَ حَيٌّ قَيُّومٌ، لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ، يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ، أَهْدِئْ لَيْلِي وَأَنِمْ عَيْنِي
    (সহিহ ইবন হিব্বান, হাদীস: ৫৫৩১)

  2. সূরা আল-মুলক (তাবারাকাল্লাজী) পড়া
    রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “সূরা মুলক কুরআনের তিরিশ আয়াত বিশিষ্ট একটি সূরা; যে ব্যক্তি তা পাঠ করে, সে কবরের আজাব থেকে রক্ষা পায়।” এটি ঘুমের সময় নিয়মিত পড়লে প্রশান্তি আসে। (সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস: ২৮৯১; সহিহুল জামে, হাদীস: ৩৬৪৩)

  3. শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা
    ঘুম না এলে শয়তান উদ্বেগ ও কল্পনা জাগিয়ে তোলে। তখন বলবেন:
    أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
    এবং ডান কানে আযান বা বাম কানে ইকামত দেওয়া সম্পর্কে হাদিসে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। (তবে এটি দুর্বল বর্ণনা, বরং সরাসরি কুরআন ও যিকির করাই উত্তম।)

  4. মানসিক চিন্তা দূর করার জন্য দু‘আ
    রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি দুশ্চিন্তা বা পেরেশানির সম্মুখীন হয়, সে যেন বলেঃ اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ، وَابْنُ عَبْدِكَ، وَابْنُ أَمَتِكَ، نَاصِيَتِي بِيَدِكَ... (সুনান ইবন মাজাহ, হাদীস: ৩৮০৩; সহিহুল জামে, হাদীস: ৩৫০৮)


শাইখদের বক্তব্য থেকে সারসংক্ষেপ

  • শাইখ ইবন বায (রহ.) বলেছেন: “ঘুম না আসলে ব্যক্তি যেন আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস ও শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে। আরও বেশি করে ইস্তিগফার ও দু‘আ করবে।”
    (মাজমু’ ফাতাওয়া, ২৬/৩২২)

  • শাইখ আল-আলবানী (রহ.) সহিহুল জামে’তে ঘুমের বিভিন্ন দু‘আ ও যিকির সংকলন করেছেন এবং বলেছেন: “এসব যিকিরের মাধ্যমে শয়তান দূর হয় এবং ঘুম সহজ হয়।”

  • শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেছেন: “ঘুম না আসার কারণ যদি গুনাহ হয়, তবে তওবা করতে হবে। আর যদি শারীরিক হয়, তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জায়েয। তবে যিকির ও দু‘আ সব অবস্থায় উপকারী।”

  • শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেছেন: “ঘুমানোর আগে কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির করা সুন্নত। যদি তা সত্ত্বেও ঘুম না আসে, তবে তাহাজ্জুদ পড়া এবং আল্লাহর কাছে দু‘আ করতে থাকা উচিত।”


বিশেষ নোট

  • ঘুমের ব্যাঘাত কখনো কখনো জিন বা শয়তানের প্রভাবের কারণেও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিয়মিত রুকইয়াহ শরইয়্যাহ (সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, শেষ দুই সূরা ফুঁক দিয়ে পড়া) করা জরুরি।
  • চিকিৎসার প্রয়োজন হলে দ্বিধা করবেন না, কারণ নবী (ﷺ) বলেছেন: “তোমরা চিকিৎসা করো, কেননা আল্লাহ প্রতিটি রোগের নিরাময় দিয়েছেন।” (সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৩৮৫৫; সহিহুল জামে, হাদীস: ২৮৮০)

উপসংহার: ঘুম না আসলে সর্বপ্রথম আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে উপরোক্ত সহিহ হাদিসের আমলগুলো করুন। পাশাপাশি গুনাহ থেকে তওবা করুন এবং অন্তরকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন। যদি দীর্ঘদিন সমস্যা থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আল্লাহ তাআলা সবাইকে সুস্থতা ও প্রশান্তি দান করুন। আমীন।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
ড. মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম
ইসলামি গবেষক ও সালাফি আকিদার অনুসারী



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.