আমি নিজেকে চেঞ্জ করতে পারবোনা, এভাবে মেনে নিয়ে থাকতে পারলে থাকো, নাহলে ছেড়ে দিছি, চলে যাও। এদ্বারা কি তালাক পতিত হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
হাসবেন্ড নিয়মিত নামাজ না পড়ার কারনে বউ এর সাথে প্রায় ঝগড়া লাগে। বউ চায় বর যেন ইসলামের নিয়ম কানুন ঠিক ভাবে মানে। কিন্তু এতে করে হাসবেন্ড ভাবে বউটা তাকে কন্ট্রোল করতে চায়। ঝগড়া লাগার এক পর্যায়ে রাগের মাথায় হাসবেন্ড বলে আমি নিজেকে চেঞ্জ করতে পারবোনা, এভাবে মেনে নিয়ে থাকতে পারলে থাকো, নাহলে ছেড়ে দিছি, চলে যাও। আর এরকম করতে থাকলে তালাক দিয়ে দিব।যে তোমার মনের মতো তাকে বিয়ে করো। তখন বউ বলে , ভাল ব্যবহার করো, নয়তো লিগালি ডিভোর্স দিও। হাসবেন্ড আবারো রাগের মাথায় বলে "দিছি"। কিন্তু এখানে বলার বিষয় মন থেকে কেউ এ ডিভোর্স চায় না, যা হইছে সব রাগের মাথায় কথোপকথন। এখন ২ জনের কেউ এ চায় না আলাদা হইতে।
এখন আবার ঝগড়া ঠিক, সব ঠিক। এখন কি তাদের সম্পর্কের অবস্থান কি, তালাক হয়ে গেছে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়ার সময় স্বামী রাগের মাথায় বলেন:
"আমি নিজেকে চেঞ্জ করতে পারবোনা, এভাবে মেনে নিয়ে থাকতে পারলে থাকো, নাহলে ছেড়ে দিছি, চলে যাও। আর এরকম করতে থাকলে তালাক দিয়ে দিব। যে তোমার মনের মতো তাকে বিয়ে করো।"
এরপর স্ত্রী বলে: "ভাল ব্যবহার করো, নয়তো লিগালি ডিভোর্স দিও।"
তখন স্বামী পুনরায় রাগের মাথায় বলে: "দিছি।"
এখন উভয়ের ইচ্ছা না থাকলেও এই কথোপকথনের মাধ্যমে তালাক সংঘটিত হয়েছে কিনা, তা ফিকহী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
ফিকহী বিশ্লেষণ (হানাফী মাযহাব)
১. তালাকের শব্দের প্রকারভেদ:
হানাফী ফিকহে তালাকের শব্দ দুই প্রকার:
- সরীহ (স্পষ্ট): যে শব্দ থেকে সরাসরি তালাক বুঝা যায়, যেমন— "তালাক দিলাম", "আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম" ইত্যাদি। এসব শব্দে নিয়তের প্রয়োজন নেই।
- কিনায়াহ (অস্পষ্ট): যে শব্দ থেকে তালাক বুঝা যায় কিন্তু অন্য অর্থও হতে পারে, যেমন— "তুমি স্বাধীন", "তুমি আমার থেকে দূরে চলে যাও"। এসব শব্দে তালাক হওয়ার জন্য নিয়ত (ইচ্ছা) জরুরি।
২. এখানে ব্যবহৃত শব্দগুলোর বিচার:
- স্বামীর প্রথম বক্তব্য: "ছেড়ে দিছি, চলে যাও" এটি কিনায়াহ শব্দ। যেহেতু তিনি রাগের মাথায় বলেছেন, কিন্তু তার ইচ্ছা তালাকের ছিল না (প্রশ্নে উল্লেখিত), তাই শুধু এ বাক্যে তালাক হয়নি।
- তবে পরবর্তী বক্তব্য: "এরকম করতে থাকলে তালাক দিয়ে দিব" এটি ভবিষ্যতের জন্য শর্তযুক্ত তালাকের হুমকি, যা তখনই কার্যকর হয় যদি শর্ত পূরণ হয়। এখানে শর্ত পূরণের কথা স্পষ্ট নয়।
- স্ত্রীর কথার জবাবে স্বামী বলেন: "দিছি" (আমি দিয়েছি)। এই বাক্যটি কিনায়াহ। কিন্তু প্রেক্ষাপটে (স্ত্রী আগে বলেছিল "ডিভোর্স দাও") এটি তালাকের জবাব হিসেবে গণ্য হবে। হানাফী ফিকহে কিনায়াহ শব্দের মাধ্যমে তালাক তখনই কার্যকর হয় যখন বক্তার নিয়ত তালাকের হয়। যেহেতু স্বামী মন থেকে তালাক চায়নি, বরং রাগের মাথায় বলেছে, তাই এখানে নিয়তের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
৩. রাগের অবস্থায় তালাকের বিধান:
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, রাগের কারণে তালাক দিলে তা কার্যকর হয়, তবে শর্ত হলো রাগ এমন মাত্রায় না পৌঁছায় যে ব্যক্তি নিজের কথার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। যদি রাগ এত বেশি হয় যে সে কী বলছে তা বুঝতে পারে না, তাহলে তালাক কার্যকর হবে না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪২; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৫০৪)
উল্লিখিত ঘটনায় স্বামী রাগের মাথায় কথা বললেও তিনি সম্পূর্ণ বাক্য বলেছেন এবং কথার অর্থ বুঝতে পেরেছেন— এটি সাধারণ রাগ, যা তালাকের বৈধতাকে বাধাগ্রস্ত করে না। তবে এখানে "দিছি" শব্দটি কিনায়াহ হওয়ায় এবং তার নিয়ত তালাকের না থাকায়, অধিকাংশ হানাফী ফকীহের মতে তালাক সংঘটিত হয়নি।
৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
প্রশ্নের বর্ণনা অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রী উভয়েই পৃথক হতে চান না এবং তারা আবার স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া অনুসারে, এ ধরনের অনিচ্ছাকৃত, রাগের মাথায় বলা অস্পষ্ট শব্দ (কিনায়াহ) দ্বারা তালাক কার্যকর হবে না, যেহেতু তালাকের নিয়ত ছিল না। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে, কিনায়াহ শব্দে তালাকের জন্য নিয়ত আবশ্যক। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭২; আল-হিদায়া)
তবে, চূড়ান্তভাবে বলতে গেলে, সতর্কতার জন্য তারা একটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে পারেন: যদি স্বামী নিশ্চিত হন যে তার নিয়ত তালাকের ছিল না, তাহলে বর্তমান সম্পর্কই বহাল থাকবে। কিন্তু যদি সামান্যতম সন্দেহ থাকে, তাহলে পুনরায় বিবাহ (নতুন করে মোহরানা ধার্য করে) করে নেওয়া উত্তম। উভয়ই যদি একসঙ্গে থাকতে চান, তাহলে তালাকের প্রক্রিয়া শুরু না করেই সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া জায়েজ।
উপসংহার:
প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলতে পারি, তালাক সংঘটিত হয়নি। তবে দ্বীনের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করে তারা নিজেদের মধ্যে একটি লিখিত পুনঃবিবাহ (নতুন আকদ) করে নিতে পারেন, যাতে কোনো সন্দেহ না থাকে। স্বামীর জন্য নামাজের ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া এবং স্ত্রীর জন্য নরম ভাষায় উপদেশ দেওয়া কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি দান করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪২, ২৭০ (ابن عابدين)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭২ (فتاوى عالمگيرी)
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/৫০৪-৫০৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৮১
- আল-হিদায়া, ২/১১১