"বেশি গুনাহ হয়ে গেছে কী করব,গীবত থেকে বাঁচার ইসলামিক উপায়"?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমার অনেক বেশি গুনাহ হয়ে গেছে,বার বার তাওবা করার পর ও গীবত,রিয়া,নামাজ কাযা,অন্যের হক নষ্ট সহ আরো অনেক গুনাহ। আর এখন আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আমার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসছে,মৃত মানুষকে স্বপ্নে দেখতেছি।
আমার গুনাহের কথা ভাবলে কষ্ট পাই,আর ভাবি এত গুনাহ নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবো কীভাবে?
উস্তায দয়া করে আমাকে কিছু নাসীহা দিন।
কী করবো আমি? আগের সব গুনাহের জন্য কী করতে পারি?আর যতদিন বেঁচে থাকবো,ততদিন গুনাহ থেকে কীভাবে বাচঁবো?
বি.দ্র: পরিবারের মানুষের সাথে থাকলে গুনাহ আরো বেশি হয়,গীবত,হিংসা, বিদ্বেষ ইত্যাদি।ওদের থেকে দূরে ও থাকা সম্ভব না।
এমতাবস্থায় আমার করণীয় কী?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রিয় ভাই/বোন, আপনার অনুভূতি এবং পেরেশানি আমি পুরোপুরি বুঝতে পারছি। আপনি বারবার তাওবা করার পরও গুনাহে লিপ্ত হচ্ছেন, এতে আপনার আত্মা কষ্ট পাচ্ছে এবং মৃত্যুর ভয় ও স্বপ্ন দেখা আপনাকে আরও উদ্বিগ্ন করছে। এটি আসলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নেয়ামত—তিনি আপনাকে জাগিয়ে দিচ্ছেন, যাতে আপনি সত্যিকার অর্থে ফিরে আসেন। কুরআন ও হাদিসের আলোকে আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
আগের সব গুনাহের জন্য করণীয়
আপনার আগের সব গুনাহের জন্য নিম্নলিখিত তিনটি শর্তে তাওবা কবুল হবে:
১. তাওবায়ে নাসূহা (খাঁটি তাওবা): আপনি যদি গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প করেন, অতীতের জন্য লজ্জিত হন এবং ভবিষ্যতে না করার ইচ্ছা পোষণ করেন, তাহলে আল্লাহ তায়ালা তাঁর অপরিসীম রহমতে সব গুনাহ মাফ করে দেবেন। সূরা যুমার, আয়াত ৫৩-এ আল্লাহ বলেছেন: "হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর অত্যাচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।" (সূরা যুমার: ৫৩)
২. কাযা নামাজ আদায়: নামাজ কাযা হওয়া একটি গুরুতর গুনাহ। আপনার জীবনে যত ফরজ নামাজ কাযা হয়েছে, সেগুলো হিসাব করে ধীরে ধীরে কাযা করতে হবে। ফতোয়ায়ে উসমানী ও হিদায়ায় উল্লেখ আছে, "নামাজ কাযা করা কবীরা গুনাহ, এবং এর জন্য কাযা আদায় করা ও তাওবা করা ফরজ।" (ফতোয়ায়ে উসমানী, ৩/৪৫৭; আল-হিদায়া, ১/১০৪)
৩. অন্যের হক আদায়: গীবত, হিংসা বা অন্য মানুষের হক নষ্ট করলে শুধু তাওবা যথেষ্ট নয়; সেই ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে অথবা তার হক ফিরিয়ে দিতে হবে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন: "বান্দার হক সংক্রান্ত গুনাহের তাওবা শুধু অনুতাপে হয় না, বরং হক আদায় করা জরুরি।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৪)
গুনাহ থেকে বাঁচার উপায়
আপনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, গুনাহ থেকে বাঁচতে নিম্নলিখিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন:
১. পরিবেশ পরিবর্তন করুন: আপনি বলছেন, পরিবারের সাথে থাকলে গীবত, হিংসা ইত্যাদি গুনাহ বেশি হয়। যদি সম্ভব হয়, তাদের থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করুন, অন্তত যেসব কাজে গুনাহ হয় সেসব জায়গায় না থাকা। তবে যদি আলাদা থাকা সম্ভব না হয়, তাহলে মৌন থাকা বা ভালো কথায় আলোচনা পরিবর্তন করা—এটাই উত্তম। হাদিসে এসেছে: "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।" (সহিহ বুখারি, ৬০১৮)
২. ইস্তিগফার ও জিকির অধ্যায়ন করুন: বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়ুন। যেমন "আস্তাগফিরুল্লাহ" বা "রাব্বানা ওয়া লা তুহাম্মিলনা মা লা তাকাতা লানা বিহি।" ইমদাদুল ফতোয়ায় আছে, "ইস্তিগফার গুনাহ মিটিয়ে দেয় এবং তাওবার শক্তি বৃদ্ধি করে।" (ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/৩৪৫)
৩. নেক সঙ্গী বেছে নিন: পরিবারের সঙ্গে থাকলেও বাইরে থেকে নেক্কার লোকদের সাথে সময় কাটান। একাকীত্ব ধ্বংসের কারণ হতে পারে, কিন্তু নেক সঙ্গী ইমান রক্ষা করে।
৪. নামাজের প্রতি আন্তরিক হোন: নামাজ হলো গুনাহ থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কুরআন বলেছে: "নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।" (সূরা আনকাবুত: ৪৫)
মৃত্যুর স্বপ্ন দেখা ও ভয় ভীতি
মৃত মানুষ স্বপ্নে দেখা বা মৃত্যুর ভয় আসা ভালো লক্ষণ হতে পারে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবাণী, যাতে আপনি তাওবায় ত্বরান্বিত হন। ইমাম কাশ্মীরী (রহ.) বলেছেন: "এ ধরনের স্বপ্ন মুমিনের জন্য রহমত, কারণ এটি তাকে শেষ জীবনের জন্য প্রস্তুত করে।" তবে এটি মৃত্যুর নিশ্চিত লক্ষণ নয়। বরং আপনি এ থেকে শিক্ষা নিন—আপনার গুনাহের জন্য লজ্জিত হয়ে আরও বেশি ইবাদতে মনোযোগী হোন।
বিশেষ নাসীহা
পরিবারের সাথে থাকলেও আপনি নিজেকে রক্ষা করতে পারেন। তাদের সঙ্গে সবসময় ভালো ব্যবহার করবেন, কিন্তু গুনাহের কাজে অংশ নেবেন না। হিংসা বা বিদ্বেষের স্থান থেকে দূরে থাকুন, এবং মনে রাখবেন—আপনার প্রকৃত জিহাদ হলো নিজের নফসের সঙ্গে। হাদিসে কুদসিতে এসেছে: "হে আদম সন্তান! তুমি যতক্ষণ আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে আশা রাখবে, আমি তোমার গুনাহ ক্ষমা করব, তাতে কিছু যায় আসে না।" (তিরমিজি, ৩৫৪০)
আপনার জন্য বিশেষ দোয়া: "রাব্বানা জালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনা লানা কুনান্না মিনাল খাসিরিন।" (সূরা আ'রাফ: ২৩)
আল্লাহ আপনার তাওবা কবুল করুন, গুনাহ থেকে হেফাজত করুন এবং আপনার অন্তরকে প্রশান্তি দান করুন। আমিন।