হজ্ব এজেন্সির প্রতারণা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ নিয়ে ইসলামী নির্দেশনা।
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
আশা করি ভাল আছেন। আমি জানিনা আমার হজ্ব কবুল হয়েছে কিনা, কিন্তু গত ১১ দিনে আমি এজেন্সির বিভিন্ন বিষয়আদি নিয়ে তাদের কথার চরম বরখেলাপ নিয়ে আমি অনেক অসন্তুষ্ট।
৪ জনের বেডের কথা বলে ৭ জন থাকা এবং ১১ জনের ব্যবহারের জন্য ১টা মাত্র বাথরুমসহ আরো বিভিন্ন কথার বরখেলাপ দেখে আমার কিছু বলার ইচ্ছা ছিল না। আমি চুপ ছিলাম। তবে আমি ওই হোটেলে থাকাকালীন এজেন্সির মালিকের ছেলেকে এইটা বলেছিলাম যে আমাকে যাতে এরপরের হোটেলে ৪-জনের বেডে রাখা হয়, তারা আমাকে সেই আশ্বাসও দিয়েছে। কিন্তু এখন এসে দেখি আমরা ৫-জন একটা ছোট রুমে গাদাগাদি করে থাকছি (আপনাকে ভিডিও দিয়েছি)।
বিষয়টা আমি এজেন্সির মালিককে জানালে উনি বলেন যে আমাকে ২দিন পরে যদি ৪-বেডের রুম খালি হয় তাহলে আমাকে সেখানে রাখা হবে। আমি তখন বলি যে এইটাতো কথা ছিল না, বরং আমাকে যে ৪-জনের রুমে রাখা হবে এই কথাতো বরখেলাপ করা হয়েছে। এইটা বলার পর উনি বলেন, বেশি তর্ক করলে নাকি আমি যেইখানে আছি, আমাকে সেইখানেই থাকতে হবে - আমাকে চেঞ্জ করে দিবেনা।
এখন আমার কি করনীয়, হুজুর?
আল্লাহ্র কসম, আমি যদি জানতাম এই এজেন্সি এমন কথার বরখেলাপ করবে, তাহলে আমি কখনোই তাদের মাধ্যমে হজ্বে আসতাম না!
Answer
ওয়ালাইকুমুসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নকারী ভাই, আপনার হজ্বের সফরে এজেন্সির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং অসুবিধার কথা শুনে আমি খুবই দুঃখিত। আল্লাহ তাআলা আপনার হজ্ব কবুল করুন এবং ধৈর্যের বিনিময়ে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।
উত্তরের মূল কথাঃ
আপনার সাথে এজেন্সির যে আচরণ হয়েছে, তা ইসলামী আদর্শ ও চুক্তির শর্ত ভঙ্গের সুস্পষ্ট উদাহরণ। ইসলামে চুক্তি বা ওয়াদা পূর্ণ করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা চুক্তি পূর্ণ করো।" (সূরা মায়েদা ৫:১)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ
الْمُسْلِمُونَ عِنْدَ شُرُوطِهِمْ
"মুসলিমগণ তাদের শর্তাদির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।" (আবু দাউদ, মিশকাত)
এখন আপনার করণীয়ঃ
১. ধৈর্য ও হিকমতের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া
এজেন্সির সাথে উত্তেজিত না হয়ে শান্তভাবে পুনরায় কথা বলুন। তাদের বোঝান যে তারা যে শর্ত দিয়েছে তা পূর্ণ করেনি। যদি তারা ৪-বেডের রুমের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে, তাহলে তাদের সেটা পালন করা জরুরি। হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি ওয়াদা ভঙ্গ করে, তার মধ্যে মুনাফেকির নিদর্শন রয়েছে। (বুখারী)
২. ইসলামী আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দাবি করা
হানাফী ফিকহের কিতাব রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে, কোনো চুক্তিতে প্রতারণা বা শর্ত ভঙ্গ করলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ চুক্তি বাতিল করতে পারে এবং প্রাপ্ত অর্থ ফেরত দাবি করতে পারে অথবা ক্ষতিপূরণ নিতে পারে। (রাদ্দুল মুহতার ৪:৪৫৮)
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, প্রতারিত ব্যক্তি তার পাওনা আদায়ের জন্য আদালতে যেতে পারে। (ফাতাওয়া আলমগীরী ৩:৫৬৫)
৩. সৌদি আরবে হজ্ব মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ
আপনি যদি এখনো সৌদি আরবে থাকেন, তাহলে সৌদি হজ্ব মন্ত্রণালয়ের নিকট অভিযোগ করতে পারেন। সরকারি আইনে হজ্ব এজেন্সির বিরুদ্ধে প্রতারণার শাস্তি রয়েছে।
৪. দেশে ফিরে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ
দেশে ফিরে এজেন্সির বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার সংস্থায় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে পারেন। ইসলামী শরীয়তে জালিমের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়া বৈধ।
৫. হজ্ব কবুলের বিষয়ে আশা না হারানো
মনে রাখবেন, হজ্ব কবুল হওয়ার জন্য নিয়ত ও আমলের বিশুদ্ধতা মুখ্য। এজেন্সির দোষ হজ্বের সাওয়াবে বাধা দেবে না। বরং আপনার ধৈর্য্য ও অসুবিধা সহ্য করার জন্য আল্লাহ বিশেষ পুরস্কার দিবেন। রাসূল (সা.) বলেছেনঃ
الْحَجُّ الْمَبْرُورُ لَيْسَ لَهُ جَزَاءٌ إِلَّا الْجَنَّةُ
"হজ্বে মাবরুরের প্রতিদান শুধু জান্নাত।" (বুখারী)
এখানে "মাবরুর" হলো সেই হজ্ব যাতে কোনো গুনাহ ও প্রতারণা না থাকে। আপনার ইচ্ছা ছিল সঠিক, তাই আল্লাহ আপনার নিয়ত কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়াঃ
এজেন্সির কর্তব্য ছিল প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৪-বেডের রুম দেওয়া। তারা তা না করে ৫ জনকে একটি ছোট রুমে রাখা জুলুম। আপনি চাইলে চুক্তি বাতিল করে অর্থ ফেরত দাবি করতে পারেন অথবা সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে পারেন। হজ্বের সফরে ঝগড়া না করে ধৈর্য ও হিকমতের সাথে সমাধান বের করা উত্তম।
আল্লাহ তাআলা আপনার হজ্ব কবুল করুন এবং প্রতারক এজেন্সিকে হিদায়াত দিন অথবা তাদের থেকে ন্যায় আদায়ের তাওফীক দিন। আমিন।