ইস্তিখারার পর বারবার এক ব্যক্তির প্রতি অন্তরের ঝোঁক ও কুফু না থাকার দ্বিধা।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
কোন একজন বোন একজন ব্যক্তিকে তার দ্বীনদারিতা, আদব, আখলাকর জন্য বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করে এবং এ ব্যাপারে বেশি আগানোর আগে তাকে বিয়ে করা ঠিক হবে কিনা এব্যাপারে কয়েকবার ইস্তেখারা করে। পরবর্তীতে দেখা যায় ঐ ব্যক্তির সাথে তার কুফু মিলে না তাই এ ব্যাপারে আর বেশি না ভাবার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর যখন অন্যান্য সম্বন্ধের জন্য চেষ্টা করতে যায় বা ইস্তেখারা করে, দেখা যায় পূর্বোক্ত ব্যক্তির দিকেই তার অন্তর বার বার ঝুঁকে যাচ্ছে এবং ঐ ব্যক্তিকেই সবচেয়ে উত্তম মনে হচ্ছে। অন্য কাউকে পছন্দ হচ্ছে না। কিন্তু কুফুর জন্য ভাবার সাহস পাচ্ছে না৷ ঐ বোনের এখন করণীয় কি??
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে বোনটির করণীয় হলো— তিনি যেন পূর্বোক্ত ব্যক্তির সাথে বিবাহের বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনা করেন এবং কেবল কুফু (সামঞ্জস্য) না থাকার অজুহাতে তাকে পুরোপুরি বর্জন না করেন। নিম্নে শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করা হলো।
১. কুফু (সামঞ্জস্য) কী এবং এর গুরুত্ব
হানাফি ফিকহে কুফু বলতে বংশ, পেশা, স্বাধীনতা ও দীনদারির ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সামঞ্জস্য বোঝানো হয়। তবে দীনদারি ও আখলাক ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে কুফু নির্ণয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।
- রাদ্দুল মুহতার (৩/৭৮): ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, কুফুতে মূল বিবেচ্য হলো দীনদারি ও আখলাক, বংশ বা পেশা নয়। কেননা রাসূল (সা.) বলেছেন: "إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ" (যখন তোমাদের কাছে এমন কেউ বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসে যার দীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তবে তাকে বিবাহ দাও) [তিরমিযি: ১০৮৪, ইবনে মাজাহ: ১৯৬৭]।
অতএব, যদি ঐ ব্যক্তি দ্বীনদার ও সচ্চরিত্রের অধিকারী হয়, তবে কুফু’র বাকি শর্তগুলো (যেমন বংশ বা আর্থিক অবস্থা) গৌণ। তাই শুধুমাত্র বংশ বা পেশাগত অমিলের কারণে তাকে প্রত্যাখ্যান করা শরিয়তসম্মত নয়।
২. ইস্তিখারা ও ইশারা (সংকেত)
বোনটি কয়েকবার ইস্তিখারা করার পরও বারবার ঐ ব্যক্তির দিকে তার অন্তর ঝুঁকছে এবং অন্য কাউকে পছন্দ হচ্ছে না— এটি ইস্তিখারার পর ইশারা হতে পারে।
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন: ইস্তিখারার পর অন্তরে যদি কোনো বিষয়ের প্রতি প্রবল ঝোঁক বা স্বচ্ছন্দতা অনুভূত হয়, তবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ইশারা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, তবে শর্ত হলো যে সেটি শরিয়তের কোনো নিষেধাজ্ঞার মধ্যে না পড়ে। (মা‘আরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা: ২১৬-এর তাফসির)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৯৮): ইস্তিখারার পর বারবার কোনো বিষয়ের প্রতি অন্তরের টান পড়তে থাকলে তা গ্রহণ করা উত্তম, কারণ এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে খায়র (কল্যাণ) নির্দেশ করতে পারে।
৩. পূর্বোক্ত ব্যক্তিকে বিবাহ করার সিদ্ধান্তে কী করা উচিত
বোনের করণীয়:
(ক) পিতামাতা বা অভিভাবকের সাথে পরামর্শ করুন: শরিয়তে বিবাহের জন্য অভিভাবকের সম্মতি আবশ্যক। যদি ঐ ব্যক্তি দ্বীনদার হয়, তবে অভিভাবকদের বোঝানোর চেষ্টা করুন যে কুফু’র মূল শর্ত দীনদারিই।
(খ) পুনরায় ইস্তিখারা করুন: মনে শান্তি না এলে এক বা দুই রাতে পুনরায় ইস্তিখারা করুন। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ‘মনোভাব’ চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়— বরং ইস্তিখারার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া, তারপর অন্তরে যা প্রবল হয় সেটি গ্রহণ করা।
(গ) কোনো বিশ্বস্ত আলেমের শরান নিন: সরাসরি দ্বীনদার ব্যক্তির সাথে বিবাহ করলে কী কী সমস্যা হতে পারে (যেমন বংশগত কারণে সামাজিক চাপ) তা বিশ্লেষণ করুন। তবে মনে রাখতে হবে, দ্বীনদার স্বামীই প্রকৃত কল্যাণকর।
৪. গুরুত্বপূর্ণ হাদিস ও ফিকহি উদ্ধৃতি
- হাদিস: "تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ" (নারীকে চারটি কারণে বিবাহ করা হয়: সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য ও দ্বীন। তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধুলিমাখিত হোক!) [বুখারি: ৫০৯০, মুসলিম: ১৪৬৬]।
- ফাতাওয়া আলমগিরি (১/২৭১): কুফুতে দীনদারি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি পুরুষ দ্বীনদার হয়, তবে বংশ বা অর্থের অমিল কুফুর পরিপন্থী নয়।
- আল-হিদায়া (২/৩০১): ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, বংশগত কুফু শুধু কুরাইশ ও আরবদের জন্য প্রযোজ্য, অন্যদের জন্য নয়। অন্যথা দীনদারিই মূল মাপকাঠি।
৫. চূড়ান্ত পরামর্শ
বোনটি যদি নিশ্চিত হন যে ঐ ব্যক্তি সত্যিই দ্বীনদার ও সচ্চরিত্র, তাহলে কুফু’র ক্ষুদ্র বিষয় (যেমন বংশ বা পেশা) তাকে বাধা দেবেন না। বরং পিতামাতার সাথে আলোচনা করে, ইস্তিখারার পর অন্তরের প্রবল ইঙ্গিত অনুযায়ী কাজ করুন। যদি এখনও ইতস্তত বোধ করেন, তবে আরও একবার ইস্তিখারা করুন এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে সিদ্ধান্ত নিন।