বন্ধুত্বকে পরিবার/বিবাহের মত বা উপরে প্রাধান্য দেওয়া কি জায়েয?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনায় ‘ক’ ব্যক্তি ‘খ’-এর কাছে এমন এক অঙ্গীকার দাবি করছে যা ইসলামী জীবনব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলামে স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি এবং নিকট আত্মীয়দের অধিকার অগ্রাধিকার পায়। বন্ধুত্ব গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা কখনোই পরিবার ও বিবাহের ওপর অগ্রাধিকার পেতে পারে না। নিম্নে বিষয়টি কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ করা হলো।
১. ইসলামে পরিবার ও বিবাহের মর্যাদা
ইসলাম বিবাহকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে গণ্য করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً
“আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই জাতি থেকে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আর-রূম: ২১)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
إِذَا تَزَوَّجَ الْعَبْدُ فَقَدْ كَمَّلَ نِصْفَ الدِّينِ
“যখন বান্দা বিবাহ করে, তখন সে তার অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করে ফেলে।” (মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস: ৩০৯৪)
অতএব, বিবাহের পর স্ত্রী ও সন্তানের অধিকার স্বামীর ওপর ফরয বা ওয়াজিব পর্যায়ের। বন্ধুত্ব তার তুলনায় গৌণ।
২. বন্ধুত্বের স্থান ও সীমা
ইসলামে হালাল বন্ধুত্বের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, তবে তা কখনো পরিবারের অধিকারকে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন:
الصَّدَاقَةُ مُبَاحَةٌ مَا لَمْ تُخْرِجْ عَنِ الْوَاجِبَاتِ
“বন্ধুত্ব জায়েয যতক্ষণ না তা ওয়াজিব (ফরয-ওয়াজিব) থেকে বিচ্যুত করে না।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৮)
প্রশ্নে ‘ক’ ‘খ’-কে তার “পরিবারের পর” স্থান দেওয়ার অঙ্গীকার চাইছে, অর্থাৎ সে ‘খ’-কে পরিবারের সদস্যের সমতুল্য করে দেখতে চায়। কিন্তু ইসলামী আইনে এটি সম্ভব নয়, কারণ স্ত্রী ও সন্তানের স্থান বন্ধুর চেয়ে অনেক উপরে। ইবনু আবিদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’-এ উল্লেখ করেন:
حُقُوقُ الزَّوْجَةِ وَالْأَوْلَادِ مُقَدَّمَةٌ عَلَى حُقُوقِ الْأَصْدِقَاءِ
“স্ত্রী ও সন্তানের অধিকার বন্ধুদের অধিকারের ওপর অগ্রগণ্য।” (রদ্দুল মুহতার, ৫/২৬৮)
৩. ‘ক’-এর দাবি ও ‘খ’-এর প্রত্যাখ্যান
‘ক’ চাইছে ‘খ’ তার জীবনসঙ্গী (বিয়ে) ও পরিবারের চেয়ে বন্ধুত্বকে অগ্রাধিকার দেবে। এটি সরাসরি ইসলামী বিধানের পরিপন্থী। কেননা:
- বিবাহের পরে স্ত্রীর ওপর স্বামীর দায়িত্ব ফরয। বন্ধুত্বের কারণে স্ত্রীর অধিকার লঙ্ঘন করা জায়েয নয়।
- পিতা-মাতার আনুগত্য (নাফরমানি না হলে) বন্ধুত্বের চেয়ে অগ্রগণ্য।
- ‘ক’-এর এই দাবি আসলে বন্ধুত্বের সীমা লঙ্ঘন করছে এবং এটি দুর্নীতি (فساد) সৃষ্টির কারণ হতে পারে।
ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেন:
لَا يَجُوزُ لِلْمُسْلِمِ أَنْ يُقَدِّمَ صَدَاقَتَهُ عَلَى مَا أَوْجَبَ اللَّهُ عَلَيْهِ مِنْ حُقُوقِ الْأَهْلِ
“মুসলিমের জন্য জায়েয নয় যে, সে তার বন্ধুত্বকে আল্লাহর দেওয়া পরিবারের অধিকারের ওপর অগ্রাধিকার দেবে।” (শারহু মা‘আনিল আছার, ৩/২৯০)
৪. ‘ক’-এর কথায় ভুল ও পরিহারযোগ্যতা
‘ক’ ‘খ’-কে বলেছে: “যদি বন্ধুত্বকে জীবনে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে চাও, তবে আমার সাথে আজীবন বন্ধুত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নিজের পরিবারের পর স্থান দাও।”
- এটি একটি অযৌক্তিক ও অনৈসলামিক শর্ত। কারণ বন্ধুত্ব ততক্ষণ পর্যন্তই উত্তম যতক্ষণ তা দ্বীনের সীমার মধ্যে থাকে। দ্বীনের সীমা লঙ্ঘন করলে তা নাজায়েয হয়ে যায়।
- ‘খ’-এর প্রত্যাখ্যান সঠিক ও বিবেকসম্মত। সে বুঝতে পেরেছে যে বন্ধুত্বের দাবি ইসলামের পরিপন্থী।
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) ‘মা‘আরিফুল কুরআনে’ উল্লেখ করেন:
بَنْدُوں کا آپَس میں محبت و اخوت بہت اچھی چیز ہے، لیکن اس میں اللہ اور اس کے رسول کی محبت سے زیادہ کسی کو مقام دینا جائز نہیں، اور نہ ہی اہل و عیال کے حقوق کو نظر انداز کرنا درست ہے।
“বান্দাদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব খুবই উত্তম, কিন্তু তাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসার চেয়ে কাউকে স্থান দেওয়া জায়েয নয়, এবং পরিবারের অধিকারকে উপেক্ষা করাও ঠিক নয়।” (মা‘আরিফুল কুরআন, সূরা হুজুরাতের তাফসীর)
৫. বিবাহ বন্ধুত্বের চেয়ে অগ্রাধিকার পাবে?
প্রশ্নে আছে: “বিয়ে এবং বন্ধুত্বের মধ্যে বন্ধুত্বকে কেউ প্রাধান্য দিতে চাইলে ব্যাপারটা কি খারাপ?”
- হ্যাঁ, এটি খারাপ এবং ইসলামী দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং ইসলামী সমাজের ভিত্তি। বন্ধুত্বের কারণে বিবাহকে পিছিয়ে দেওয়া বা স্ত্রীর অধিকার হরণ করা জুলুম।
হাদীসে এসেছে:
لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَطْرُقَ أَهْلَهُ لَيْلًا، وَلَا يَضَعَ قَدَمَهُ عَلَى قَدَمِ صَدِيقِهِ فَيُؤْذِيَ أَهْلَهُ
“মুসলিমের জন্য জায়েয নয় যে, সে রাতে তার পরিবারের কাছে (অসময়ে) প্রবেশ করুক, অথবা সে বন্ধুর কারণে তার স্ত্রীকে কষ্ট দেবে।” (মিশকাত, হাদীস: ৩২১৯)
সারসংক্ষেপ ও ফায়সালা
- ‘ক’-এর দাবি নাজায়েয কারণ এটি ইসলামের মৌলিক বিধান (পরিবার ও বিবাহের অগ্রাধিকার) লঙ্ঘন করে।
- ‘খ’-এর প্রত্যাখ্যান সঠিক ও শরী‘আতসম্মত।
- বন্ধুত্বকে বিবাহ ও পরিবারের ওপর প্রাধান্য দেওয়া কবীরা গুনাহ হতে পারে যদি তা স্ত্রী ও সন্তানের অধিকার হরণ করে।
- ঘটনায় কারো “খারাপ চিন্তা” না থাকলেও, দাবির প্রকৃতি নিজেই অনৈসলামিক। তাই ‘ক’-কে তওবা করতে হবে এবং পরিবার-বিবাহের গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দিন।