অমুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করলে কি তাকে দ্বীন না মানার কারণে শাস্তি দেয়া হবে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলামী আকীদা ও ফিকহের একটি মৌলিক বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। যে শিশু বা ব্যক্তি অমুসলিম পরিবেশে জন্মগ্রহণ করে এবং তার নিকট ইসলামের সঠিক দাওয়াত পৌঁছে না, তার ব্যাপারে ইসলামী বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট। কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফকীহগণের মতামত অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা হাশরের দিনে তার সাথে ইনসাফ ও রহমতের সাথে ব্যবহার করবেন। নিম্নে বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনা করা হলো:
১. কুরআন ও হাদীসের আলোকে মূলনীতি
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আমি রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেই না।"
(সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:১৫)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে, কোন ব্যক্তির নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো না হলে, তাকে শাস্তি দেওয়া হবে না। এটি ইসলামের মৌলিক নীতি।
হাদীসে এসেছে:
"তিন ব্যক্তি আছে, যাদের থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে (অর্থাৎ তাদের আমলনামা লেখা হয় না): (১) ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগে, (২) নাবালেগ শিশু যতক্ষণ না বালেগ হয়, এবং (৩) পাগল ব্যক্তি যতক্ষণ না সুস্থ হয়।"
(সুনান আবু দাউদ, হাদীস: ৪৪০৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ৯৪০)
এছাড়াও হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়নি, তাকে কিয়ামতের দিন বিশেষভাবে পরীক্ষা করা হবে। যেমন, একটি দীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
"কিয়ামতের দিন এমন একদল লোককে আনা হবে, যারা দুনিয়াতে ইসলামের দাওয়াত পায়নি। তাদেরকে একটি পরীক্ষা দেওয়া হবে। তাদের বলা হবে, 'তোমাদের প্রভুর আদেশ মেনে চলো।' তারপর তাদেরকে আগুনের মধ্যে প্রবেশ করার নির্দেশ দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি আনুগত্য করবে, সে জান্নাতে যাবে; আর যে অবাধ্য হবে, সে জাহান্নামে যাবে।"
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৮৭৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ১২৮৩২)
এ থেকেই বুঝা যায়, যারা দুনিয়াতে সঠিক দাওয়াত পায়নি, তাদের জন্য কিয়ামতের দিন একটি পৃথক বিচার পদ্ধতি থাকবে। আল্লাহ তাদের ফিতরাত (প্রাকৃতিক স্বভাব) ও জ্ঞানের ভিত্তিতে পরীক্ষা করবেন।
২. হানাফী ফকীহগণের মতামত
ইমাম আবু হানীফা (رحمه الله) ও তার অনুসারী ফকীহগণ এ বিষয়ে বলেন:
যে ব্যক্তি ইসলামের দাওয়াত পায়নি, বা দাওয়াত পেলেও তা বিকৃত ও ভুলভাবে পেয়েছে, অথবা তার বুদ্ধি-বিবেচনা এমন অবস্থায় ছিল যে সে সত্য উপলব্ধি করতে পারেনি—তাকে আল্লাহ তাআলা শাস্তি দেবেন না। বরং তার প্রতি আল্লাহর ইনসাফ ও রহমতই কার্যকর হবে।
-
ইবনে আবেদীন শামী (رحمه الله) তার বিখ্যাত গ্রন্থ "রদ্দুল মুহতার" -এ বলেন:
"যে ব্যক্তি কুফরী অবস্থায় মারা যায়, কিন্তু তার নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি, তাহলে সে মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে না, তবে তার শাস্তির ব্যাপারে আল্লাহর ইচ্ছা কার্যকর হবে। অধিকাংশ আলেমের মতে, আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন না।"
(রদ্দুল মুহতার, ৪/২৫৪) -
মুফতি মুহাম্মদ শফী (رحمه الله) তার তাফসীর "মাআরিফুল কুরআন" -এ সূরা বনী ইসরাঈলের ১৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
"এই আয়াত প্রমাণ করে যে, রাসূল প্রেরণ ও দাওয়াত পৌঁছানো ছাড়া আল্লাহ কাউকে শাস্তি দেন না। তাই দুনিয়ার যেসব অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেনি, সেখানকার অধিবাসীগণ কিয়ামতের দিন শাস্তি পাবে না। বরং তাদেরকে কিয়ামতের দিন একটি বিশেষ পরীক্ষা দেওয়া হবে, যা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।"
(মাআরিফুল কুরআন, ৫/৪৪৭) -
মুফতি তাকী উসমানী (دامت بركاتهم) তার ফতোয়াসমগ্র "ফাতাওয়া উসমানী" -তে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে বলেন:
"যারা ইসলামের নামই শোনেনি বা সঠিক দাওয়াত পায়নি, তাদের ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা (رحمه الله) -এর মত হলো—তারা জাহান্নামী হবে না। বরং তাদের সাথে আল্লাহর ইনসাফ অনুযায়ী আচরণ করা হবে। তবে যারা ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করে বা দাওয়াত পেয়ে তা অস্বীকার করে, তারা জাহান্নামী হবে।"
(ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২)
৩. শিশুটির অবস্থা: "আহলে ফাতরা" (দাওয়াতের সুযোগহীন)
উল্লিখিত শিশুটি মূলত "আহলে ফাতরা" -র অন্তর্ভুক্ত। ফাতরা অর্থ হলো—দুই নবীর মধ্যবর্তী সময় বা দাওয়াত পৌঁছানোর সুযোগহীন ব্যক্তি। এই শ্রেণীর লোকদের ব্যাপারে ইসলামী আকীদা হলো:
- তাদের নিকট যদি আল্লাহর একত্ববাদ ও ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছে না থাকে, তাহলে তারা কুফরী অবস্থায় মারা গেলেও তাদের শাস্তি হবে না।
- তাদেরকে কিয়ামতের দিন একটি বিশেষ পরীক্ষা দেওয়া হবে—যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে (আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দেওয়ার পরীক্ষা)।
- যে ব্যক্তি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, সে জান্নাতে যাবে; আর যে ব্যর্থ হবে, সে জাহান্নামে যাবে। তবে হাদীসের বর্ণনা মতে, অধিকাংশই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে।
৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনি যে শিশুটির কথা বলেছেন, যে অমুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এবং ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানে না—তার বিচার হাশরের দিন নিম্নরূপ হবে:
১. দায়মুক্তি: যেহেতু সে ইসলামের সঠিক দাওয়াত পায়নি, তাই তার উপর শাস্তি আরোপিত হবে না।
২. বিশেষ পরীক্ষা: কিয়ামতের দিন তাকে আল্লাহ তাআলা একটি বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করবেন, যা তার ফিতরাত ও জ্ঞানের ভিত্তিতে হবে।
৩. আল্লাহর রহমতের আশা: ইমাম আবু হানীফা ও অন্যান্য হানাফী ফকীহগণের মতে, এই ধরনের ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহর রহমতের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
৪. ইনসাফের নীতি: আল্লাহ তাআলা কখনো কারো প্রতি জুলুম করেন না। তিনি প্রত্যেককে তার জ্ঞান, সামর্থ্য ও প্রাপ্ত দাওয়াত অনুযায়ী বিচার করবেন।
৫. গুরুত্বপূর্ণ নোট
- যদি শিশুটি বালেগ হওয়ার পরও ইসলাম সম্পর্কে জানার কোনো চেষ্টা না করে এবং উদাসীন থাকে, তাহলে তার ব্যাপার ভিন্ন। কারণ, প্রতিটি মানুষের ফিতরাত (প্রাকৃতিক স্বভাব) তাকে আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্ববাদ সম্পর্কে সচেতন করে। তাই সত্য অনুসন্ধানের চেষ্টা না করলে সে দায়ী হবে।
- তবে প্রশ্নে উল্লিখিত পরিস্থিতিতে শিশুটি সম্পূর্ণ অজ্ঞ ও দাওয়াতের বাইরে থাকলে, ইনশাআল্লাহ সে শাস্তি পাবে না বরং আল্লাহর রহমতের অন্তর্ভুক্ত হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং হাশরের দিন আমাদের প্রতি রহম করুন।
আমীন।
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত কিতাবসমূহ:
- কুরআনুল কারীম (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:১৫)
- সহীহ মুসলিম (হাদীস: ২৮৭৫)
- সুনান আবু দাউদ (হাদীস: ৪৪০৩)
- রদ্দুল মুহতার (৪/২৫৪)
- মাআরিফুল কুরআন (৫/৪৪৭)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪২)
- আল-হিদায়া (ফিকহের কিতাব)
- উসুলুশ শাশী (হানাফী উসুলের কিতাব)