ইসলামী পরিবেশ ও ঈমান-আমল রক্ষার জন্য বিদেশে চাকরি করতে যাওয়া কি জায়েয?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
ফতোয়া: ইসলামী পরিবেশ ও ঈমান-আমল রক্ষার জন্য বিদেশ গমন
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, ওয়াস-সালাতু ওয়াস-সালামু আলা রাসূলিহিল কারিম
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—বাংলাদেশে সবাই ইসলামী জীবনযাপন করে না, বরং নারীবাদ (feminism) থেকে শুরু করে ইসলামবিরোধীরাও বিদ্যমান। এমন পরিস্থিতিতে চাকরির উদ্দেশ্যে এমন কোনো দেশে যাওয়া যাবে কি যেখানে নিজের ঈমান ও আমল ঠিক রাখা যাবে এবং পরবর্তী প্রজন্ম (ছেলে-মেয়ে)কেও ইসলামী পথে রাখা যাবে? বিশেষভাবে জাপান যাওয়া যাবে কি?
ফিকহী বিশ্লেষণ
১. মূল নীতি: দেশ নয়, দ্বীন-ঈমানের নিরাপত্তাই মাপকাঠি
ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট দেশ "হারাম" বা "হালাল" নয়; বরং মাপকাঠি হলো—ঈমান-আমল ও দ্বীন রক্ষার নিশ্চয়তা। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَمَن يُهَاجِرْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يَجِدْ فِي الْأَرْضِ مُرَاغَمًا كَثِيرًا وَسَعَةً "যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে হিজরত করে, সে পৃথিবীতে বহু আশ্রয়স্থল ও প্রশস্ততা পাবে।" — (সূরা আন-নিসা: ১০০)
আর যারা দ্বীনের ব্যাপারে ফিতনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা রাখে, তাদের সম্পর্কে কুরআন বলে:
إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنتُمْ ۖ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ ۚ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا "যাদের মৃত্যু হয় নিজেদের প্রতি জুলুম করার অবস্থায়, ফেরেশতারা তাদের বলে—তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে—আমরা ছিলাম দুর্বল ও নির্যাতিত। ফেরেশতারা বলে—আল্লাহর জমিন কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা হিজরত করতে?" — (সূরা আন-নিসা: ৯৭)
২. হানাফী ফিকহের মূলনীতি (কাওয়াইদ)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ এবং «আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর»-এ একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কায়েদা উল্লেখ করেছেন:
دَرْءُ الْمَفَاسِدِ أَوْلَى مِنْ جَلْبِ الْمَصَالِحِ "ক্ষতি দূর করা উপকার অর্জনের চেয়ে অগ্রগণ্য।"
এবং:
الضَّرَرُ لَا يُزَالُ بِالضَّرَرِ "ক্ষতি দিয়ে ক্ষতি দূর করা যায় না।"
«আল-হিদায়া» ও «ফাতাওয়া আলমগিরি»-তে বিলাদে কুফর (কাফির দেশ) সম্পর্কে আলোচনায় এসেছে—মুসলিমের জন্য সেখানে অবস্থান করা জায়েয কেবল তখনই, যখন তার দ্বীন ও ঈমানের নিরাপত্তা থাকবে; অন্যথায় নয়।
৩. হাদীসের দিশা
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُجَالِسْ أَهْلَ الْعِلْمِ وَالْحِكْمَةِ (মুসলিম ব্যক্তির জন্য দ্বীন রক্ষার জন্য সৎ ও জ্ঞানী মানুষের সাহচর্য জরুরি)
আরও ইরশাদ:
الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ "মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে; অতএব তোমাদের প্রত্যেকে যেন দেখে সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।" — (তিরমিজি: ২৩৭৮, আবু দাউদ: ৪৮৩৩)
«শরহু মাআনিল আছার» ও «মুয়াত্তা মুহাম্মদ»-এ ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বর্ণনা করেন—রাসূল ﷺ বলেছেন:
أَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ فِي رَبَضِ الْجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الْمِرَاءَ وَإِنْ كَانَ مُحِقًّا... (দ্বীন রক্ষার জন্য ঝগড়া-বিবাদ ও ফিতনাপূর্ণ পরিবেশ ত্যাগের ফযীলত)
৪. জাপান বা অন্য দেশে গমনের হুকুম
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা নিসার ৯৭ নং আয়াতের তাফসীরে বলেন—যে দেশে দ্বীন পালনে বাধা বা ফিতনার আশঙ্কা আছে, সেখানে অবস্থান করা মুসলিমের জন্য নাজায়েয; আর যেখানে দ্বীন পালনের স্বাধীনতা আছে, সেখানে জায়েয।
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী»-তে (খণ্ড ৩, বিলাদে কুফরে হিজরত ও ইকামত অধ্যায়) স্পষ্ট করেছেন—বিদেশে গমনের বৈধতা নির্ভর করে তিনটি শর্তের উপর:
- ঈমান-আকীদা ও ইবাদতের স্বাধীনতা থাকা;
- হারাম থেকে বেঁচে থাকার (হালাল রুজি, পর্দা, খানা-পিনা) নিশ্চয়তা;
- সন্তানদের দ্বীনী শিক্ষা ও তারবিয়াতের ব্যবস্থা থাকা।
«ইমদাদুল ফাতাওয়া» (মুফতি আশরাফ আলী থানভী রহ.)-তে এসেছে—যদি কোনো ব্যক্তি বিদেশে গিয়ে দ্বীন হারানোর আশঙ্কা করে, তবে তার জন্য সেখানে যাওয়া জায়েয নয়; বরং নিজ দেশে কম রুজিতে দ্বীন রক্ষা করা উত্তম।
«বেহেশতী জেওর»-এ হযরত থানভী (রহ.) বলেন—যেখানে দ্বীন শেখা ও পালনের সুযোগ নেই, সেখানে বসবাস মুসলিমের জন্য ক্ষতিকর।
৫. জাপান সম্পর্কে নির্দিষ্ট আলোচনা
জাপান একটি অমুসলিম দেশ। সেখানে:
- ইসলামী ইবাদতের স্বাধীনতা আছে, মসজিদ ও মুসলিম কমিউনিটি বিদ্যমান;
- তবে ফিতনা ও ইসলামবিরোধী পরিবেশ (নারীবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, বেপর্দা সংস্কৃতি) প্রবল;
- সন্তানদের ইসলামী তারবিয়াতের জন্য ইসলামী স্কুল ও পরিবেশের অভাব।
তাই শর্তসাপেক্ষে জাপান যাওয়া জায়েয হতে পারে—যদি:
- নিজের ঈমান-আমল রক্ষার দৃঢ় সংকল্প ও ব্যবস্থা থাকে;
- হালাল রুজির নিশ্চয়তা থাকে;
- সন্তানদের দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা (অনলাইন/লোকাল ইসলামী সেন্টার/মাদরাসা) করা যায়;
- ফিতনার পরিবেশ থেকে দূরে থাকার প্র্যাকটিক্যাল প্ল্যান থাকে।
অন্যথায়—বিশেষত অল্পবয়সী অবিবাহিত নারী হিসেবে একাকী বিদেশে যাওয়া, যেখানে মাহরাম নেই এবং ফিতনার আশঙ্কা প্রবল—হানাফী মতে নাজায়েয বা অত্যন্ত মাকরূহ। ইমাম ইবনে আবিদিন «রাদ্দুল মুহতার»-এ (কিতাবুল হজর, বাবুল ইহসার) নারীর সফরের আলোচনায় মাহরামের শর্ত উল্লেখ করেছেন।
সিদ্ধান্ত (خلاصة الفتوى)
-
দেশ নয়, দ্বীন-ঈমানের নিরাপত্তাই মূল মাপকাঠি। যে দেশে ঈমান-আমল ও সন্তানদের তারবিয়াত রক্ষার নিশ্চয়তা আছে—সেখানে চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়া মূলত জায়েয।
-
জাপান যাওয়া শর্তসাপেক্ষে জায়েয—যদি ঈমান-আমল, হালাল রুজি ও সন্তানদের দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়। তবে ফিতনার আশঙ্কা প্রবল হলে তাকওয়ার দৃষ্টিতে না যাওয়াই উত্তম।
-
নারীর ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা: মাহরাম ছাড়া দীর্ঘ সফর ও একাকী বিদেশে অবস্থান হানাফী মতে নিষিদ্ধ/মাকরূহ। পরিবারসহ বা মাহরামের সাথে যাওয়া জরুরি।
-
সর্বোত্তম পন্থা: নিজ দেশে বা নিকটবর্তী কোনো মুসলিম-অধ্যুষিত দেশে (যেমন মালয়েশিয়া, উপসাগরীয় দেশ) চাকরির সুযোগ খোঁজা, যেখানে দ্বীন পালন সহজ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا ۞ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করেনি।" — (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
- দোয়া: "আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল ফিতানি মা যাহারা ওয়া মা বাতান" — হে আল্লাহ! আমি প্রকাশ্য ও গোপন সব ফিতনা থেকে আপনার আশ্রয় চাই।
ওয়াল্লাহু আ'লাম বিস-সাওয়াব।
সংক্ষিপ্ত উত্তর (সারাংশ)
চাকরির জন্য বিদেশ যাওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, তবে শর্ত হলো—সেখানে ঈমান-আমল, হালাল রুজি ও সন্তানদের দ্বীনী তারবিয়াত রক্ষার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। জাপান শর্তসাপেক্ষে জায়েয; কিন্তু ফিতনার আশঙ্কা প্রবল হলে না যাওয়াই তাকওয়ার দাবি। নারীর ক্ষেত্রে মাহরাম ছাড়া একাকী যাওয়া হানাফী মতে নিষিদ্ধ। উত্তম হলো—মুসলিম-অধ্যুষিত দেশে সুযোগ খোঁজা এবং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা।
وَاللَّهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ