না জেনে না বুঝে তালাকনায় সাইন করা প্রসঙ্গে

Marriage and Divorce · Hanafi

Questioner: Rajia Suntana
Question Asked: 01 Jun 2026, 07:43 PM
Reviewed & Published: 01 Jun 2026, 09:51 PM
Views: 41
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। ২৩ মার্চ ২০২৬ বিয়ে হয়েছে। বিয়ের আগেই আমার হাসবেন্ড কে বুঝিয়েছিলাম ১৮ নং কলাম কি। সে জেনেছিল, বুঝেছিল, আর আমাকে বলেছিল আমাকে এই অধিকার দিবে না। কিন্তু কাজি কিছু না বলেই ১৮ নং কলামে অনুমতি দিয়ে দিয়েছে। আর কিছু শর্ত লিখেছে। এগুলা কাজি বিয়ে পড়িয়ে বাড়িতে যেয়ে লিখেছে। *কিন্তু আমাদের ইজাব কবুলের পরেই লিখেছিল* বিয়ের ৩ দিন পরে যখন কাবিন নামা হাতে পেলাম তখন দেখলাম। অনুমতি দেয়া। বিয়ের দিন আমাকে আর আমার হাসবেন্ড কে শুধু বলছে সাইন করতে। আমরা সাইন করেছি।
আমার হাসবেন্ড এর নিয়ত ছিল সে আমাকে কোনো অধিকার দিবে না, তাই সে কিছু না দেখেই সাইন করে দিয়েছে কাবিন নামা তে।

১) এখন আমি কি অধিকার পাবো? একজন মুফতি বলেছিলেন যে, হাসবেন্ড যদি আগে থেকে জানে, জেনে সাক্ষর করে তাহলে নাকি অধিকার পাবে। হুজুর আমার হাসবেন্ড তো জানে এই বিষয়ে, তাও বিয়ের দিন খেয়াল করে নাই কাজি কি লিখছে। কিন্তু আমার হাসবেন্ড এর বিয়ের আগে থেকেই নিয়ত আমাকে কোনো অধিকার দিবে না।

২) আমি তাকে বিয়ের ৪ দিন পরে জিজ্ঞেস করি যে, আচ্ছা তুমি তো আমাকে কোনো অধিকার দাও নাই। তাই না? তখন আমার হাসবেন্ড ম্যাসেজ এ বলছে যে, 'না দেই নাই তো'। ম্যাসেজ এ লিখলে হবে? নাকি মুখে উচ্চারণ করে বলতে হবে অধিকার না দেয়ার কথা?

৩) যখন সাইন করেছে তখন কিছু লিখা ছিল না। বিয়ে পড়ানোর পরে কাজি লিখেছে বাড়িতে যেয়ে। আমার জামাই না দেখেই সাইন করেছে কিন্তু আমি পরে কাজির থেকে সিউর হয়েছি উনি বিয়ে পড়িয়ে লিখেছিলেন এই ১৮ নং কলাম। এখন আমি কি অধিকার পাবো?


৪) এখন এই অধিকার না দেয়া কি বিয়ের দিন থেকে ধরা হবে? নাকি বিয়ের ৪ দিন পর থেকে ধরা হবে? যেহেতু বিয়ের ৪ দিন পরে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু তার মনে বিয়ের আগে থেকেই নিয়ত ছিল আমাকে কোনো অধিকার দিবে না।

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

প্রশ্নটি বিশ্লেষণ করে আমরা দেখছি যে, বিবাহের সময় কাজী ১৮ নং কলামে (যা সাধারণত স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়ার শর্ত সংক্রান্ত) অনুমতি লিখে দিয়েছেন, অথচ স্বামী আগেই জানত ও বলেছিল যে তিনি এই অধিকার দেবেন না। স্বামী বিনা পড়েই সই করে দিয়েছেন, এবং কাজী পরে বাড়িতে গিয়ে কলামটি পূরণ করেছেন। এখন প্রশ্ন হলো—আপনি কি এই অধিকার পাবেন? নিচে প্রতিটি পয়েন্টের উত্তর হানাফি ফিকহের কিতাবের ভিত্তিতে দেওয়া হলো।


১) আপনি কি ১৮ নং কলাম অনুযায়ী তালাকের অধিকার পাবেন?

উত্তর: না, আপনি এই অধিকার পাবেন না। কারণ হানাফি মতে, তালাকে তাওফীজ (স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দেওয়া) একটি ইজার (অনুমতি) যা স্বামীর স্পষ্ট ও ইচ্ছাকৃত সম্মতি ছাড়া কার্যকর হয় না। এখানে নিম্নোক্ত কারণে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি:

  • স্বামীর পূর্ব ঘোষণা: বিয়ের আগে স্বামী স্পষ্ট বলেছিলেন, "আমি তোমাকে এই অধিকার দেব না।" এটি তার নিয়ত ও ইচ্ছার পরিষ্কার প্রমাণ।
  • সই করার সময় শর্তটি লিখিত ছিল না: আপনি বলেছেন, বিয়ের দিন শুধু সই করতে বলা হয়েছিল, কাজী তখন ১৮ নং কলামে কিছু লেখেননি। পরে বাড়িতে গিয়ে তিনি তা লিখেছেন। হানাফি ফিকহে কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর যদি একতরফাভাবে শর্ত যোগ করা হয়, তবে তা বৈধ হবে না যদি না স্বাক্ষরকারী তা জেনে এবং অনুমোদন করে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৩; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫৫)
  • স্বামীর অজ্ঞতা: স্বামী কিছু না দেখেই সই করেছেন—এটি তার অজ্ঞতা ও ভুল বুঝাবুঝির প্রমাণ। হানাফি মতে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো শর্ত না জেনে সই করে, তবে তা তার ওপর বাধ্যকরক নয়, বিশেষত যখন তার পূর্বাহ্নিক অভিপ্রায় তার বিপরীত থাকে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৩০; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৪৫৯)
  • কাজীর কাজ স্বামীর ইচ্ছার পরিপন্থী: কাজী বিয়ের অনুষ্ঠানের পর বাড়িতে গিয়ে ১৮ নং কলাম পূরণ করেছেন—এটি স্বামীর ইচ্ছা ও জ্ঞানের বাইরে। তাই এটাকে বৈধ তাফউইজ (অধিকার হস্তান্তর) গণ্য করা যাবে না। (শরহু মা‘আনিল আসার, ২/৩৮৭; বাহিশ্তি জেওর, বিবাহ অধ্যায়)

সংক্ষেপ: স্বামীর পূর্ব ঘোষণা, সই-পরবর্তী শর্ত যোগ, এবং তার অজ্ঞতা ও অসম্মতি—সব মিলিয়ে তালাকের অধিকার আপনার ওপর আরোপিত হয়নি।


২) স্বামীর ম্যাসেজে "না দেই নাই তো" বলার দ্বারা কি অধিকার না দেওয়া প্রমাণিত হয়?

উত্তর: হ্যাঁ, ম্যাসেজের মাধ্যমেও অধিকার না দেওয়ার কথা বলা বৈধ। হানাফি ফিকহে ইজার (অনুমতি) বা তার অস্বীকৃতি লিখিত বা মৌখিক উভয়ভাবেই হতে পারে। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেখানে ম্যাসেজ একটি স্থায়ী দলিল হিসেবে গণ্য, সেখানে স্বামীর এই বক্তব্য স্পষ্ট প্রমাণ করে যে তিনি কখনোই তালাকের অধিকার দেননি। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৬১; রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৫)

তবে আদালতে প্রমাণের ক্ষেত্রে ম্যাসেজের স্ক্রিনশট বা প্রিন্ট আউট সংরক্ষণ করা ভালো। মৌখিকভাবে বলার প্রয়োজন নেই, কারণ তার ইচ্ছা ও বিবৃতি স্পষ্ট।


৩) সই করার সময় কিছু লেখা ছিল না, পরে কাজী বাড়িতে গিয়ে লিখেছেন—এখন কি অধিকার পাবেন?

উত্তর: না, এই অবস্থায় আপনি অধিকার পাবেন না। হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো:

العبرة في العقود للمعاني لا للألفاظ
(চুক্তির ক্ষেত্রে বিবেচ্য হলো অর্থ, শব্দ নয়)

কিন্তু এখানে অর্থাৎ স্বামীর ইচ্ছা ও সম্মতি ছিল না। আরেকটি মূলনীতি:

لا يلزم الإنسان ما لم يرض به
(মানুষ তার অনিচ্ছাকৃত বিষয়ে বাধ্য নয়)

যেহেতু স্বামী বিয়ের সময় কিছু না জেনে এবং পরে কোনো অনুমোদন ছাড়াই সই করেছে, এবং কাজী তার অজান্তে পরে শর্ত লিখেছে—সুতরাং শর্তটি বাতিল গণ্য হবে। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৪৫৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৩১; বাহিশ্তি জেওর)

একজন মুফতি যদি বলেন, "স্বামী জেনে সই করলে অধিকার পাবে," তার মানে হলো—যদি স্বামী সই করার সময় শর্তটি পড়ে বা জেনে বুঝে সই করত, তাহলে তার ইচ্ছা ধরে নেওয়া হতো। কিন্তু এখানে সেটা হয়নি।


৪) অধিকার না দেওয়া কি বিয়ের দিন থেকে গণ্য হবে, না কি বিয়ের ৪ দিন পর থেকে?

উত্তর: যেহেতু ১৮ নং কলামের শর্তটি বৈধভাবে প্রতিষ্ঠিতই হয়নি, তাই অধিকার না দেওয়া শুরু থেকেই (বিয়ের দিন থেকেই) বিবেচিত হবে। স্বামীর বিয়ের আগের নিয়ত ও পরে জিজ্ঞাসার জবাবে "না দেই নাই" বলা—এ দুটোই একই সত্যের সাক্ষ্য দেয়: তিনি কখনো অধিকার দেননি। তাই আপনি কখনোই তালাকের এই বিশেষ অধিকার পাবেন না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৭; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৬৩)


পরামর্শ:

  • আপনি চাইলে স্বামীর সাথে আলোচনা করে তাকে রাজি করাতে পারেন যে, তিনি আপনাকে তালাকের অধিকার লিখে দেন। ইসলামে এ ধরনের শর্ত রাখা স্ত্রীর জন্য অধিকার সংরক্ষণে সহায়ক।
  • ভবিষ্যতে এ ধরনের জটিলতা এড়াতে বিয়ের সময়ই কাবিননামার সব কলাম পড়ে ও বুঝে সই করা উচিত।
  • কাজীকে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতি নিয়ে শর্ত লিখতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আপনাদের বিবাহকে বরকতময় করুন এবং পারস্পরিক ভালোবাসা ও বোঝাপড়া দান করুন। আমিন।

সূত্র:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
  • বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
  • ফাতাওয়া আলমগীরী
  • শরহু মা‘আনিল আসার (ইমাম তাহাবী)
  • উসুলুশ শাশী

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.