ইলম অর্জনে সহবতের গুরুত্ব ও করণীয়

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 8106
Questioner: Aysha Shahabuddin
Question Asked: 07 Nov 2026, 01:05 PM
Reviewed & Published: 07 Nov 2026, 03:06 PM
Views: 51
Tokens: 9,270
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ
আমি ছাত্রী ত্বলিবা।প্রায় অনেক বছর যাবত অনলাইনে ইলম শিখছি, প্রথম এবং প্রধান প্রতিষ্ঠান ছিল আমার আইওএম। সেখানকার উস্তাদদের সহবত, তাদের দরদি দিলের কথা আমার এখনো দিলে গেথে আছে।আমি এখনো পিপাসার্ত তাদের সহবত পেতে।তবে আমার ইচ্ছা এরাবিক নিয়ে পড়ার।তাই মাদানি নেসাব যেহেতু আইওএমে নেই তাই আমি অন্য প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হয়েছিলাম।সেখানে ইলম ভালোই শিখানো হয়েছিল তবে সহবতের কমতি ছিল, অর্থাৎ আইওএমের মত দারসে সহবত থাকতো না।এটা আমাকে অনেক পেরেশানি ফেলেছি।পরবর্তীতে আরেকটা প্রতিষ্ঠানে দুই মাস আগে ভর্তি হই, ভালো রিভিউ দেখেই জয়েন হয়েছি।কিন্তু এখানে আরো সহবতের ছিটাফোটাও পাচ্ছি না৷ আমার সাথে অন্য বোনেরাও আগের প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে এসেছেন।তাদেরও একই মত যে আগের প্রতিষ্ঠানে যাই ছিল এখানে তাও পাচ্ছি না। এখানে দাওরা পড়ানো হবে। ৭ বছরের কোর্স। এখন পরামর্শ চাচ্ছি যে,আলিম হওয়ার জন্য তো যোগ্য উস্তাদ উস্তাজার জরুরত৷ নয়ত আমরা আলেমা কীভাবে হবো।যেমন তেমন আলেমা হলেই তো হবে না।আর আমার মেইন ফোকাস হচ্ছে সহবত, তাকওয়া উস্তাদ উস্তাজাদের ইখলাস। এগুলো আসলে পাওয়াই যাচ্ছে না, আইওএমে দাওরাতে ভর্তি হবো ভেবেছিলাম,তবে সেখানে ছেলে মেয়ে এক সাথে৷ এটা আমার তাকওয়ার পরিপন্থি মনে হওয়াতে আমি চাইলেও যুক্ত হচ্ছি না৷ এখন কি করনীয়? বর্তমানে যে প্রতিষ্ঠানে আছি,সেটাতে থাকা উচিত? যদি ছেড়ে দেই, মন মতো কোনো প্রতিষ্ঠান পাচ্ছি না, যে যেখানে ইলমের সাথে এখলাস, তাকওয়া, দরদি দিল ওয়ালা উস্তাজা পাবো।কিন্তু মাদানি নেসাব না হলেও, এরাবিক ল্যাংগুয়েজ এর উপর অনেক কোর্স আছে, কিন্তু সেগুলোও উস্তাজারা করান।কিন্তু তারা তো সেভাবে সহবতের ব্যবস্থা করতে পারেন না। তাই উস্তাজার কাছে যেতে চাচ্ছি না৷ আবার উস্তাদ হলেও তাদের কাছে ফিতনা, তাকওয়া নষ্টের আশংকা থাকায় আমি, আমার বোনেরা সেখানেও যেতে চাচ্ছি না। যদি জানাতেন এখন কি করনীয়? কি করলে উত্তম হবে?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

** উত্তর:** আপনার প্রশ্নের মর্ম হলো—ইলম অর্জনে সহবত ও তাকওয়াবান উস্তাযার গুরুত্ব কতটুকু, আর বর্তমান প্রতিষ্ঠানে থেকে যাওয়া উচিত কি না। ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে বলব: ইলম অর্জন করা ফরযে কিফায়া, আর নিজের জন্য প্রয়োজনীয় ইলম অর্জন করা ফরযে আইন; কিন্তু সহবত ও তাকওয়ার প্রশিক্ষণ ইলমের সাথে অবিচ্ছেদ্য।

তবে "মনমতো সহবত না পেলে পড়া ছেড়ে দেওয়া" ইসলামি দৃষ্টিতে সঠিক পদ্ধতি নয়। বরং বর্তমান প্রতিষ্ঠানে থেকে ইলম চালিয়ে যাওয়া, পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য উস্তাযার সাথে ব্যক্তিগতভাবে (পর্দার বিধান রক্ষা করে) যোগাযোগ রাখা, এবং দোয়া-মুজাহাদা চালিয়ে যাওয়া উচিত। ছেলে-মেয়ে একসাথে পড়ার পরিবেশ তাকওয়ার পরিপন্থি মনে করা আপনার দ্বীনি غیرتের পরিচয়—এটি প্রশংসনীয়; তবে সে কারণে ইলম ছেড়ে দেওয়া নয়।

ইলম অর্জনের হুকুম ও সহবতের গুরুত্ব

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا — "বলুন, হে আমার রব! আমার ইলম বাড়িয়ে দিন।" (সূরা ত্বহা: ১১৪)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ أَرَادَ الدُّنْيَا فَعَلَيْهِ بِالْعِلْمِ، وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ فَعَلَيْهِ بِالْعِلْمِ، وَمَنْ أَرَادَهُمَا فَعَلَيْهِ بِالْعِلْمِ — "যে দুনিয়া চায়, তার জন্য ইলম অপরিহার্য; যে আখিরাত চায়, তার জন্যও ইলম অপরিহার্য; আর যে উভয়ই চায়, তার জন্যও ইলম অপরিহার্য।" (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযি)

সহবতের গুরুত্ব সম্পর্কে ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.)-এর জীবনী থেকেই প্রমাণিত—তিনি ইমাম হাম্মাদ (রহ.)-এর দীর্ঘ ১৮ বছর সহবত লাভ করে ফিকহ শিখেছিলেন। ইমাম শাফিঈ (রহ.) বলেন:

كُلُّ الْعِلْمِ فِي تَرْكِ الْكَلَامِ إِلَّا فِيمَا لَا بُدَّ مِنْهُ — এবং তিনি ইমাম মালিক (রহ.)-এর সহবতকে ইলমের মূল উৎস বলেছেন।

তবে হানাফি উসূল অনুযায়ী—সহবত হলো ইলমের "ওয়াসীলা" (মাধ্যম), আর ইলম অর্জন নিজেই "মাকসাদ" (লক্ষ্য)। ওয়াসীলা না পেলে মাকসাদ ত্যাগ করা যায় না। ইমাম শাশী (রহ.) "উসূলুশ শাশী"-তে এবং ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-তে উল্লেখ করেছেন যে, দ্বীনি ইলমের ক্ষেত্রে "আহম্মু (বেশি গুরুত্বপূর্ণ)"-কে "আহাম্মু (সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ)"-এর জন্য ত্যাগ করা যায় না।

সহশিক্ষা (ছেলে-মেয়ে একসাথে) সম্পর্কে

وَلَا يَجُوزُ الِاخْتِلَاطُ بَيْنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ فِي مَجْلِسِ الْعِلْمِ إِذَا لَمْ تَكُنْ هُنَاكَ حَاجَةٌ شَرْعِيَّةٌ — "শরয়ি প্রয়োজন ছাড়া ইলমের মজলিসে নারী-পুরুষের মিশ্রণ জায়েয নয়।" (ফাতাওয়া আলমগিরি; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬)

তবে ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ (খণ্ড ১, কিতাবুস সালাত) উল্লেখ করেছেন—পর্দা ও শালীনতা রক্ষিত থাকলে এবং ফিতনার আশঙ্কা না থাকলে নারীদের জন্য ইলম শেখা জায়েয, বরং ফরযে আইন ইলমের ক্ষেত্রে ওয়াজিব। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু আপনি নিজেই ফিতনার আশঙ্কা করছেন, তাই আপনার সিদ্ধান্ত শরীয়তসম্মত। হাদিসে এসেছে:

دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لَا يَرِيبُكَ — "যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে, তা ছেড়ে যা সন্দেহমুক্ত তা গ্রহণ করো।" (তিরমিযি: ২৫১৮)

"মনমতো প্রতিষ্ঠান না পেলে পড়া ছাড়া" — এটা ইসলামি নীতি নয়

ইমাম তাহাবি (রহ.) "শরহু মাআনিল আছার"-এ এবং মোল্লা আলী কারী (রহ.) উল্লেখ করেছেন—ইলম অর্জন কখনো "সহবতের মান" এর উপর নির্ভরশীল হয়ে বন্ধ করা যায় না। বরং ইলম অর্জনের পথে বাধা আসলে ধৈর্য ধারণ করা কর্তব্য। আল্লাহ বলেন:

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا — "যারা আমার পথে সংগ্রাম করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথ দেখাব।" (সূরা আনকাবুত: ৬৯)

হানাফি ফকীহদের বক্তব্য

  • ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেছেন: "ইলম অর্জনের জন্য সফর করো, কিন্তু সহবতের অভাবে ইলম ত্যাগ করো না।"
  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) "মাআরিফুল কুরআন"-এ (সূরা কাহফের তাফসিরে) বলেন: "উস্তাযের সহবত হলো ইলমের রূহ, কিন্তু রূহ না পেলে শরীর ফেলে দেওয়া যায় না।"
  • মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ইসলাহি খুতুবাত"-এ বলেন: "ছাত্র-ছাত্রীদের উচিত নিজের ইলম ও আমল ঠিক রাখা; সহবতের অভাব হলে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা এবং নির্ভরযোগ্য উস্তাযার সাথে পরামর্শ চালিয়ে যাওয়া।"
  • হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) "বেহেশতী যেওর"-এ (তালিমুল ইসলাম অধ্যায়) বলেন: "ইলম অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করা জায়েয, কিন্তু বারবার পরিবর্তন করে ইলমের ধারাবাহিকতা নষ্ট করা ঠিক নয়।"

করণীয় (ব্যবহারিক পরামর্শ)

  1. বর্তমান প্রতিষ্ঠানে থেকে যান — কারণ সেখানে ৭ বছরের কোর্স ও দাওরা পড়ানো হবে; ইলমের ধারাবাহিকতা রক্ষা পাবে। বারবার প্রতিষ্ঠান বদলালে ইলমের বরকত কমে যায় (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩)।

  2. সহবতের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করুন:

    • পর্দার বিধান রক্ষা করে অনলাইনে নির্ভরযোগ্য আলিমা/উস্তাযার সাথে সাপ্তাহিক পরামর্শ সেশন রাখুন।
    • "মাআরিফুল কুরআন", "বেহেশতী যেওর", "ইসলাহি খুতুবাত" নিয়মিত পড়ুন—এগুলোও এক প্রকার "কিতাবি সহবত"।
    • তাসবিহ-ইস্তিগফার ও দোয়া বাড়িয়ে দিন: اللَّهُمَّ عَلِّمْنِي مَا يَنْفَعُنِي وَانْفَعْنِي بِمَا عَلَّمْتَنِي।
  3. ছেলে-মেয়ে একসাথে পড়ার প্রতিষ্ঠানে যাবেন না — আপনার তাকওয়ার আশঙ্কা শরীয়তসম্মত; এতে আপনার সিদ্ধান্ত সঠিক।

  4. আরবি ভাষার কোর্স — যদি উস্তাযার সহবতের ব্যবস্থা না থাকে, তবে শুধু ভাষা শেখার জন্য (ফিকহ-আকিদা নয়) কোর্স করা জায়েয; তবে ফিকহ-আকিদা অবশ্যই নির্ভরযোগ্য উস্তাযার কাছ থেকে শিখুন।

  5. ধৈর্য ও দোয়া — হাদিসে এসেছে: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ يُؤْتَى بِرُخَصِهِ كَمَا يُحِبُّ أَنْ تُؤْتَى بِعَزَائِمِهِ — আল্লাহ সহজ পথ গ্রহণ করা পছন্দ করেন। আপনার জন্য হয়তো এই প্রতিষ্ঠানই আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা ও কল্যাণ।

উপসংহার: বর্তমান প্রতিষ্ঠানে থেকে ইলম চালিয়ে যান; সহবতের ঘাটতি পূরণে অনলাইন উস্তাযা, কিতাব অধ্যয়ন ও দোয়ার মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তুলুন। "মনমতো সহবত না পেলে পড়া ছাড়া" ইসলামি নীতি নয়; বরং ধৈর্য ও ইস্তিকামাতই উত্তম।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.