কসম ভাঙ্গলে কি আমি কাফির-মুনাফিক হয়ে যাবো?

Halal and Haram · Hanafi

Questioner: Subha Sima
Question Asked: 31 May 2026, 11:27 PM
Reviewed & Published: 31 May 2026, 11:51 PM
Views: 48
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ,
একজন আল্লাহর কসম দিয়ে একটা কাজ করবে না বলেছে। মানে কিছু মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখবে না এই কসম নিয়েছে জেদ করে। সমস্যা হচ্ছে রাগে কসম করার সময় এভাবে বলেছে এই কসম ভাঙ্গলে আমি মুনাফিক কাফের হয়ে যাবো?
এখন এই কসম ভাঙ্গলে কি সত্যি সে কাফির মুনাফিক হয়ে যাবো?

Answer

ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমরা কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করছি।

সারসংক্ষেপ উত্তরঃ

উক্ত ব্যক্তি কাফের বা মুনাফিক হয়ে যাবেন না, ইনশাআল্লাহ। তবে তিনি একটি গুনাহ করেছেন (কসম ভঙ্গ করলে) এবং সেজন্য কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) আদায় করতে হবে। আর “কাফের/মুনাফিক হওয়ার” শর্তটি রাগের মাথায় বলা একটি অপবিত্র বা ভুল উচ্চারণ যা কোনো ইসলামী বিধানের ভিত্তিতে কার্যকর হবে না।

বিস্তারিত ব্যাখ্যাঃ

১. “কসম ভাঙলে কাফের/মুনাফিক” বলা কি কার্যকর?

হানাফী ফিকহের প্রধান গ্রন্থসমূহ (রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ইমদাদুল ফাতাওয়া) অনুযায়ী, ক্ষোভ বা রাগের মাথায় কসম ভঙ্গ করলে কাফের বা মুনাফিক হওয়ার শর্ত দেওয়া ইসলামী আকীদার পরিপন্থী

  • ইবনে আবেদীন (রহঃ) “রদ্দুল মুহতার” (৩/৭৩৮)-এ উল্লেখ করেছেনঃ

    “যদি কেউ বলে, ‘আমি যদি এই কাজ করি তাহলে আমি ইহুদী, খ্রিস্টান বা কাফের’, তবে তা কুফরী শব্দ হলেও যদি সে কসমের ভয় দেখানোর জন্য বা জোর দৃঢ়তার জন্য এমন বলে, তাহলে সে কাফের হয় না। তবে এ ধরনের কথা বলা মাকরূহ (নিষিদ্ধ) এবং তওবা ও ইস্তিগফার করা উচিত।”

  • ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর মতে, কসমের ক্ষেত্রে অপবিত্র শব্দ ব্যবহার করা (যেমন “আমি কাফের হব”) কার্যকর হয় না যদি না তা ইসলাম ধর্মকে অস্বীকার করার নিয়তে বলা হয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/২০৫)

২. রাগের কারণে কসমের বিধান

  • হাদীসে এসেছেঃ “রাগের মধ্যে কসম ও তালাকের কোন বিধান কার্যকর হয় না।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২১৯০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস: ২০৪৬)
  • হানাফী ফিকহে রাগের কারণে কসম ভঙ্গ করলে “ইয়ামীনুল গামুস” (মিথ্যা কসম) হবে না, বরং “লাগউ” (অর্থহীন কসম) গণ্য হবে। তবে এটি জেদ বা ক্রোধের কারণে হলেও তা পূর্ণাঙ্গ কসম হিসেবেই গণ্য হবে যার কাফফারা দিতে হবে। (আল-হিদায়া, ২/৪৫২)

৩. কসম ভাঙলে কি করবেন?

  • কাফফারার বিধানঃ

    • ১০ জন মিসকীনকে মধ্যম মানের খাবার খাওয়ানো (বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে প্রতিজনকে ৫০০-৬০০ টাকা বা সমতুল্য খাবার) অথবা
    • ১০ জন মিসকীনকে পোশাক দেওয়া অথবা
    • যদি এতে অক্ষম হন, তাহলে পরপর ৩ দিন রোজা রাখা। (সূরা আল-মায়িদা: ৮৯)
  • কসম ভাঙলে কাফের/মুনাফিক হওয়ার ভয় করার দরকার নেই। বরং কাফফারা আদায় করা আবশ্যক। আর “মুনাফিক কাফের” বলে কসমের পরিভাষা দেওয়া একটি গুনাহ। সুতরাং, আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা না বলার সংকল্প করতে হবে।

৪. গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাঃ

  • উত্তম কাজ হলো কসম ভেঙে কাফফারা দেওয়া যদি সম্পর্ক রাখা তার জন্য জরুরি হয় (যেমন আত্মীয়তার সম্পর্ক বা ইসলামী ভ্রাতৃত্ব রক্ষা)।
  • হাদীসে এসেছেঃ “যদি কেউ কোনো কসম করে কিন্তু পরে সে কাজটি করা ভালো মনে করে, তাহলে সে যেন কাফফারা আদায় করে এবং ভালো কাজটি করে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৬২২)
  • আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহঃ) ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন, “ক্ষোভের কসম ভঙ্গ করলে শুধু কাফফারা ওয়াজিব হয়; কুফরী হয় না।” (ফয়যুল বারী, ৪/৪৯২)

পরামর্শঃ

  1. কসম ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলেঃ

    • “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু...” পড়ে কসম ভাঙ্গুন।
    • উত্তম পন্থায় কাফফারা আদায় করুন (অর্থ সামর্থ্য থাকলে)।
  2. আকীদা সংশোধনেঃ

    • কসমের সাথে “কাফের/মুনাফিক” শব্দ ব্যবহার করা হারাম ও গুনাহ। তবে এটি কুফরী নয়।
    • আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তিগফার করুন।
  3. মনে রাখুনঃ ইসলামে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আল্লাহ ও রাসূলকে অস্বীকার না করলে কাফের হয় না। এখানে তো কসমের পরিভাষা মাত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

সর্বোত্তম সিদ্ধান্তঃ

আপনার আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামে বৈধ নয় (যদি না তারা ধর্মীয় বা নৈতিকভাবে বিপজ্জনক হয়)। সুতরাং, উত্তম হলো এই কসম ভেঙে কাফফারা দেওয়া এবং তাদের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা। আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকুন।

উপসংহারঃ আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা অপরিসীম। আপনাকে আশ্বস্ত করছি, এই কসম ভাঙলে আপনি কাফের বা মুনাফিক হবেন না। তবে কাফফারা ও তওবা আবশ্যক। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। (আমীন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.