উমরী কাযা প্রসঙ্গে
Salah-Prayer · Hanbali
Question
উমরী কাযা প্রসঙ্গে আমার একটা বিষয় জানার ছিল। অনেকে আলহামদুলিল্লাহ ছোটবেলা থেকে বা বালেগ হওয়ার পর থেকে পাঁচ ওয়াক্ত স্বলাত আদায় করে যদিও বেশিরভাগেরই ক্বুরআন সহীহ থাকে না এখন আমরা জানি ক্বিরাতে লাহানে জালী থাকলে নামায হয় না। এখন বালেগ হওয়ার পর থেকে শুরু করে যতদিন পর্যন্ত ওয়াক্তিয়া নামায টোটালি আদায় করা হয় না , সেই দিনগুলোর নামাযের কাযা আদায় করতে হবে? নাকি যতদিন পর্যন্ত ক্বুরআন সহীহ্ হয়নি অর্থাৎ তিলাওয়াতে লাহানে জালী ছিল ততদিনের নামাযও কাযা করতে হবে?
Answer
উমরী কাযা প্রসঙ্গে বিস্তারিত উত্তর
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
হাম্বলি মাযহাবের আলোকে আপনার প্রশ্নের উত্তরঃ-
না,হাম্বলি মাযহাব অনুসারে আপনার উমরী কাযা আদায় করতে হবে না। বালেগ হওয়ার পর থেকে যেসব নামায আপনি আদায় করেছেন—যদিও কিরাতে লাহনে জালী ছিল—সেগুলো সহীহ হয়েছে এবং কাযা করতে হবে না। কারণ লাহনে জালী সম্পর্কিত মাসআলায় ইজতিহাদী মতভেদ রয়েছে, আর যে ব্যক্তি কোনো ইজতিহাদী মাসআলায় ভুল করেছেন, তার ইবাদত বাতিল হয় না।
বিস্তারিত আলোচনা
১. লাহনে জালী সম্পর্কে ফকীহদের মতভেদ
লাহনে জালী (স্পষ্ট ভুল যা অর্থ পরিবর্তন করে) সম্পর্কে ফকীহদের মধ্যে দুটি প্রধান মত রয়েছে:
প্রথম মত (জুমহূর): লাহনে জালী থাকলে নামায বাতিল হবে না, বরং নামায সহীহ হবে—যদি না ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থ পরিবর্তন করা হয়। এটি হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত এবং ইমাম আহমাদ (রহ.) থেকে একটি বর্ণনা।
দ্বিতীয় মত: লাহনে জালী নামায বাতিল করে। এটি শাফেঈ ও হাম্বলী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত।
শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
«وَالْقِرَاءَةُ فِي الصَّلَاةِ لَا تَبْطُلُ بِاللَّحْنِ الَّذِي لَا يُغَيِّرُ الْمَعْنَى، وَأَمَّا الَّذِي يُغَيِّرُ الْمَعْنَى فَفِيهِ خِلَافٌ، وَالصَّحِيحُ أَنَّهُ لَا تَبْطُلُ إِلَّا إِذَا تَعَمَّدَ»
(নামাযে কিরাআত এমন লাহনে বাতিল হয় না যা অর্থ পরিবর্তন করে না। আর যা অর্থ পরিবর্তন করে, তাতে মতভেদ রয়েছে; সঠিক মত হলো—ইচ্ছাকৃত না হলে নামায বাতিল হয় না।)
শায়খ ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেছেন:
«الْأَصَحُّ أَنَّ اللَّحْنَ فِي الْقِرَاءَةِ لَا يُبْطِلُ الصَّلَاةَ إِلَّا إِذَا كَانَ فِي الْفَاتِحَةِ وَغَيَّرَ الْمَعْنَى تَغْيِيرًا كَامِلًا»
(সঠিক মত হলো—কিরাআতে লাহন নামায বাতিল করে না, তবে ফাতিহায় সম্পূর্ণ অর্থ পরিবর্তন হলে ভিন্ন কথা।)
২. ইজতিহাদী মাসআলায় ভুলের হুকুম
যে ব্যক্তি কোনো ইজতিহাদী মাসআলায় ভুল করেছেন—যেমন লাহনে জালীকে নামায বাতিলকারী মনে না করা—তার নামায সহীহ এবং কাযা ওয়াজিব নয়। কারণ:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ فَأَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ فَأَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ»
(যখন বিচারক ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, তার জন্য দুটি প্রতিদান; আর ইজতিহাদ করে ভুল করলে তার জন্য একটি প্রতিদান।) — সহীহ বুখারী ৭৩৫২, সহীহ মুসলিম ১৭১৬
শায়খ ইবনু বায (রহ.) ফতোয়া দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি অজ্ঞতাবশত নামাযে ভুল কিরাআত পড়েছে, তার নামায সহীহ এবং পুনরায় পড়তে হবে না।
৩. জাহেল ব্যক্তির ওযর
যে ব্যক্তি জানত না যে তার কিরাআত সহীহ নয়, বা জানত না যে লাহনে জালী নামায বাতিল করে—সে মা'যূর (ওযরপ্রাপ্ত)। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا﴾
(হে আমাদের রব! আমরা ভুলে গেলে বা ভুল করলে আমাদের পাকড়াও করবেন না।) — সূরা আল-বাকারা: ২৮৬
শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন: "যে ব্যক্তি অজ্ঞতাবশত কোনো ইবাদতে ত্রুটি করেছে, তার ওপর কাযা নেই; কারণ সে ওযরপ্রাপ্ত।"
৪. উমরী কাযা সম্পর্কে সতর্কতা
উমরী কাযা (বছরব্যাপী নামাযের কাযা) সম্পর্কে শায়খ ইবনু বায (রহ.) ও শায়খ ইবনু উসাইমীন (রহ.) স্পষ্টভাবে বলেছেন—এটি শরীয়তসম্মত নয় এবং এর কোনো দলীল নেই। বরং এটি কঠিন ও কষ্টদায়ক, যা ইসলামে নেই।
শায়খ ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেন:
«الْقَضَاءُ لِمَا مَضَى مِنْ سِنِينَ لَا يَجِبُ إِلَّا فِيمَا كَانَ تَرْكُهُ عَمْدًا بِلَا عُذْرٍ، وَأَمَّا مَا كَانَ بِجَهْلٍ أَوْ نِسْيَانٍ فَلَا قَضَاءَ فِيهِ»
(অতীত বছরের কাযা ওয়াজিব হয় না, তবে যে নামায ইচ্ছাকৃতভাবে বিনা ওযরে ছেড়েছে—সে ক্ষেত্রে ভিন্ন। আর যা অজ্ঞতা বা ভুলবশত হয়েছে, তার কাযা নেই।)