ইস্তেখারার পর বারবার এক ব্যক্তির প্রতি মন ফিরে আসা, কুফু না থাকা সত্ত্বেও বিয়ে করার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেবেন?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
কোন একজন বোন একজন ব্যক্তিকে তার দ্বীনদারিতা, আদব, আখলাকর জন্য বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করে এবং এ ব্যাপারে বেশি আগানোর আগে তাকে বিয়ে করা ঠিক হবে কিনা এব্যাপারে কয়েকবার ইস্তেখারা করে। পরবর্তীতে দেখা যায় ঐ ব্যক্তির সাথে তার কুফু মিলে না তাই এ ব্যাপারে আর বেশি না ভাবার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর যখন অন্যান্য সম্বন্ধের জন্য চেষ্টা করতে যায় বা ইস্তেখারা করে, দেখা যায় পূর্বোক্ত ব্যক্তির দিকেই তার অন্তর বার বার ঝুঁকে যাচ্ছে এবং ঐ ব্যক্তিকেই সবচেয়ে উত্তম মনে হচ্ছে। অন্য কাউকে পছন্দ হচ্ছে না। কিন্তু কুফুর জন্য ভাবার সাহস পাচ্ছে না৷ ঐ বোনের এখন করণীয় কি??
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইস্তেখারা হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করার একটি সুন্নত পদ্ধতি। ইস্তেখারার পর অন্তরে যে প্রবণতা বা স্বস্তি আসে, তা ইঙ্গিতবহ হতে পারে। তবে ইস্তেখারা শুধু একবার বা কয়েকবার করার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া সুন্নত নয়; বরং যতক্ষণ পর্যন্ত অন্তর এক দিকে স্থির হয় বা বাস্তব অবস্থা অনুকূল হয়, ততক্ষণ ইস্তেখারা করা যায়।
ইস্তেখারার পর অন্তরের টান: আপনার বোন যখন প্রথমে তার পছন্দের ব্যক্তিকে বিয়ে করতে ইস্তেখারা করেছিল এবং পরে কুফু না থাকায় (কুফু অর্থ বংশ, মর্যাদা, ধন-সম্পদ ইত্যাদিতে সমতা) সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে অন্য সম্বন্ধের সময় বারবার পূর্বোক্ত ব্যক্তির প্রতি মন ফিরে যাচ্ছে এবং তাকেই উত্তম মনে হচ্ছে, এটি ইস্তেখারার একটি ইঙ্গিত হতে পারে। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ বলেন, ইস্তেখারার পর যদি অন্তর কোনো দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং বাধা না থাকে, তবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ইশারা হিসেবে গণ্য করা উচিত। তবে সবসময় অন্তরের টান চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়; বাস্তব অবস্থার সঙ্গেও মিলিয়ে দেখা জরুরি। (রাদ্দুল মুহতার, ৫/২৭৫)
কুফু (সমতা) বিষয়ে হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: হানাফী মাজহাবে কুফু (বিবাহে সমতা) একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, তবে তা বিবাহের বৈধতার শর্ত নয় বরং পূর্ণতার শর্ত। অর্থাৎ বর-কনের বংশ, ধর্মপরায়ণতা, পেশা, সম্পদ ইত্যাদিতে সমতা থাকা বাঞ্ছনীয়, কিন্তু যদি না থাকে তবুও বিবাহ বৈধ হবে, যদি উভয় পক্ষ (বিশেষত অভিভাবক) সম্মত হয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, দ্বীনদারিতা (দ্বীন) কুফুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি বলেন, “যার দ্বীন ও চরিত্র ভালো, তাকে বিবাহ করো।” (সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ১০৮৪)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ‘মাআরিফুল কুরআন’-এ বলেন, দ্বীনদারিতার পর মর্যাদা ও অর্থের বিষয় গৌণ। তাই যদি আপনার বোনের পছন্দের ব্যক্তি দ্বীনদার, আদব ও আখলাকে উত্তম হয়, এবং কুফু শুধু পারিবারিক বা অর্থনৈতিক কারণে হয়, তবে তা তাকে বিয়ে করার পথে বাধা হওয়া উচিত নয়। তবে অভিভাবকের অনুমতি নেওয়া জরুরি; কারণ হানাফী ফিকহে বিবাহের বৈধতার জন্য স্ত্রীর অভিভাবক (ওয়ালী) থাকা আবশ্যক নয়, কিন্তু সুন্নত ওই যে ওয়ালীর সম্মতি নিয়ে বিবাহ হয়। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩০০)
আপনার বোনের করণীয়:
১. পুনরায় ইস্তেখারা ও পরামর্শ করুন: তিনি আবার একাকী তাহাজ্জুদে উঠে দুআ ও ইস্তেখারা করুন। এ সময় আল্লাহর কাছে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য বিশেষভাবে প্রার্থনা করুন। পাশাপাশি একজন বিজ্ঞ আলেম বা অভিজ্ঞ ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করুন।
-
কুফুর বিষয়টি পরীক্ষা করুন: প্রকৃত কুফু কী কারণে হচ্ছে তা বুঝুন। যদি তা শুধু পারিবারিক ঐতিহ্য বা সামাজিক মর্যাদার কারণে হয়, অথচ পাত্র দ্বীনদার ও সচ্চরিত্র, তাহলে অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা করুন। ইসলামে দ্বীনদারিতাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কাছে যদি এমন ব্যক্তি আসে যার দ্বীন ও চরিত্র তোমাদের পছন্দ হয়, তাহলে তাকে বিবাহ করিয়ে দাও।” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
-
অভিভাবকের মতামত নিন: আপনার বোনের অভিভাবক (বাবা বা ভাই) যদি কুফুর কারণে আপত্তি করেন, তবে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন। কুরআন-হাদীসের দলিল দিয়ে বুঝান যে দ্বীনদারিতাই মূল মাপকাঠি। যদি অভিভাবক রাজি না হন, তাহলে তার ওপর জোর করা ঠিক নয়; তবে তিনি তার পক্ষে দোয়া ও প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে পারেন।
অভিভাবকদের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু না করার পরামর্শ থাকবে।
-
বাস্তব বাধা ও সম্ভাবনা মূল্যায়ন: বিয়ের পর পারিবারিক কলহ বা সামাজিক অস্বস্তির সম্ভাবনা থাকলে তা এড়িয়ে চলাই উত্তম। তবে যদি উভয় পক্ষের অভিভাবক সম্মত হন, তাহলে কুফু বড় বাধা নয়।
-
অন্তরের প্রবণতাকে গুরুত্ব দিন: পূর্বোক্ত ব্যক্তির প্রতি বারবার অন্তর ফিরে আসা এবং অন্য কাউকে না পছন্দ হওয়া ইঙ্গিত করে যে, আল্লাহ হয়তো তাকেই নির্ধারণ করেছেন। অনেক সময় ইস্তেখারার ফল এমন হয় যে, অন্তরকে এক দিকে স্থির করে দেওয়া হয়। তাই সাহস করে এগিয়ে যেতে পারেন, তবে বুদ্ধি-বিবেচনাও প্রয়োগ করবেন।
সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা:
- দ্বীনদারিতা ও চরিত্র থাকলে কুফুকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেবেন না।
- অভিভাবককে রাজি করানোর চেষ্টা করুন; তাদের সঙ্গে আলোচনা করুন।
অভিভাবকদের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু না করার পরামর্শ থাকবে।
- পুনরায় ইস্তেখারা করুন এবং শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্তে অন্তর শান্তি পায়, তা গ্রহণ করুন। তবে যদি স্পষ্ট কোনো বাধা (যেমন পাত্রের দ্বীনদারির দুর্বলতা বা পরিবারের তীব্র আপত্তি) থাকে, তাহলে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তা না মানাই উত্তম।
আল্লাহ তাআলা আপনার বোনকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফীক দিন। আমীন।