নামাজে হাই তোলার সময় মনে খারাপ চিন্তা আসা, জিহবা নাড়িয়ে উচ্চারণ চেক করা, এবং ঈমানের সমস্যা নিয়ে হানাফি ফিকহের বিস্তারিত উত্তর।

Faith and Belief · Hanafi

Questioner: Riha Moni
Question Asked: 28 May 2026, 03:17 PM
Reviewed & Published: 28 May 2026, 03:37 PM
Views: 32
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
হুজুর আমি রাতে এমনি নফল নামাজ পড়তেছিলাম। পড়ে আমার নামাজে হাই ঊঠছে, আমি মুখ হা করে হাই তুলতেছি নামাজেই। যখনই মুখ হা করলাম তখন ই আমার মনে মনে আল্লাহ কে নিয়ে বাজে কথা আসলো। আস্তাগফিরুল্লাহ। এখন আমার মনে হইতেছে মুখেই বলে ফেললাম কিনা। অনেক কষ্ট করে মন কে বুঝাইলাম মুখে কিছু বলি নাই।

তাও মন মানে না। পরে নামাজ শেষ করে আবার কয়েকবার মুখ হা করে জিহবা নাড়িয়ে বাজে কথা গুলা বলেছি মনে মনে। দেখতে সাউন্ড হয় কিনা। খেয়াল করলাম জাস্ট জিহবা নড়ে, অন্য কোনো সাউন্ড হয় নাই। এভাবে কয়েকবার ইসলাম নিয়ে বাজে কথা গুলা বললাম জিহবা নাড়ায়ে। শুধু চেক করার জন্য সাউন্ড হয় কিনা।

♦এই প্রশ্নের উত্তর সম্মানিত মুফতি সাহেব দিয়েছেন যে, " মুখ না খুলে শুধু জিহবা নাড়ালে সেটাকে কথা ধরা হবে না। কিন্তু আমি তো মুখ খুলে মানে মুখ হা করে জিহবা নাড়িয়ে বাজে কথা গুলা বলে চেক করেছি। আমি শুধু জোরে জোরে শাস নেয়ার সাউন্ড পেয়েছি। আর কিছু সাউন্ড পাইনি। আসলে শাস নেয়ার সময় হা করে জিহবা নাড়িয়ে বাজে কথা গুলা বলতেছিলাম দেখে আমার মনে হইতেছে যে মুখেই বলে ফেললাম কিনা। আবার অনেক সময় দেখা যায় কিছু ফু দিয়ে খাইতে গেলাম। তখনো ফু দেয়ার সাথে সাথে কিছু একটা বলে ফেলি।♦

১) এখন মুখ হা করে, ফু দেয়ার সময়, জিহবা নাড়িয়ে, বার বার বাজে কথা গুলা চেক করা এগুলো কি কথা ধরা হবে?

২) বাজে কথা গুলা বলে বার বার চেক করার কারনে কি আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

৩) আমার ঈমান আর বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে?

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনার মনের এই উদ্বেগ ও ওয়াসওয়াসা (শয়তানি প্ররোচনা) সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। আপনি যে অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন, তা বিশুদ্ধ ফিকহি ও আকীদাগত দৃষ্টিকোণ থেকে পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন যে— আপনার ইমান, নামাজ ও বৈবাহিক জীবনে কোনো সমস্যা হয়নি। নিচে আপনার তিনটি প্রশ্নের জবাব কিতাব ও ফাতাওয়ার আলোকে দেওয়া হলো:


১. মুখ হা করে, ফু দিয়ে বা জিহবা নাড়িয়ে বাজে কথা চেক করা কি কথা (কালাম) হিসেবে গণ্য হবে?

উত্তর: না, এটি কথা হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ নামাজ ভঙ্গের জন্য বা কালাম (বক্তব্য) হওয়ার শর্ত হলো— শুদ্ধভাবে অন্তত দুটি হরফ (বর্ণ) উচ্চারিত হওয়া, যা শ্রোতা শুনতে পায় (নিজেও শুনতে পায়)

  • হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
    "الکلام اسم للفظ الموضوع للمعنى، ولا يتحقق إلا بظهور الحروف المسموعة"
    (কালাম হলো অর্থবোধক শব্দ, যা কেবল শোনা যায় এমন হরফের মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়।)
    (রদ্দুল মুহতার, ২/৪০২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১০২)

  • আপনার বর্ণনায়:

    • আপনি মুখ হা করে জিহবা নাড়িয়েছেন, কিন্তু কোনো হরফের আওয়াজ বের হয়নি
    • শুধু শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ (ফূৎকার) ছিল, যা হরফ নয়।
    • ফু দেওয়ার সময়ও যদি কেবল বাতাস বের হয়, তবে তা কথা নয়। তবে যদি ফু-এর সাথে স্পষ্ট কোনো হরফ (যেমন ‘ফা’, ‘সা’ ইত্যাদি) উচ্চারিত হয়, তাহলে তা কথা গণ্য হবে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে তা হয়নি।

সুতরাং: নামাজের মধ্যে বা নামাজের বাইরে এই কাজ দ্বারা নামাজ ভঙ্গ হয়নি, এবং এটি ‘কথা বলা’ হিসেবে গণ্য হবে না।


২. বারবার বাজে কথা চেক করার কারণে কি ঈমানের সমস্যা হবে?

উত্তর: না, ঈমানের কোনো সমস্যা হবে না। কারণ—

  • কুফরি শব্দ চিন্তায় আসা বা মনে মনে বলা ঈমান নষ্ট করে না যতক্ষণ না তা জিহবা দ্বারা উচ্চারিত হয় এবং অন্তর তা বিশ্বাস করে।

  • হাদিসে এসেছে: "إن الله تجاوز عن أمتي ما حدثت به أنفسها ما لم تتكلم أو تعمل به"
    (নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মতের মনের কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না তা বলে ফেলে বা কাজে পরিণত করে।)
    (সহিহ বুখারি: ২৫২৮; সহিহ মুসলিম: ১২৭)

  • আপনি যেহেতু শুধু চেক করার জন্য জিহবা নাড়িয়েছেন, কিন্তু কোনো স্পষ্ট উচ্চারণ (আওয়াজযুক্ত হরফ) হয়নি, তাই তা কুফরি বাক্য বলে গণ্য নয়। আর যদি সেটাও হতো, তাহলেও আপনার অন্তর সে কথা বিশ্বাস করেনি— বরং আপনি ঘৃণা ও আতঙ্কিত হয়েছেন। তাই ঈমান অটুট।

উপসংহার: শয়তানের ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না। বারবার চেক করার এই প্রবণতা ওয়াসওয়াসা (obsessive doubt) রোগের লক্ষণ, যা থেকে বাঁচতে হবে।


৩. আমার ঈমান ও বৈবাহিক জীবন কি ঠিক আছে?

উত্তর: হ্যাঁ, সম্পূর্ণ ঠিক আছে।

  • ঈমান: আপনার ঈমান অক্ষুণ্ন রয়েছে, কারণ আপনি আল্লাহকে নিয়ে বাজে চিন্তাকে ঘৃণা করেছেন, আস্তাগফিরুল্লাহ বলেছেন, এবং চিন্তিত হয়েছেন। এটি মূলত: ছোট্ট একটি ওয়াসওয়াসা যা মুমিনের জন্য স্বাভাবিক।
    (দেখুন: ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৫২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৪)

  • বৈবাহিক জীবন: আপনার স্ত্রীর সাথে বিবাহ সহীহ ও বৈধ। ঈমানের সমস্যা না হওয়ায় বিবাহিত জীবনেও কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে আপনি নিজেকে ওয়াসওয়াসা থেকে রক্ষা করার জন্য নিচের কাজগুলো করুন:

    1. এই ধরনের চিন্তা এলে “আমি আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি” বলে তা দূর করুন।
    2. এই নিয়ে বারবার চেক করা বন্ধ করুন। একবার বুঝে গেলে পুনরায় চেক করবেন না।
    3. বেশি বেশি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও দরুদ শরিফ পড়ুন।

সতর্কতা ও পরামর্শ:

  • নামাজে হাই আসলে: মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করুন, আর যদি হাই আসেই, তাহলে ডান হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নিন। (সুনানে তিরমিজি: ২৭৪৫)
  • ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা: আপনি যখনই এ ধরণের চিন্তা বা চেক করার ইচ্ছা করবেন, তৎক্ষণাৎ “আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম” পড়ে অন্য কাজে মন দিন।
  • মনে রাখবেন: শয়তান আপনাকে এই কৌশলে ক্লান্ত ও হতাশ করতে চায়। আপনার প্রকৃত ইমানি অবস্থা ভালোই আছে।

আল্লাহ তাআলা আপনাকে ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন এবং আপনার ইমান, নামাজ ও সংসারকে বরকতময় করুন।

আমিন।


প্রাসঙ্গিক হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:

  • রদ্দুল মুহতার (২/৪০২) - নামাজ ভঙ্গের শর্ত
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১০২) - মুখে উচ্চারণ ছাড়া কথা না হওয়া
  • ফাতাওয়া উসমানি (১/২৫২) - ওয়াসওয়াসা ও ঈমান
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৪) - কুফরি চিন্তার বিধান

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.