মাইয়্যিতের বাসায় দাওয়াত খাওয়া প্রসঙ্গে, স্বপ্নের ব্যখ্যা
Halal and Haram · Hanafi
Question
উস্তাজ,
১)মানুষের মৃত্যুর ৪ দিন পর যে মানুষ খাওয়াতে দাওয়াত দেয়, এর তো কোনো ভিত্তি নাই, এই দাওয়াতে যাওয়া কি জায়েজ? এছাড়াও চল্লিশার দাওয়াতও?
২) আমার মা আজ স্বপ্নে দেখে
আমার বাবা একটা বউ নিয়ে এসেছে আর মা অনেক কাঁদতেছে আর ওই মেয়েকে মেরে মেরে তাড়ায় দিতেছে আর বাবা চুপ করে আছে কিছু বলছেনা, চুপ করে পাশের ঘরে গিয়ে বসে আছে।
এ স্বপ্নের কি কোনো ব্যখ্যা আছে? নাকি নফস বা শয়তানের পক্ষ থেকে?
৩) আমার ভাবি গতকাল রাতে স্বপ্নে দেখে
ভাই একটা ডুপ্লেক্স বাড়ি ভাড়া নিচ্ছে ৯০হাজার টাকা ভাড়া (আমাদের এত সামর্থ্য নাই)। আর আমার ভাবি ভয় পাচ্ছে অনেক এত টাকায় ভাড়া নেওয়ায়। সেখানে ভাইপো দৌড়াদৌড়ি করছে। আর বাড়ি পুরোটা সাদা, কিচেন ও অন্যান্য জায়গা সম্পূর্ণ সাদা। সামনে বড় মাঠ।
এ স্বপ্নের কি ব্যখ্যা আছে নাকি নফস বা শয়তানের পক্ষ থেকে উস্তাজ?
জাঝাকুমুল্লাহু খইর উস্তাজ।।।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রশ্নকারী ভাই, আপনার তিনটি প্রশ্নের উত্তর নিম্নরূপ দেওয়া হলো:
প্রথম প্রশ্ন: মৃত্যুর ৪ দিন বা ৪০ দিনের দাওয়াতের বৈধতা
উত্তর:
ইসলামী শরিয়তে মৃত ব্যক্তির স্মরণে নির্দিষ্টভাবে ৪র্থ, ১০ম, ৪০শে বা বছরান্তে খানা-পিনার দাওয়াত দেওয়ার কোনো ভিত্তি নেই। এটি একটি বিজাতীয় রীতি যা ইসলামে নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয়।
প্রমাণ:
- হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে বা সাহাবীদের মধ্যে এ ধরনের কোনো রীতি ছিল না। বরং নবী ﷺ বলেছেন: «لاَ عَقْرَ وَلاَ طِيَرَةَ» (অর্থাৎ: ইসলামে মৃতের জন্য বাড়তি খরচের রীতি নেই) (সহিহ বুখারী: ৫৭৫৭)।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও অন্যান্য হানাফি ফকিহগণ মৃতের নামে নির্দিষ্ট দিনে দাওয়াত করাকে মাকরূহ তাহরীমী (নিষিদ্ধ) বলেছেন। (রদ্দুল মুহতার: ২/২৪৭)
জবাবে:
- এই দাওয়াতে যাওয়া জায়েজ নয়, যদি এটা সুন্নাত মনে করে বা প্রচলিত বিদআতী রীতি হিসেবে করা হয়। তবে শুধু খানা হিসেবে যদি গ্রহণ করা হয় (বিদআতী আকীদা ছাড়া) তাহলে মাকরূহ-তানজিহী হবে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৫/২০৯-২১০)
- উত্তম হলো এ ধরনের দাওয়াত এড়িয়ে চলা এবং মৃতের জন্য দোয়া ও কুরআন তিলাওয়াত করাকে প্রাধান্য দেওয়া।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: মায়ের স্বপ্ন (বাবা নতুন বিয়ে করা)
উত্তর:
স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) রহমানী স্বপ্ন (সত্য স্বপ্ন), (২) নৈফসানী স্বপ্ন (মনের কল্পনা), (৩) শয়তানি স্বপ্ন (ভীতি প্রদর্শন)। (সহিহ বুখারী: ৬৯৮৫)
আপনার মায়ের স্বপ্নটি তার মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা বা নিজের কিছু অজানা ভয়ের ফল হতে পারে। কারণ:
- লুকিয়ে থাকা মনের অজানা ভয় (যেমন বাবার মনোযোগ কমে যাওয়া) এভাবে স্বপ্নে প্রকাশিত হতে পারে।
- দ্বিতীয় বিয়ে সম্পর্কে শয়তান ভীতি সৃষ্টি করতে পারে; কারণ ইসলামে দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ কিন্তু এ স্বপ্নে কান্না-আক্রোশ থাকায় এটি শয়তানের পক্ষ হতে পারে।
ব্যাখ্যা: ইমাম ইবনে সিরিন (রহ.) বলেন: স্বপ্নে বিয়ে সাধারণত দায়িত্ব বা পরিবারে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো তাফসির নেই। (তাফসিরুল আহলাম: ২/৪৫)
পরামর্শ: এ স্বপ্নের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে বাস্তবে পরিবারের সম্পর্ক মজবুত করুন। বিয়ের কোনো ইঙ্গিত বাস্তবে না দেখা গেলে এটা নিছক কল্পনা। শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হেফাজতের জন্য সকাল-সন্ধ্যার দোয়া পড়ুন।
তৃতীয় প্রশ্ন: ভাবির স্বপ্ন (ডুপ্লেক্স বাড়ি ভাড়া)
উত্তর:
এই স্বপ্নটি নৈফসানী বা শয়তানি স্বপ্ন হতে পারে, কারণ:
- দ্রুত ধনী হওয়ার অপ্রাপ্ত আকাঙ্ক্ষা বা আর্থিক চিন্তা স্বপ্নে এমনভাবে আসতে পারে।
- বাড়ি সাদা হওয়া সাধারণত পবিত্রতা বা নিয়ামতের প্রতীক। (ইবনে সিরিন) কিন্তু ভাড়া ৯০ হাজার টাকা দেওয়া স্বপ্নটি অমূলক, যা বাস্তবে সম্ভব নয়।
ইসলামী নির্দেশনা:
- রাসূল ﷺ বলেছেন: «إذا رأى أحدكم ما يحب فليحمد الله، وإذا رأى ما يكره فليتعوذ بالله من شرها، ولا يحدث بها أحداً» (অর্থাৎ: ভালো স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর শুকর করুন, খারাপ দেখলে শয়তান থেকে আশ্রয় চান এবং কাউকে বলবেন না) (সহিহ মুসলিম: ২২৬১)।
পরামর্শ:
- ভাবি যেন এ স্বপ্নের ভয়ের কারণে দোয়া পড়ে এবং বাস্তবে ধৈর্য ধরে।
- স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিজে বের করার চেষ্টা না করা উত্তম।
সারসংক্ষেপ:
- মৃতের ৪ দিন/৪০ দিনের দাওয়াত বিদআত; এতে অংশগ্রহণ না করাই উত্তম।
- দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্বপ্ন সম্ভবত শয়তানের কুমন্ত্রণা বা মনের কল্পনা; এগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চান।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (২/২৪৭)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/২০৯-২১০)
- সহিহ বুখারী (৫৭৫৭, ৬৯৮৫)
- সহিহ মুসলিম (২২৬১)
- তাফসিরুল আহলাম (ইবনে সিরিন)
والله أعلم بالصواب