নফল নামাজে হাই তোলার সময় মনে খারাপ চিন্তা আসা ও বার বার চেক করা নিয়ে হানাফি ফিকহের বিস্তারিত উত্তর। ঈমান ও বিবাহিত জীবনের সুরক্ষা বিষয়ে ইসলামি নির্দেশনা।

Faith and Belief · Hanafi

Questioner: Riha Moni
Question Asked: 28 May 2026, 03:18 PM
Reviewed & Published: 28 May 2026, 03:39 PM
Views: 3
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
হুজুর আমি রাতে এমনি নফল নামাজ পড়তেছিলাম। পড়ে আমার নামাজে হাই ঊঠছে, আমি মুখ হা করে হাই তুলতেছি নামাজেই। যখনই মুখ হা করলাম তখন ই আমার মনে মনে আল্লাহ কে নিয়ে বাজে কথা আসলো। আস্তাগফিরুল্লাহ। এখন আমার মনে হইতেছে মুখেই বলে ফেললাম কিনা। অনেক কষ্ট করে মন কে বুঝাইলাম মুখে কিছু বলি নাই।

তাও মন মানে না। পরে নামাজ শেষ করে আবার কয়েকবার মুখ হা করে জিহবা নাড়িয়ে বাজে কথা গুলা বলেছি মনে মনে। দেখতে সাউন্ড হয় কিনা। খেয়াল করলাম জাস্ট জিহবা নড়ে, অন্য কোনো সাউন্ড হয় নাই। এভাবে কয়েকবার ইসলাম নিয়ে বাজে কথা গুলা বললাম জিহবা নাড়ায়ে। শুধু চেক করার জন্য সাউন্ড হয় কিনা।

♦এই প্রশ্নের উত্তর সম্মানিত মুফতি সাহেব দিয়েছেন যে, " মুখ না খুলে শুধু জিহবা নাড়ালে সেটাকে কথা ধরা হবে না। কিন্তু আমি তো মুখ খুলে মানে মুখ হা করে জিহবা নাড়িয়ে বাজে কথা গুলা বলে চেক করেছি। আমি শুধু জোরে জোরে শাস নেয়ার সাউন্ড পেয়েছি। আর কিছু সাউন্ড পাইনি। আসলে শাস নেয়ার সময় হা করে জিহবা নাড়িয়ে বাজে কথা গুলা বলতেছিলাম দেখে আমার মনে হইতেছে যে মুখেই বলে ফেললাম কিনা। আবার অনেক সময় দেখা যায় কিছু ফু দিয়ে খাইতে গেলাম। তখনো ফু দেয়ার সাথে সাথে কিছু একটা বলে ফেলি।♦

১) এখন মুখ হা করে, ফু দেয়ার সময়, জিহবা নাড়িয়ে, বার বার বাজে কথা গুলা চেক করা এগুলো কি কথা ধরা হবে?

২) বাজে কথা গুলা বলে বার বার চেক করার কারনে কি আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

৩) আমার ঈমান আর বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে?

Answer

উত্তর:
ওয়ালাইকুমুসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আপনার প্রশ্নটি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, শয়তানের ওয়াসওয়াসা (খারাপ চিন্তা) মুমিনের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ। এতে আপনি একা নন, অনেক সাহাবীও এর শিকার হয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "শয়তান মানুষের অন্তরে ওয়াসওয়াসা ঢেলে দেয়, এমনকি সে জিজ্ঞেস করে: 'কে সৃষ্টি করল? কে সৃষ্টি করল?' যতক্ষণ না সে বলে: 'আল্লাহই সব সৃষ্টি করেছেন।'" (বুখারি, মুসলিম)। তাই অন্তরে আসা খারাপ চিন্তার জন্য আপনি দায়ী হবেন না, যতক্ষণ তা মুখে উচ্চারণ না করেন বা কাজে পরিণত না করেন।

প্রশ্ন ১: মুখ হা করে, ফু দেয়ার সময়, জিহবা নাড়িয়ে বার বার বাজে কথা চেক করা কি কথা ধরা হবে?

  • হানাফি ফিকহের মূলনীতি: কথা বলার শর্ত হলো (ক) অর্থপূর্ণ শব্দ উচ্চারণ করা এবং (খ) মুখ থেকে আওয়াজ বের হওয়া। যদি আপনি মুখ হা করে শুধু জিহবা নাড়ান কিন্তু কোনো আওয়াজ (যেমন 'আলিফ', 'বা' ইত্যাদি স্পষ্ট অক্ষর) না বের হয়, তাহলে তা 'কথা' হিসেবে গণ্য হবে না। কিন্তু আপনি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ হা করে জিহবা নাড়িয়ে বাজে শব্দগুলো উচ্চারণের চেষ্টা করেন এবং আপনার কণ্ঠনালী থেকে আওয়াজ বের হয়—এমনকি তা ফু-এর মতো হলেও—তাহলে সেটা কথা গণ্য হবে।
  • আপনার বর্ণনা: আপনি বলেছেন, "আমি শুধু জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ার সাউন্ড পেয়েছি, আর কিছু সাউন্ড পাইনি।" যদি আপনি নিশ্চিত যে, বাজে শব্দের কোনো অক্ষর বা আওয়াজ বের হয়নি, তাহলে তা কথা নয়। কিন্তু আপনি যদি সন্দেহ করেন, তাহলে মূলনীতি হলো: ইয়াকীন (নিশ্চিত) সন্দেহের দ্বারা দূর হয় না। আপনার যদি নিশ্চিত না হয় যে মুখে উচ্চারণ করেছেন, তাহলে ধরে নেবেন না।

প্রশ্ন ২: বার বার চেক করার কারণে কি ঈমানে সমস্যা হবে?

  • ঈমান নষ্ট হওয়ার শর্ত হলো: (ক) অন্তরে বিশ্বাস সহকারে কুফরি কথা বলা বা কাজ করা, (খ) মুখে সুস্পষ্টভাবে কুফরি শব্দ উচ্চারণ করা, (গ) ইসলামকে অবজ্ঞা করার নiyyat থাকা।
  • আপনি বার বার চেক করেছেন শুধু আওয়াজ হয় কিনা জানার জন্য, কিন্তু আপনার অন্তর সবসময় ঈমানের উপর অটল ছিল। তাই আপনার ঈমান নষ্ট হয়নি। তবে এটি একটি মারাত্মক গুনাহ (যদি মুখে উচ্চারণ করে থাকেন) বা ওয়াসওয়াসা (যদি উচ্চারণ না করেন)। উভয় ক্ষেত্রেই তওবা করুন এবং বার বার এই চিন্তায় না পড়ার চেষ্টা করুন।

প্রশ্ন ৩: আমার ঈমান ও বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে?

  • ঈমান: আপনার ঈমান ঠিক আছে, যতক্ষণ না আপনি অন্তরে কুফরি বিশ্বাস পোষণ করেন বা তা মুখে উচ্চারণ করেন। আপনি যখন চেক করছিলেন, তখন আপনার অন্তর ছিল আল্লাহর প্রতি ঈমানদার, তাই ঈমান অক্ষুণ্ণ।
  • বিবাহিত জীবন: বিবাহিত জীবন বৈধ থাকার জন্য স্বামী-স্ত্রীর ঈমান থাকা জরুরি। আপনার ঈমান অক্ষুণ্ণ থাকায় আপনার বিবাহিত জীবনও ঠিক আছে। তবে শয়তানের ওয়াসওয়াসায় বারবার পড়বেন না।

ফিকহি রেফারেন্স:

  • "রাদ্দুল মুহতার" (কিতাবুস সলাত, باب ما يفسد الصلاة): "আওয়াজহীনভাবে ঠোঁট বা জিহবা নাড়ালে নামাজ ভঙ্গ হয় না, যতক্ষণ না অন্তত দুটি অক্ষর উচ্চারিত হয়।"
  • "ফতোয়া আলমগিরি" (১/১০৮): "যদি কেউ নামাজে শুধু জিহবা নাড়ায় কিন্তু কোনো আওয়াজ না বের হয়, তাহলে নামাজ ভঙ্গ হয় না।"
  • "ইমদাদুল ফতোয়া" (২/২৫৫): "মনে মনে কুফরি চিন্তা আসা ঈমান নষ্ট করে না, কিন্তু তা মুখে উচ্চারণ করলে ঈমান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।"
  • "বাহিশতি জেওর" (প্রথম খণ্ড, নামাজ অধ্যায়): "শুধু জিহবা নাড়ালে কথা বলা হয় না, যতক্ষণ না আওয়াজ বের হয়।"

আপনার করণীয়:
১. আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং নিজেকে বারবার এই চেক করার ওয়াসওয়াসা থেকে সরিয়ে আনুন।
২. নামাজের সময় হাই আসলে মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করুন (হাদিসে হাই আসলে মুখ বন্ধ রাখার নির্দেশ রয়েছে)।
৩. শয়তানের ওয়াসওয়াসা এলে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" বলুন এবং আল্লাহর কাছে পানাহ চান।

সারসংক্ষেপ:

  • মুখ হা করে জিহবা নাড়ালে কিন্তু আওয়াজ না বের হলে তা কথা নয়।
  • বার বার চেক করায় ঈমান নষ্ট হবে না, তবে এটি গুনাহ; তাই তওবা করুন।
  • আপনার ঈমান ও বিবাহিত জীবন ঠিক আছে, ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ আপনাকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.