লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ এইটা একসাথে পাঠ করা কি শিরক ?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، أما بعد
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন যা অনেকের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
প্রশ্নের সারমর্ম:
"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ" একসাথে পাঠ করা বা লেখা কি শিরক? এই কালিমা কি কুরআন-হাদিসে কোথাও আছে?
উত্তর:
১. "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ" কি শিরক?
মোটেও না, বরং এটি ইসলামের মূল ভিত্তি ও কালিমা তাইয়্যেবা।
- এই কালিমা একসাথে পাঠ করাই ইসলামের প্রথম স্তম্ভ। কেউ যদি এটা একসাথে পাঠ করে, তাহলে সে মুসলিম হয়। শিরক হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা, কিন্তু এখানে তো আল্লাহর একত্ব ও রাসুল (ﷺ)-এর রিসালাত স্বীকার করা হচ্ছে।
- এর বিপরীত যদি কেউ মনে করে যে শুধু "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বললেই হবে, আর "মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ" না বললেও হবে, তাহলে সেটাই শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কারণ রাসুল (ﷺ)-কে অস্বীকার করা কুফরি।
হাদিসের দলীল:
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল, তাহলে আল্লাহ তাকে জাহান্নামের উপর হারাম করে দেবেন।" (বুখারী: ৪৬, মুসলিম: ২৮)
সুতরাং, এই দুই অংশ একসাথে পাঠ করাই ইসলামের শর্ত।
২. কুরআন-হাদিসে কোথায় আছে?
পবিত্র কুরআনে দুই অংশ পৃথক পৃথক আকারে এসেছে, কিন্তু একসাথে এভাবে স্পষ্টভাবে নেই। তবে হাদিসে ও সাহাবাদের আমলে এটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
কুরআনের দলীল:
-
প্রথম অংশ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ):
"فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ" (سورة محمد: ১৯)
অর্থাৎ, "জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।" -
দ্বিতীয় অংশ (মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ):
"وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ" (سورة آل عمران: ১৪৪)
অর্থাৎ, "মুহাম্মাদ (ﷺ) তো শুধু একজন রাসুল।"
হাদিসের দলীল:
১. ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত: সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসুল..." (বুখারী: ৮, মুসলিম: ১৬)
২. হাদিসে জিবরিল (আ.)-এ ইমানের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে:
"ইমান হলো আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসুল ও আখিরাতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।" (বুখারী: ৫০, মুসলিম: ৮)
সাহাবাদের আমল:
সাহাবারা ইসলাম গ্রহণের সময় এই কালিমা একসাথে পাঠ করতেন। যেমন, আবু বকর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনায় স্পষ্ট।
৩. বিভ্রান্তি কেন?
কেউ কেউ মনে করেন শুধু "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" যথেষ্ট, কিন্তু এটি ভুল। কারণ কুরআনে স্পষ্ট:
"وَمَن لَّمْ يُؤْمِن بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ فَإِنَّا أَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ سَعِيرًا" (سورة الفتح: ১৩)
অর্থাৎ, "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ইমান আনে না, আমি কাফিরদের জন্য জ্বলন্ত আগুন প্রস্তুত রেখেছি।"
হানাফি ফিকহের রেফারেন্স:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তার কিতাব "আল-ফিকহুল আকবর"-এ বলেন:
"ইমান হলো আল্লাহ, তার ফেরেশতা, কিতাব, রাসুল ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস, আর তা মুখে বলা ওয়াজিব।" - ইবনে আবিদিন (রহ.) (রাদ্দুল মুহতার, ১:১৫০) বলেন:
"কালিমা তাইয়্যেবা হলো: لا إله إلا الله محمد رسول الله। এটি ইসলামের মূল ভিত্তি।" - মুফতি মুহাম্মাদ শফি (রহ.) বলেন:
"এই কালিমার প্রথম অংশ তাওহিদ ও দ্বিতীয় অংশ রিসালাতের সাক্ষ্য; দুইটি একসাথেই জরুরি।"
উপসংহার:
- "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ" একসাথে পাঠ করা শিরক নয়, বরং এটি ইসলামের মূল চাবিকাঠি।
- কুরআনে পৃথক আকারে এসেছে, হাদিসে একসাথে উল্লেখ আছে।
- তাই কোনো ভুল বুঝে এই কালিমা লেখা বা পড়া থেকে বিরত থাকবেন না।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।
والله أعلم