বোরকার পরিবর্তে জামার উপরে হিজাব-নিকাব ও পা মোজা পরিধান করলে কি পর্দা হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
প্রচন্ড গরমে বা নরমালি লং টাইম নন মাহরামের সামনে বোরখা পড়া কষ্টকর।এক্ষেত্রে গোল জামার উপরে হিজাব নিকাব পা মোজা পড়লে পর্দার খিলাফ হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। সংক্ষেপে বললে, গোল জামা + হিজাব + নিকাব + পা মোজা পরা পর্দার খিলাফ হবে না যদি নিচের শর্তগুলো পূরণ করে। তবে বোরখার পরিবর্তে এই পোশাক ব্যবহার করতে হলে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। নিচে হানাফি ফিকহের মূলনীতি ও কিতাবের রেফারেন্সসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
পর্দার মূল শর্ত (হানাফি মতে)
কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে নারীর জন্য অমাহরামের সামনে পর্দার আবশ্যকীয় শর্তগুলো হলো:
- সমস্ত দেহ আবৃত করা – তবে হাতের তালু (কব্জি পর্যন্ত) ও মুখমণ্ডল ব্যতিক্রম। (হানাফি মতে পা’র ওপরের অংশ তথা পায়ের পাতা এবং টাখনু সতর, তাই ঢেকে রাখা ফরজ।)
- পোশাক ঢিলেঢালা ও অটোয়েট না হওয়া – যেন শরীরের গঠন প্রকাশ না পায়।
- পোশাক পাতলা ও স্বচ্ছ না হওয়া – যেন ভেতরের অঙ্গ দেখা না যায়।
- মাথা, কণ্ঠ ও বক্ষস্থল সম্পূর্ণ আবৃত করা – হিজাব অবশ্যই বুকের ওপর নামিয়ে পরতে হবে।
(সূত্র: কুরআন ২৪:৩১, ৩৩:৫৯; রদ্দুল মুহতার ১/৪০৬; ফতোয়া উসমানী ২/৪৪৭; বেহেশতী জেওর ১/৫২-৫৩)
গোল জামা + হিজাব + নিকাব + মোজা – বিধান
১. গোল জামা (লম্বা আলখাল্লা/কামিজ)
- যদি এটি ঢিলেঢালা হয়, আঁটসাট না হয়, স্বচ্ছ না হয় এবং হাঁটুর নিচ পর্যন্ত বা টাখনু পর্যন্ত লম্বা হয় – তাহলে এটি বোরখার বদলে ব্যবহার করা জায়েজ।
- শর্ত: জামার হাতা কব্জি পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে এবং শরীরের কোথাও টাইট না হয়।
- সতর্কতা: পায়ের পাতা ও টাখনু অবশ্যই মোজা বা জুতোর মাধ্যমে ঢাকা থাকতে হবে (হানাফি মতে পায়ের পাতাও সতর)।
২. হিজাব
- চুল, কান, গলা ও বক্ষস্থল পুরোপুরি ঢাকতে হবে। স্কার্ফ বা হিজাব এমনভাবে পরতে হবে যেন ঘাড় ও বুকের ওপরের অংশ ঢাকা পড়ে।
৩. নিকাব
- হানাফি মতে মুখমণ্ডল পর্দার জন্য ফরজ নয়, তবে উত্তম ও ফিতনার যুগে আবশ্যক। যেহেতু আপনি নিকাব পরছেন, তাই এটি উত্তম। তবে চোখ খোলা রাখার অনুমতি আছে।
৪. পা মোজা
- পায়ের পাতা ও টাখনু অবশ্যই মোজা দিয়ে ঢাকতে হবে। হানাফি ফিকহে পায়ের টাখনু পর্যন্ত সতর গণ্য। (রদ্দুল মুহতার ১/৪০৬)
কোন পরিস্থিতিতে এটি পর্দার খিলাফ হবে?
নিচের ক্ষেত্রে এই পোশাক পর্দার শর্ত পূরণ করবে না এবং বোরখার স্থানে গ্রহণযোগ্য হবে না:
- গোল জামা যদি আঁটসাট হয় বা শরীরের বক্রতা ফুটিয়ে তোলে।
- গোল জামা যদি হাঁটুর ওপর পর্যন্ত ছোট হয় – তাহলে পায়ের ওপরের অংশ (থাই, হাঁটু) উন্মুক্ত থাকবে, যা অমাহরামের সামনে নাজায়েজ।
- হিজাব যদি শুধু মাথায় থাকে কিন্তু গলা ও বুক না ঢাকে।
- মোজা না পরে শুধু জুতা পরলে – পায়ের পাতা ও টাখনু খোলা থাকলে পর্দা হবে না।
- গোল জামার ফ্যাব্রিক পাতলা ও স্বচ্ছ হলে।
গরমের সময় সহজ পর্দা
গরমের জন্য হালকা সুতির, ঢিলেঢালা এবং মোটা কাপড়ের পোশাক নির্বাচন করা যায়। বোরখার বদলে আবায়া (লম্বা ও ঢিলেঢালা ওড়না-সহ জামা) বা চাদর-ওড়না ব্যবহার করা যায়। তবে অবশ্যই শর্তগুলো মানতে হবে।
উল্লেখ্য: ফতোয়া উসমানী (১/৫৭৪) ও ইমদাদুল ফতোয়া (২/২০৭)-এ এসেছে, পর্দার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ডিজাইন জরুরি নয়, বরং শরীরের ঢেকে রাখা, ঢিলেঢালা ও অটোয়েট না হওয়া মূল শর্ত। তাই গোল জামা+হিজাব+নিকাব+মোজা বৈধ, যদি ওপরের শর্তগুলো পূর্ণ হয়।
সংক্ষিপ্ত জবাব
আপনার বর্ণিত পোশাক (গোল জামা + সঠিক হিজাব + নিকাব + পা মোজা) পর্দার খিলাফ নয় এবং প্রচণ্ড গরমে বা দীর্ঘ সময় অমাহরামের সামনে এটি ব্যবহার করা জায়েজ, যদি:
✔ গোল জামা ঢিলেঢালা, টাখনু পর্যন্ত লম্বা ও অস্বচ্ছ হয়।
✔ হিজাব মাথা, কান, গলা ও বুক ঢেকে রাখে।
✔ নিকাব মুখমণ্ডল ঢেকে রাখে (চোখ খোলা থাকলে সমস্যা নেই)।
✔ মোজা পায়ের পাতা ও টাখনু পুরোপুরি ঢেকে রাখে।
অতএব, বোরখা না পরে এই পোশাক পরলে পর্দা আদায় হবে, ইনশাআল্লাহ।
والله أعلم بالصواب
আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন।