বিয়ে নিয়ে সংশয়: কাবিনের কথা চলছে, কিন্তু বাসা থেকে পরের বছর করতে বলছে। অনেক দেরি করলে নজর লাগবে কিনা?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার কাবিনের কথা চলছে,তবে বাসা থেকে চাচ্ছে নেক্সট ইয়ার
আমার একটু ভয় লাগছে যে ভালো কাজ এতো লেট করা উচিত হবে কিনা,নজর লেগে যাবে কিনা
বাট যদি জোড় দিই আমি তাহলে যখন চাবো হয়ে যাবে।কিন্তু যদি আমার জোড়ের পর কাবিন করা হয় & কোনো প্রবলেম হয়!
বুঝতে পারছিনা যে আমি জোড় দিয়ে ২-৩ মাসের মধ্যে করে ফেলবো কিনা!!
Answer
উত্তরঃ
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
বিবাহ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত এবং পবিত্র বন্ধন। এটি দেরি না করে সম্ভব হলে দ্রুত সম্পাদন করা উত্তম। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
"হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যার বিবাহের সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে। নিশ্চয়ই তা দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।" (সহীহ বুখারী, হাদীসঃ ৫০৬৫; সহীহ মুসলিম, হাদীসঃ ১৪০০)
এখানে 'সামর্থ্য' বলতে নাফাকা (জীবিকা নির্বাহের ক্ষমতা) ও শারীরিক সক্ষমতা বোঝানো হয়েছে। আপনার ক্ষেত্রে যদি বর্তমানেই সামর্থ্য থাকে এবং পাত্র-পাত্রী উভয়ই রাজি থাকে, তাহলে বিয়ে পরবর্তী বছরের জন্য ঠেলে না দিয়ে শীঘ্রই সম্পাদন করাই শ্রেয়। এতে নিম্নলিখিত উপকারিতা রয়েছে:
১. নজর লাগার ভয় দূর হয় – ভালো কাজে বিলম্ব করলে নজর লাগার আশঙ্কা থাকে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"নজর লাগা সত্য।" (সহীহ বুখারী, হাদীসঃ ৫৭৪০; সহীহ মুসলিম, হাদীসঃ ২১৮৭)
তবে নজর থেকে বাঁচার জন্য 'মাশাআল্লাহ' বলা এবং সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়া সুন্নাত। কিন্তু বিলম্ব করে নজর লাগার ভয় করাটা সমীচীন নয়; বরং দ্রুত সম্পাদন করা নিরাপদ।
২. বিলম্বের কারণে ফিতনার আশঙ্কা – বিয়ে পিছিয়ে দিলে শয়তানের প্ররোচনায় পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই যখনই সুযোগ হয়, বিয়ে তাড়াতাড়ি করে ফেলা উত্তম।
৩. পিতামাতার মতামত ও জোর দেওয়ার পদ্ধতি – আপনি যদি মনে করেন যে পরিবারকে জোর দিলে বিয়ে ২-৩ মাসের মধ্যে হয়ে যাবে, তাহলে আপনি তা করতে পারেন। তবে জোর দেওয়ার অর্থ উত্তেজিত হয়ে বিতর্ক করা নয়; বরং মার্জিতভাবে যুক্তি দিয়ে বোঝানো এবং ইসলামের দৃষ্টিতে বিলম্বের ক্ষতি সম্পর্কে অবহিত করাই উত্তম। যদি পিতামাতা বৈধ কোনো কারণ (যেমন আর্থিক অস্বচ্ছলতা, শিক্ষা ইত্যাদি) ছাড়া বিলম্ব করতে চান, তবে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা উচিত। তবে যদি তারা জোরালোভাবে আপত্তি করেন এবং পরিস্থিতি জটিল হয়, তাহলে ধৈর্য ধারণ করাও জায়েজ আছে, তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করা কর্তব্য।
৪. জোর দেওয়ার পরও সমস্যা হলে – আপনি যদি জোর দেন এবং পরিবার রাজি হয়ে যায় কিন্তু পরে কোনো সমস্যা হয় (যেমন অর্থের অভাব, প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়া ইত্যাদি), তাহলে সেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। দ্বীনের কাজে বাধা আসলে তা দূর করার জন্য চেষ্টা করা ইবাদত। তবে জোর দেওয়ার সময় পরিবারের সম্মতি ও সুবিধার দিকটি বিবেচনায় রাখা জরুরি, যাতে অহেতুক ঝামেলা সৃষ্টি না হয়।
হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত:
- বিবাহে দেরির বৈধতা – ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) এর মতে, যার সামর্থ্য আছে এবং বিয়ে না করলে যিনার আশঙ্কা হয়, তার জন্য বিয়ে করা ওয়াজিব। আর যদি যিনার আশঙ্কা না থাকে, তাহলে মুস্তাহাব। (আল-হিদায়া, ৩/১৮৫; রদ্দুল মুহতার, ৩/৪)
- পিতামাতার অনুমতি – পাত্র বা পাত্রী উভয়ের জন্যই পিতামাতার সম্মতি নেওয়া জরুরি নয়, তবে সুসম্পর্কের জন্য গ্রহণ করা উত্তম। যদি পিতামাতা কোনো শরয়ী কারণে বাধা দেন (যেমন বিয়েতে কোনো অপকার আছে), তাহলে তাদের কথা মানা জরুরি। কিন্তু অকারণ বিলম্ব করলে তা জায়েজ নয়। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৭৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৩/২৬)
- নজর লাগার প্রতিকার – হাদীসে এসেছে, "যখন তোমাদের কেউ কোনো কিছু দেখে যা তাকে আশ্চর্যান্বিত করে এবং নজর লাগার ভয় করে, তখন সে যেন 'মাশাআল্লাহ' বলে।" (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীসঃ ৩৫২৫; শু‘আবুল ঈমান, বায়হাকী) আর দ্রুত কাজ সম্পাদন করাও নজর থেকে বাঁচার একটি উপায়।
সিদ্ধান্ত:
আপনি যদি নিশ্চিত হন যে জোর দিলে ২-৩ মাসের মধ্যে বিয়ে হয়ে যাবে এবং এতে কোনো বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাহলে পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করুন এবং দ্রুত বিয়ে সম্পাদন করে নিন। তবে যদি পরিবার আপত্তি জানায় এবং তা নিয়ে কলহ সৃষ্টি হয়, তাহলে ধৈর্য ধরা এবং তাদের নেক্সট ইয়ারের প্রস্তাবে সম্মত হওয়াই উত্তম, তবে এই সময় নিজেকে পবিত্র রাখার বিশেষ চেষ্টা করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকবেন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক পথ দেখান এবং আপনার বিবাহ বরকতময় করুন। আমীন।