স্বপ্নে খাবার দেখা, মৃত পিতাকে খাবার চাইতে দেখা এবং তার জন্য সদকার নিয়ত করা—এ স্বপ্নের ইসলামি ব্যাখ্যা কী?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কেউ যদি স্বপ্নে কিছু খেতে দেখে এবং ঐ খাবার থেকে তার মৃত বাবা খাবার চান,সেটা খানও কান্না করে।আর যিনি স্বপ্ন দেখছেন তিনি স্বপ্ন দেখা অবস্থায় ওই খাবারের বদলে মৃত ব্যক্তির জন্য সদকাহ্'র নিয়্যত করেছেন।
এটা স্বপ্নের কি ব্যাখ্যা থাকতে পারে?শুনেছি স্বপ্নে তো খাবার খাওয়া ভালো না।তো এটাতে কোনো সমস্যা হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: স্বপ্নে খাবার দেখা বা খাওয়া নিজে থেকে কোনো নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর বিষয় নয়; বরং অনেক সময় তা রিযক, কল্যাণ ও উপকারের সুসংবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। মৃত পিতাকে স্বপ্নে খাবার চাইতে দেখা এবং তার জন্য সদকার নিয়ত করা—এটি সাধারণত মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ ও সদকার প্রতি উৎসাহব্যঞ্জক ইঙ্গিত হিসেবে ধরা যায়। এতে ভয় বা সমস্যার কিছু নেই; বরং এটি সদকা-দান ও দুআ অব্যাহত রাখার সুযোগ। তবে স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো নতুন ধর্মীয় বিধান বা বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয় না।
বিস্তারিত:
১) স্বপ্নে খাওয়া সম্পর্কে: হাদিসে স্বপ্নে দুধ পান করাকে ইলম ও দ্বীনের সুসংবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইবনু আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, “আমাকে স্বপ্নে দুধ পান করানো হলো; আমি পান করলাম, حتى বের হলো আমার নখ দিয়ে, তারপর বাকিটা উমর ইবনুল খাত্তাবকে দিলাম।” সাহাবিগণ বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! এর ব্যাখ্যা কী?” তিনি বললেন, “ইলম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ৮২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৭৪)।
আর ইবনু উমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, “আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি দুধ পান করলাম, حتى দেখলাম আমার নখের মধ্যে তার চর্বি বের হচ্ছে; তারপর বাকিটা উমরকে দিলাম।” সাহাবিগণ বললেন, “এর ব্যাখ্যা কী?” তিনি বললেন, “ইলম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৬৮১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৭৫)।
অতএব, স্বপ্নে খাবার দেখা বা পান করা সর্বাবস্থায় খারাপ নয়; বরং অনেক সময় তা রিযক, ইলম, উপকার ও কল্যাণের ইঙ্গিত হতে পারে। তবে স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না; এটি ইজতিহাদি ও সম্ভাবনাভিত্তিক বিষয়।
২) মৃত পিতাকে খাবার চাইতে দেখা: মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা এবং তার কোনো চাহিদা বা অনুরোধ দেখা—এটি সাধারণত মৃতের জন্য দুআ, ইস্তিগফার ও সদকার প্রতি জীবিতদের মনোযোগ আকর্ষণের ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়। হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, “মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা থেকে উপকার নেওয়া হয়, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১)।
অন্য হাদিসে এসেছে, “মৃত ব্যক্তির আমল তার মৃত্যুর সাথে বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয় ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, ইলম যা থেকে উপকার নেওয়া হয়, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৮৮০; তিরমিজি, হাদিস ১৩৭৬)।
তাই স্বপ্নে মৃত পিতার খাবার চাওয়া দেখে সদকার নিয়ত করা—এটি একটি ভালো ও প্রশংসনীয় প্রবণতা। এতে মৃতের উপকার হয় এবং জীবিতের জন্যও সাওয়াবের আশা করা যায়।
৩) স্বপ্নে খাওয়া ভালো নয়—এই ধারণা: এটি কোনো কুরআন-হাদিসের সুস্পষ্ট নিষেধ নয়। স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বিভিন্ন প্রতীক বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা হয়; কখনো খাবার রিযক, কখনো ইলম, কখনো উপকার, কখনো পরিশ্রমের ফল ইত্যাদি বোঝায়। তাই শুধু “স্বপ্নে খাবার খাওয়া ভালো না” বলে ভয় পাওয়া বা নিজেকে সমস্যায় ভাবা ঠিক নয়। বরং স্বপ্নকে হালকাভাবে নিয়ে, ভালো দিক ধরে আমল করা এবং খারাপ সম্ভাবনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া উচিত।
৪) সদকার নিয়ত সম্পর্কে: স্বপ্নে দেখা অবস্থায় “এই খাবারের বদলে মৃত ব্যক্তির জন্য সদকা করব” বলে নিয়ত করা—এটি স্বপ্নের ভেতরের মানসিক নিয়ত; জাগ্রত অবস্থায় তা কার্যকর ওয়াদা হিসেবে ধর্তব্য নয়, যদি না জাগ্রত হয়ে সদকা করার ইচ্ছা করেন। তবে জাগ্রত হয়ে মৃত পিতার জন্য সদকা করলে তা শরীয়তসম্মত এবং উপকারী। সদকা যে কোনো হালাল খাবার, টাকা-পয়সা বা প্রয়োজনীয় বস্তু দিয়েও হতে পারে।
৫) করণীয়:
- মৃত পিতার জন্য বেশি বেশি দুআ ও ইস্তিগফার করুন।
- সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করুন; বিশেষভাবে হালাল খাবার বা খাদ্যসামগ্রী সদকা করা ভালো।
- স্বপ্নকে ভয়ের কারণ না বানিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
- স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত না হয়ে আমল ও দুআতে মনোযোগ দিন।
- যদি স্বপ্নটি বারবার আসে বা মনে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, তবে অভিজ্ঞ আলিমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।
উপসংহার: প্রশ্নোক্ত স্বপ্নে কোনো সমস্যা নেই; বরং এটি মৃত পিতার জন্য সদকা ও দুআ করার সুযোগ হিসেবে নেওয়া যায়। স্বপ্নে খাবার খাওয়া সম্পর্কে “ভালো না” ধারণাটি সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য নয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস ৮২, ৩৬৮১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১, ২২৭৪, ২২৭৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৮৮০; তিরমিজি, হাদিস ১৩৭৬; রাদ্দুল মুহতার (ইবন আবিদিন), খণ্ড ২, সদকা ও দুআ অধ্যায়; ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), খণ্ড ১, মৃতের জন্য সদকা ও দুআ প্রসঙ্গ; ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), খণ্ড ১, মৃতের জন্য ঈসালে সাওয়াব প্রসঙ্গ।