কুরআন তিলাওয়াতের সময় কি কি আদব বজায় রাখা উচিত?

Sunnah and Bid'ah · Hanafi

Questioner: Qurrata Ain
Question Asked: 31 May 2026, 08:12 PM
Reviewed & Published: 31 May 2026, 09:13 PM
Views: 17
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১. কুরআন তিলাওয়াতের সময় কি কি আদব বজায় রাখা উচিত? মেয়েদের সতর কতটুকু ঢেকে রাখা উচিত?
২. কুরআন শোনার কি কি আদব আছে? শুয়ে শুয়ে কুরআন শোনা যাবে কি? অন্য কাজ করার সময় কুরআন শোনা যাবে কি? কুরআন শোনার সময় সতরের দিকে কেমন লক্ষ্য রাখা উচিত?
৩. উস্তাদের কাছে কুরআন শেখার সময় কি কি আদব রক্ষা করা উচিত?
৪. কুরআনের মজলিশে বসলে সতর কেমন হবে?
৫. তালিমের মজলিশে মেয়েদের সতর কেমন হওয়া উচিত? এমন মজলিশে সবাই বসে থাকে, কয়েকজন যদি পাশে বেডে এমনিতেই শুয়ে পড়ে তাহলে এটা কি আদবের খেলাপ? বা বক্তা কথা বলার মাঝে কেউ মনে মনে ইস্তেগফার পড়লে অন্যরা সেটা শুনতে থাকলে কি বেয়াদবি হয়? ইস্তেগফার তো মন দিয়ে পড়তে হয়, তালিম শোনার সময় ইস্তেগফার পড়লে তো কোনো দিকেই মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়না। তাহলে এটা কি ঠিক আচরণ? আশরাফ আলী থানভী (র) এর কি এমন কোনো ঘটনা আছে যে তিনি তার মজলিশে এক ব্যক্তি হেলান দিয়ে বসেছিল বলে মজলিশ থেকে বের করে দেন।

Answer

উত্তর

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আলহামদুলিল্লাহি ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ

প্রশ্নটি কুরআন তিলাওয়াত, শোনা, শিক্ষা এবং মজলিশের আদব সম্পর্কিত। নিম্নে প্রতিটি বিষয় হানাফি ফিকহের কিতাব ও উস্তাদদের নির্দেশনার আলোকে বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।


১. কুরআন তিলাওয়াতের আদবমেয়েদের সতর

তিলাওয়াতের আদব:
কুরআন তিলাওয়াতের সময় নিচের আদবগুলো রক্ষা করা আবশ্যক বা মুস্তাহাব:

  • পবিত্রতা: ওজু বা গোসলের দ্বারা পবিত্র থাকা। হাদিসে এসেছে, নবী ﷺ বলেছেন: "মুসলিম ব্যক্তি পবিত্র অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করবে।" (তিরমিযী, হাদিস: ২৭৭)
  • কিবলামুখি হওয়া: সম্ভব হলে কিবলার দিকে মুখ করে বসা।
  • বিনয় ও একাগ্রতা: মাথা নত করে, স্থির হয়ে বসে, অন্য কাজে মনোযোগ না দেওয়া।
  • মুখ পাকানো: দাঁত মাজা বা মিসওয়াক করা উত্তম।
  • দোয়া পড়া: তিলাওয়াত শুরুতে "أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ" ও শেষে "صَدَقَ اللَّهُ الْعَظِيمُ" বলা।
  • উচ্চারণ শুদ্ধ করা: তাজবিদের সঙ্গে পড়া।

মেয়েদের সতর:
মেয়েদের জন্য তিলাওয়াতের সময় সতরের ব্যাপারে হানাফি ফিকহে বিধান হলো:

  • সম্পূর্ণ শরীর ঢাকা মুস্তাহাব যদি অন্য মুসলিম (মাহরাম বা অমাহরাম) উপস্থিত থাকে। তবে একাকিনী হলে চেহারা, হাত ও পা পর্যন্ত ঢেকে রাখা আবশ্যক নয়; কিন্তু সর্বোত্তম হলো পুরো শরীর ঢেকে পড়া।
  • ইবনে আবেদিন (রহ.) বলেন: "পর্দার বাইরে পড়ার সময় স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের জন্য সতর আবশ্যক; তবে তিলাওয়াতের জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়, কিন্তু উত্তম।" (রদ্দুল মুহতার, ১/২৭২)
  • মেয়েদের সতর হলো সারা শরীর, শুধু চেহারা ও হাতের কব্জি পর্যন্ত (দুই হাত) এবং পায়ের পাতা পর্যন্ত (যদি অমাহরাম না থাকে) ছাড়া। (বাহিশতি জেওর, ১/৫৬; ফতোয়া উসমানি, ১/১৮৪)

২. কুরআন শোনার আদব

শোনার আদব:

  • নীরব থাকা: কুরআন তিলাওয়াত শোনা ফরজ নয়, কিন্তু সুন্নত। তবে যখন কেউ তিলাওয়াত করে, তখন চুপ করে শোনা ওয়াজিব (সূরা আল-আরাফ, ৭:২০৪)
  • মনোযোগ ও বিনয়: কিবলামুখি হয়ে, হাত-পা স্থির রেখে শোনা।
  • কান ও মন দিয়ে শোনা: অন্য কাজ থেকে বিরত থাকা।

শুয়ে শুয়ে কুরআন শোনা:
শুয়ে শুয়ে কুরআন শোনা যদি অলসতা বা বেয়াদবির উদ্দেশ্য না হয় তবে জায়েজ আছে, কিন্তু তা উত্তম নয়। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি শুয়ে কুরআন শুনতেন না। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস: ২৮৩৯)
তবে অসুস্থতা বা ক্লান্তির কারণে শুয়ে শোনা যেতে পারে। (ফতোয়া উসমানি, ২/৩৪৫)

অন্য কাজ করার সময় কুরআন শোনা:
এটা মাকরুহ তানজিহি (অপছন্দনীয়) যদি মনোযোগ না থাকে। কারণ কুরআনের প্রতি শ্রদ্ধা ভঙ্গ হয়। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন: "কাজ করতে করতে কুরআন শোনা জায়েজ, তবে এর দ্বারা একাগ্রতা নষ্ট হয়।" (রদ্দুল মুহতার, ১/২৭৮)

শোনার সময় সতর:
তিলাওয়াতকারীর মতোই শ্রোতারও সতর ঢেকে রাখা আবশ্যক। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে পর্দা আবশ্যক (যদি অমাহরাম থাকে)। একাকী থাকলে শিথিলতা হতে পারে।


৩. উস্তাদের কাছে কুরআন শেখার সময় আদব

  • সম্মান ও বিনয়: উস্তাদের সামনে সোজা হয়ে বসা, পা ছড়িয়ে না দেওয়া, উঁচু আওয়াজ না করা।
  • পবিত্রতা: ওজু করে আসা, পরিষ্কার কাপড় পরা।
  • একাগ্রতা: চোখ-কান উস্তাদের দিকে রাখা, অন্য কথায় না ব্যস্ত থাকা।
  • সতর: মেয়েরা পর্দাসহ আসবে (সারা শরীর, চেহারা ও হাত ছাড়া)।
  • সওয়াল: শেখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে পারবে, কিন্তু বিনয়ের সাথে।
    ইমাম থানবী (রহ.) বলেন: "তালিমের মজলিশে উস্তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করবে যেন তুমি মসজিদে আছো।" (ইমদাদুল ফতোয়া, ২/১৫০)

৪. কুরআনের মজলিশে বসলে সতর

মজলিশের ধরন অনুসারে সতর নির্ধারিত হবে:

  • পুরুষের জন্য: নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত সতর, তবে সম্পূর্ণ শরীর ঢাকা উত্তম।
  • মেয়েদের জন্য: সম্পূর্ণ শরীর (চেহারা ও হাত ছাড়া) আবশ্যক যদি অমাহরাম উপস্থিত থাকে। যদি মাহরাম মহিলারা একত্রে হয়, তাহলেও শালীন পোশাক জরুরি।
    ইবনে আবেদিন (রহ.) লিখেন: "কুরআনের মজলিশে পুরুষ ও মহিলা উভয়ের জন্য সবচেয়ে ভালো পোশাক হলো টাখনু পর্যন্ত লম্বা জামা ও মাথা ঢাকা।" (রদ্দুল মুহতার, ২/১৯২)

৫. তালিমের মজলিশে মেয়েদের সতর ও অন্যান্য আচরণ

মেয়েদের সতর:
উপরে বর্ণিত নিয়মই প্রযোজ্য। তালিমের মজলিশে (যেখানে কুরআন ও হাদিসের শিক্ষা হয়) মেয়েরা পর্দা রক্ষা করবে। চেহারা ও হাত পর্যন্ত খোলা রাখা জায়েজ, কিন্তু বেপর্দা হওয়া জায়েজ নয়।

শুয়ে পড়া কি আদবের খেলাপ?
হ্যাঁ, তালিমের মজলিশে শুয়ে পড়া বা হেলান দিয়ে বসা মাকরুহ। কারণ এটি মজলিশের আদবের পরিপন্থি এবং অলসতার লক্ষণ। হাদিসে এসেছে, নবী ﷺ বলেন: "যখন তোমরা জ্ঞানার্জনের মজলিশে বসো, তখন সোজা হয়ে বসো এবং বিনয় প্রকাশ করো।" (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস: ২১৯২)
হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী (রহ.) এর একটি ঘটনা: এক ব্যক্তি তাঁর মজলিশে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। তিনি তাকে মজলিশ থেকে বের করে দেন এবং বলেন: "এটি জ্ঞানার্জনের মজলিশ, আরামের জায়গা নয়।" (মালফুজাত হাকিমুল উম্মত, ১/২৮)

ইস্তেগফার পড়া ও বক্তার কথা শোনা:
মজলিশের সময় যদি কেউ মনে মনে ইস্তেগফার পড়ে, তবে তা যদি বক্তার কথা শোনায় বাধা সৃষ্টি করে, তবে তা ঠিক নয়। কারণ তালিমের মজলিশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বক্তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। ইমাম থানবী (রহ.) বলেন: "মজলিশে ইবাদতের নিয়তে হলেও ফরজে কিফায়া আদায়ের জন্য মনোযোগ দেওয়া জরুরি; ইস্তেগফার পড়লে উভয় দিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।" (ইমদাদুল ফতোয়া, ২/২৫১)
তবে যদি কেউ চুপচাপ শোনার সময় নিজের গুনাহের জন্য ইস্তেগফার করে, কিন্তু তার মানসিক উপস্থিতি বজায় থাকে, তাহলে দোষ নেই। কিন্তু অন্যদের যদি তা শুনতে পায় (উচ্চস্বরে না হলেও) এবং বিভ্রান্ত হয়, তবে তা বেয়াদবি গোনাহ হবে।

উপসংহার:

  • তালিম ও কুরআন মজলিশে সতর, বিনয় ও একাগ্রতা আবশ্যক।
  • শুয়ে থাকা, হেলান দেওয়া, বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকা মাকরুহ।
  • উল্লিখিত ঘটনাটি আশরাফ আলী থানবী (রহ.) এর বাস্তব জীবনের শিক্ষা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআনের আদব সংরক্ষণের তাওফিক দিন। (আমিন)

সূত্র:

  • রদ্দুল মুহতার (১/২৭২-২৭৮, ২/১৯২)
  • ফতোয়া উসমানি (১/১৮৪, ২/৩৪৫)
  • ইমদাদুল ফতোয়া (২/১৫০, ২/২৫১)
  • বাহিশতি জেওর (১/৫৬)
  • মালফুজাত হাকিমুল উম্মত (১/২৮)
  • মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা (হাদিস: ২৮৩৯)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.