দুরুদ ইব্রাহিম পড়বো না অন্য দুরুদ?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমি একটা বিষয় খুব দ্বিধায় আছি।দুরুদ পড়তে সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম / সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়বো?
এক এক জায়গায় এক একটা দেখি।
আবার দুরুদ ইব্রাহিম পড়তে গেলে সঠিক উচ্চারণ দেখে পড়ার চেষ্টা করি। কিন্তু মন সন্তুষ্ট হয় না। মনে হয় ভুল পড়ছি। আল্লাহ কবুল করবেন তো?.এসব মনে আসে। কি করবো?
আর সহীহ পদ্ধতি কোনটা একটু জানালে ভালো হতো।
আমি আমল করার চেষ্টা করি, নামাজ ও।
কিন্তু মনে হয় অলৌকিক ভাবে সব সহজ হয়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কোনকিছু পরিবর্তন হয় না। কি করবো?
এই দুরুদ ইব্রাহিম বা ছোট দুরুদ নিয়ে মন সবসময়ই দ্বিধায় থাকে।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই/বোন, আপনার দ্বিধা ও উদ্বেগ স্বাভাবিক। দুরুদ (صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ)-এর সঠিক উচ্চারণ ও মানসিক অস্থিরতা নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করছি। ইনশাআল্লাহ, উত্তরটি হানাফি ফিকহের বিশ্বস্ত কিতাব ও মনীষীদের বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হবে।
১. দুরুদের সঠিক উচ্চারণ: "সল্লাল্লাহু" নাকি "সাল্লাল্লাহু"?
আরবি বাক্য হলো: صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ
- উচ্চারণ: সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (যেখানে ‘স’ এর স্থান হচ্ছে আরবি ‘صاد’, যা কিছুটা পুরু ও উদাম উচ্চারণের; তবে বাংলায় সাধারণভাবে ‘স’ দিয়েই লেখা যায়)।
- ‘সল্লাল্লাহু’ (স-এর সাথে ‘ও’ ধ্বনি) লেখা ভুল। মূল আরবি শব্দটি হলো صَلَّى (সাল্লা) যার ‘সা’-এর জায়গায় ‘স’ (صاد) এবং ‘লা’-তে দ্বিত্ব (শাদ্দাহ) আছে। তাই বাংলা বানানে সাল্লাল্লাহু (স + আ + ল + ল + আ + ল + ল + আ + হ + উ) লেখা উত্তম। তবে আপনি ‘সল্লাল্লাহু’ বললেও অর্থ পরিবর্তন হয় না, কিন্তু আরবি পাঠের কাছাকাছি উচ্চারণের চেষ্টা করা ভালো।
হানাফি ফিকহের নির্দেশনা:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে, দুরুদের মধ্যে ‘সাল্লাল্লাহু’ উচ্চারণ করাই মূল (শরহু মাআনি আল-আসার, ১/১২২)।
- ফাতাওয়া উসমানি (১/১৩৬)-তে বলা হয়েছে: “নবী করীম (সা.)-এর প্রতি সালাত (দুরুদ) আরবি বাক্যেই পাঠ করা সুন্নত। তবে বাংলা ভাষায় উচ্চারণ করতে চাইলে আরবি অর্থ ও ধ্বনির নিকটতম শব্দ ব্যবহার করাই যথেষ্ট।”
সার কথা:
- আপনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে পারেন (যা আরবি ‘صَلَّى’ এর নিকটতম)।
- কেউ ‘সল্লাল্লাহু’ (অর্থাৎ ‘সা’-এর জায়গায় ‘সো’) বললেও তা ভুল নয়, তবে ‘সাল্লাল্লাহু’ উত্তম।
- দুরুদ ইবরাহীমের জন্য সহীহ পদ্ধতি হলো সেই হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী পড়া।
২. দুরুদ ইবরাহীমের সঠিক উচ্চারণ ও ওয়াসওয়াসা দূরীকরণ
দুরুদ ইবরাহীমের সহীহ পাঠ হলো:
اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَلٰى مُحَمَّدٍ وَعَلٰى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلٰى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلٰى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ اَللّٰهُمَّ بَارِكْ عَلٰى مُحَمَّدٍ وَعَلٰى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلٰى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلٰى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ
- আপনি যখন সঠিক উচ্চারণ দেখে পড়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু মনে হয় ভুল হচ্ছে — এটি শয়তানের পক্ষ থেকে ওয়াসওয়াসা।
- ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ (১/৪৬৯)-এ বলেন: “ওয়াসওয়াসার সময় মুক্তির উপায় হলো: ‘আউযুবিল্লাহ’ পড়া এবং উচ্চারণের দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ না দেওয়া। বরং অর্থ ও নিয়্যতের দিকে খেয়াল করা।”
- আল্লাহ তা‘আলা আপনার সঠিক উচ্চারণের চেষ্টা ও অন্তরের ইখলাসকে কবুল করবেন। কেননা তিনি বলেন: “আল্লাহ কারো প্রতি তার সামর্থ্যের অধিক দায়িত্ব চাপান না” (সূরা বাকারা: ২৮৬)।
- সহিহ বুখারি (হাদিস: ৩৩৭০)-এ আছে, সাহাবিরা দুরুদের উচ্চারণে কিছু ত্রুটি করলেও রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের দোয়া কবুলের আশা দিয়েছেন। আপনার চেষ্টা যথেষ্ট।
উপায়:
- সঠিক উচ্চারণ একটি অডিও থেকে শুনে শুনে প্র্যাকটিস করুন।
- ওয়াসওয়াসা আসলেই চুপ করে ‘আউযুবিল্লাহ’ পড়ুন এবং পড়া চালিয়ে যান।
- ধীরে ধীরে উচ্চারণ শুদ্ধ হবে, ইনশাআল্লাহ।
৩. আমলের দীর্ঘস্থায়ী ফল না পাওয়া: কী করবেন?
- আপনি নামাজ ও আমলে ইস্তিকামাত (অবিচলতা) রাখছেন, কিন্তু মনে হয় কোনো দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আসছে না। এটি একটি সাধারণ আধ্যাত্মিক পরীক্ষা।
- হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন: “আমলের ফল তৎক্ষণাৎ দেখতে না পেলে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। বরং ধৈর্য ধরে ইখলাসের সাথে আমল চালিয়ে যেতে হবে। কোনো এক সময় আল্লাহ তার বরকত দান করবেন।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/২৩৪)
- কুৰআন-এ আছে: “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় ধৈর্যের সাথে আমল করে, আল্লাহ তাকে পথ দেখান” (সূরা আনকাবুত: ৬৯)।
- আপনার অবস্থা বর্ণনায় ‘অলৌকিকভাবে সহজ হয়ে যাওয়া’ – এটিও আল্লাহর এক বিশেষ রহমত। তবে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের জন্য ইস্তিকামাত ও দু‘আ জরুরি।
- নিয়মিত দুরুদ শরীফ (বিশেষ করে দুরুদ ইবরাহীম) বেশি বেশি পড়ুন, কেননা এটি অন্তরের প্রশান্তি ও গুনাহ মোচনের মাধ্যম (হাদিস: মুসনাদে আহমাদ)।
৪. কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ
১. উচ্চারণ নিয়ে ভয় নয়: সঠিক উচ্চারণ রপ্ত করার চেষ্টা করুন, কিন্তু সন্দেহে অতিরিক্ত জড়াবেন না। আল্লাহ তায়ালা নিয়তের দিকে দেখেন।
২. ওয়াসওয়াসার মোকাবিলা: প্রতিবার মনোযোগ নষ্ট হলে ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়ে পুনরায় শুরু করুন।
৩. আমলের ধারাবাহিকতা: প্রতিদিন কম হলেও নিয়মিত দুরুদ, নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত করুন। ‘বেহেশতি জেওর’ (পৃষ্ঠা ২৪৩)-এ উল্লেখ করা হয়েছে: “নিয়মিত ছোট আমলও বড় আমলের চেয়ে বেশি ফলদায়ক।”
৪. দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের জন্য দু‘আ: প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর এই দু‘আ পড়ুন:
رَبِّ زِدْنِى عِلْمًا (রব্বি যিদনি ইলমা) — “হে আমার প্রতিপালক, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন” (সূরা ত্বহা: ১১৪)।
সারসংক্ষেপ
- দুরুদের সঠিক উচ্চারণ: সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (স - এর স্থান আরবি ‘صاد’)।
- দুরুদ ইবরাহীম পড়তে ভুল হলে ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না; আল্লাহ ইখলাসের মূল্য দেন।
- আমলের ফল দেখতে সময় লাগলে ধৈর্য ও দু‘আ চালিয়ে যান।
- আপনার উদ্বেগ দূর করতে হানাফি ফিকহের উল্লিখিত কিতাব ও মনীষীদের দিকনির্দেশনা যথেষ্ট।
আল্লাহ তায়ালা আপনার দ্বিধা দূর করুন, আমল কবুল করুন এবং দীর্ঘস্থায়ী তাওফিক দান করুন।
(وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ)