মেয়ের ক্ষেত্রে পিতার অনুমতি ছাড়া বিয়ে
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
বিয়ের জন্য ছেলের পরিবার ও মেয়ের পরিবার উভয়ে রাজি, কিন্তু মেয়ের বাবা পড়াশোনা শেষ হওয়া পর্যন্ত বিয়ে দিতে চান না – এ অবস্থায় মেয়ের বাবার অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা যাবে কি?
উত্তর
ইসলামী শরিয়তে বিবাহের জন্য অভিভাবকের (ওয়ালির) অনুমতি ও সম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত কুমারী মেয়ের ক্ষেত্রে পিতার অনুমতি ছাড়া বিবাহ করা অনুচিত। তবে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, যদি মেয়ে প্রাপ্তবয়স্কা (বালিগা) ও সুস্থমস্তিষ্ক হয়, তাহলে সে নিজে বিবাহের ইজাব-কবুল করতে পারবে এবং এ বিবাহ সহীহ হবে। তবে পিতার অনুমতি ছাড়া বিবাহ করাকে মাকরুহে তানজিহি (অপছন্দনীয়) বলা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, যেহেতু মেয়ের বাবা বিবাহ দিতে চানই, কিন্তু মাত্র ২-৩ বছর বিলম্ব করতে চান পড়াশোনা শেষ করার জন্য – তাহলে কি পিতার অনুমতি ছাড়া বিবাহ জায়েজ হবে?
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি মাজহাবের কিতাবসমূহে বলা হয়েছে:
-
বালিগা, সুস্থমস্তিষ্ক কুমারী মেয়ের বিবাহ – তার নিজের সম্মতি থাকলে পিতার অনুমতি ছাড়াই বিবাহ সহীহ হয়। তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে পিতার অনুমতি ছাড়া বিবাহ করা মাকরুহে তানজিহি (অপছন্দনীয়) এবং ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে পিতার অনুমতি শর্ত নয় বরং মুস্তাহাব। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৮৪)
-
পিতার অনুমতি ছাড়া বিবাহের ক্ষেত্রে – যদি পিতা অন্যায়ভাবে বাধা দেন বা অমতযুক্ত কারণে বিলম্ব করেন, তাহলে মেয়ে কাযীর (বিচারক) নিকট গিয়ে বিবাহ সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে পিতা বিলম্বের যুক্তি দিচ্ছেন (পড়াশোনা শেষ করা) – এটি কি অমতযুক্ত বিলম্ব?
-
পড়াশোনার জন্য বিলম্ব – পড়াশোনা শেষ করা একটি যুক্তিসঙ্গত কারণ। বিশেষত বর্তমান প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তাই পিতার সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ অন্যায় বলা যাবে না। তবে বিবাহের বিলম্ব যদি হারাম কাজে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করে, তাহলে সেক্ষেত্রে পিতার অনুমতি ছাড়া বিবাহ করা জায়েজ হতে পারে।
ফাতাওয়া উসমানি ও অন্যান্য কিতাবের নির্দেশনা
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ও মুফতি তকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) থেকে প্রাপ্ত ফাতাওয়ায় বলা হয়েছে:
- পিতার অনুমতি ছাড়া কুমারী মেয়ের বিবাহ করা উচিত নয়, যদি না পিতা সম্পূর্ণ অমতযুক্ত কারণে বিবাহ দিতে অস্বীকৃতি জানান।
- পিতার বিলম্বের কারণ যদি বৈধ হয় (যেমন: বয়স কম, পড়াশোনা অসম্পূর্ণ, আর্থিক অস্বচ্ছলতা ইত্যাদি), তাহলে ধৈর্য ধরা ও পিতার সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া উত্তম।
- কিন্তু যদি পিতার বিলম্বের কারণে মেয়ে বা ছেলে নাজায়েজ কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়, তাহলে সেই অবস্থায় পিতার অনুমতি ছাড়া বিবাহ করা যেতে পারে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৭১; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৫৮)
সংশ্লিষ্ট হাদিস
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "কোনো বিবাহ ওয়ালি (অভিভাবক) ছাড়া হয় না।" (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ) তবে হানাফি মাজহাব এই হাদিসকে মুস্তাহাব বা উত্তম অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন।
সারসংক্ষেপ ও সুপারিশ
১. যেহেতু মেয়ের বাবা বিবাহ দিতে রাজি, শুধু ২-৩ বছর বিলম্ব চান (পড়াশোনা শেষ হওয়া পর্যন্ত) – এটি একটি যুক্তিসঙ্গত কারণ। তাই পিতার অনুমতি ছাড়া বিবাহ করা উচিত নয়।
২. পিতার সাথে বসে পড়াশোনা শেষ করার পরপরই বিবাহ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে একটি লিখিত চুক্তি করা যেতে পারে।
৩. যদি মনে হয় যে বিলম্বের কারণে জিনা-ব্যভিচারের আশঙ্কা হচ্ছে, তাহলে পিতাকে বোঝানো উচিত। তবুও যদি পিতা না শোনেন, তাহলে এলাকার ইমাম বা আলেমের মাধ্যমে পিতার সাথে কথা বলতে হবে।
৪. শেষ অবলম্বন হিসেবে কাযী (বিচারক) বা ইসলামী সালিশের মাধ্যমে বিবাহ সম্পন্ন করা যেতে পারে। তবে নিজেরা পিতাকে বাদ দিয়ে বিবাহ দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
পরামর্শ
- ছেলের পরিবার মেয়ের পিতার সাথে সম্মানজনকভাবে আলোচনা করুন।
- পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরপরই বিবাহের একটি নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করে নিন।
- এই সময়ের মধ্যে নজর বাঁচিয়ে চলুন, একান্ত সাক্ষাৎ ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে দূরে থাকুন।
- আল্লাহর নিকট ধৈর্য ও হিযাবতের জন্য দোয়া করুন।
তথ্যসূত্র
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), ৩/৫৫
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি), ১/২৮৪
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি শফি), ২/২৭১
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তকি উসমানি), ২/৩৫৮
- বাহিশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
সর্বশেষ সিদ্ধান্ত: মেয়ের বাবার অনুমতি ছাড়া সরাসরি বিবাহ না করাই উত্তম। তবে চরম প্রয়োজনে ও ফিতনার আশঙ্কায় কাযীর মাধ্যমে বিবাহ করা যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে পিতার বিলম্ব যুক্তিসঙ্গত, তাই ধৈর্য ধরা ও পিতাকে বোঝানো উচিত।