ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কুফু ও ইস্তিখারার পরিপ্রেক্ষিতে দ্বীনদার ব্যক্তিকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত।

Marriage and Divorce · Hanafi

Questioner: Muslimah
Question Asked: 28 May 2026, 03:21 PM
Reviewed & Published: 28 May 2026, 03:41 PM
Views: 31
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ,

কোন একজন বোন একজন ব্যক্তিকে তার দ্বীনদারিতা, আদব, আখলাকের জন্য বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করে এবং এ ব্যাপারে বেশি আগানোর আগে তাকে বিয়ে করা ঠিক হবে কিনা এ ব্যাপারে কয়েকবার ইস্তেখারা করে। পরবর্তীতে দেখা যায় ঐ ব্যক্তির সাথে তার কুফু মিলে না তাই এ ব্যাপারে আর বেশি না ভাবার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর যখন বিয়ের অন্যান্য সম্বন্ধের জন্য চেষ্টা করতে যায় বা ইস্তেখারা করে, দেখা যায় পূর্বোক্ত ব্যক্তির দিকেই তার অন্তর বার বার ঝুঁকে যাচ্ছে এবং ঐ ব্যক্তিকেই সবচেয়ে উত্তম মনে হচ্ছে। অন্য কাউকে পছন্দ হচ্ছে না। কিন্তু পূর্বোক্ত ব্যক্তির ব্যাপারে কুফুর জন্য ভাবার সাহস পাচ্ছে না৷ ঐ বোনের এখন করণীয় কি ??

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের সারমর্ম: একজন বোন দ্বীনদারিতা, আদব ও আখলাকের কারণে একজন ব্যক্তিকে বিয়ে করার ইচ্ছা করেন। কিন্তু কুফু (সামঞ্জস্য) না থাকায় তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। এখন অন্য সম্বন্ধ দেখতে গিয়ে বা ইস্তিখারা করলেও তার অন্তর প্রথম ব্যক্তির দিকেই ঝুঁকে যায় এবং তাকেই সর্বোত্তম মনে হয়। করণীয় কী?


উত্তর

প্রথমেই বুঝতে হবে যে, কুফু (বয়স, শিক্ষা, বংশ, অর্থনৈতিক অবস্থা ইত্যাদির সামঞ্জস্য) ইসলামে বিয়ের জন্য শর্ত নয়, তবে এটি মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) এবং অভিভাবকদের জন্য বিবেচ্য বিষয়। অন্যদিকে দ্বীনদারিতা ও আখলাক হলো বিয়ে করার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম মাপকাঠি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

"إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ" (سنن الترمذي، كتاب النكاح، باب ما جاء في تزويج من يرضى دينه وخلقه، حديث: 1085) অনুবাদ: “যখন তোমাদের কাছে সেই ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব দেয়, যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তবে তাকে বিয়ে করিয়ে দাও। যদি তা না করো, তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা ও বড় ধরনের ফাসাদ দেখা দেবে।”

অর্থাৎ দ্বীনদারিতা ও চরিত্রকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে, এবং কুফু গৌণ বিষয়। যদি কুফুর অভাব থাকে কিন্তু দ্বীন ও চরিত্র উত্তম হয়, তাহলে তা বিয়ের বাধা হওয়া উচিত নয়—বিশেষ করে যখন মেয়েটির অন্তর বারবার সেই ব্যক্তির দিকেই ফিরে যায় এবং ইস্তিখারার মাধ্যমেও তাকে উত্তম মনে হয়।


ইস্তিখারার ফলাফল ও অন্তরের প্রবণতা

ইস্তিখারা করার পর যদি অন্তর কোনো একটি পথের দিকে ধাবিত হয় এবং সেটাই সহজ হয়, তবে তা ইস্তিখারার ইতিবাচক ফলাফল বলে গণ্য হয়। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন:

"وإذا استخار العبد ربه في أمر فسُهّل له الأمر ويسّر فهي علامة الخيرة" (رد المحتار، كتاب الحظر والإباحة، باب الوكالة، ج ٦ ص ٣٧٤) অনুবাদ: “যদি বান্দা কোনো বিষয়ে তার রবের কাছে ইস্তিখারা করে, আর তার জন্য সে বিষয়টি সহজ ও সুগম হয়, তবে তা কল্যাণের নিদর্শন।”

এক্ষেত্রে বোনটি বারবার অন্যদের চেয়ে প্রথম ব্যক্তিকেই উত্তম মনে করছেন এবং তার অন্তর সেদিকে ঝুঁকছে—এটি ইঙ্গিত করে যে আল্লাহ তাকে সেই ব্যক্তির দিকেই নির্দেশ দিচ্ছেন। তাই কুফুর অভাবকে বড় বাধা না ভেবে দ্বীনের মানদণ্ডকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।


কুফু সম্পর্কে হানাফী ফিকহের নির্দেশনা

হানাফী মতে, কুফু শুধুমাত্র অভিভাবকের আপত্তির ভিত্তিতে বিয়ে ফাসিদ (অবৈধ) করতে পারে, কিন্তু মেয়ে ও ছেলে উভয়ে রাজি থাকলে কুফুর অভাব বিয়ে বাতিল করে না। ফাতাওয়া আলমগীরীতে উল্লেখ আছে:

"والكفاءة معتبرة في النكاح عند أبي حنيفة في النسب والصنعة والحرية والدين والمال، ولا يثبت الخيار للأولياء إلا عند اختلاف الدين أو الحرية، وأما في غيرهما فلا خيار لهم إذا رضيت المرأة" (فتاوى عالمگيري، كتاب النكاح، الباب الرابع في الكفاءة، ج ١ ص ٢٨٣) অনুবাদ: “ইমাম আবু হানীফার মতে কুফু বিবেচ্য বংশ, পেশা, দাস/মুক্ত, দ্বীন ও ধনে। কিন্তু অভিভাবকের আপত্তির অধিকার শুধু দ্বীনের ভিন্নতা ও দাসত্বের ক্ষেত্রে; অন্যথায় মেয়ে রাজি থাকলে অভিভাবকের খিয়ার (বিয়ে ভঙ্গের অধিকার) নেই।”

আর দ্বীনের ভিন্নতা এখানে নেই (কারণ উভয়ই মুসলিম) এবং দাসত্বও বিদ্যমান নয়। তাই শুধু বংশ বা অর্থনৈতিক কারণে মেয়ে রাজি থাকলে বিয়ে বৈধ। ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেছেন, কুফুর প্রকৃত ভিত্তি হলো দ্বীনদারিতা; বংশ বা ধন গৌণ। (الهداية، كتاب النكاح، فصل في الكفاءة)


বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয়

১. দ্বীন-আখলাককে প্রাধান্য দিন: প্রথম ব্যক্তি যদি দ্বীনদার ও সুশীল হয়, তাহলে কুফুর সামান্য অভাব ত্যাগ করে তাকেই বেছে নেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে উত্তম। রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “তোমরা দ্বীনদারকেই বিয়ে করো।” (বুখারী ও মুসলিম)

২. পুনরায় ইস্তিখারা করুন: অন্তরে দ্বিধা দূর করার জন্য আবারও নামাযে দুআ করুন। ইস্তিখারার পর যে পথে অন্তর প্রশান্ত হয়, সেটাই গ্রহণ করা উচিত। যেমন হাদীসে এসেছে: “তারপর যে কাজের প্রতি মন আকৃষ্ট হয়, সেটাই করো।” (বুখারী, বাবু বাব ইস্তিখারাত)

৩. অভিভাবকের সাথে আলোচনা: কুফুর বিষয়ে অভিভাবক যদি আপত্তি তোলেন, তাহলে তাদের বোঝান যে দ্বীন-আখলাকই আসল মাপকাঠি এবং আপনার ইস্তিখারায় এই ব্যক্তিই উত্তম মনে হচ্ছে। হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, দ্বীনের দিক থেকে কুফু বিদ্যমান থাকলে অন্য কারণে অভিভাবকের আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়।

★অভিভাবকদের সিদ্ধান্তের বাইরে কিছু না করার পরামর্শ থাকবে।

৪. সাহস করে সিদ্ধান্ত নিন: যদি অন্তর স্পষ্টভাবে তাকে পছন্দ করে এবং ইস্তিখারার মাধ্যমেও তা স্পষ্ট হয়, তাহলে কুফুর ভয়ে ত্যাগ না করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিন। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। কুরআনে এসেছে:

﴿وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾ [الطلاق: ٢-٣] “যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দেন যা সে কল্পনাও করে না।”


মোটকথা

  • প্রথম ব্যক্তিটিকেই বিয়ে করা উত্তম সিদ্ধান্ত, কারণ তার দ্বীন ও আখলাক উত্তম এবং ইস্তিখারার মাধ্যমেও তাকেই নির্দেশিত মনে হচ্ছে।
  • কুফুর অভাব দ্বীনের তুলনায় গৌণ; হানাফী মতে তা বিয়ে বাতিল করে না।
  • অভিভাবকদের দ্বীনদারিতার ভিত্তিতে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।

আল্লাহই সর্বোত্তম জ্ঞানী।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.