মিথ্যা বলে কারো কাছ থেকে টাকা নেওয়া ইসলামে হারাম ও প্রতারণা।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এখন আমার প্রশ্নটি হল। আমি যে তার থেকে ১৫০০ টাকা নিয়েছি তার জন্য আমার কি পাপ হবে। আমি কি সেই পুরুষের হক নষ্ট করেছি? এটার জন্য কি আমি আমার কাছে ঋণী থাকব? কারণ সেই পুরুষটি তো আমাকে খারাপ উদ্দেশ্যে এ টাকাটি দিয়েছিল, এবং আমি তাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য টাকাটা নিয়েছিলাম।
এখন এই ক্ষেত্রে আমার করনীয় কি?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের সারসংক্ষেপ হলো—আপনি একজন বিবাহিত পুরুষকে মিথ্যা বলে প্রতারিত করেছেন, তার কাছ থেকে ১৫০০ টাকা নিয়েছেন, তাকে অপমান করেছেন; এখন জানতে চাচ্ছেন এতে আপনার পাপ হবে কি না, তার হক নষ্ট হয়েছে কি না, এবং করণীয় কী।
প্রথমেই স্পষ্ট করে বলি: আপনি যে কাজটি করেছেন, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনোভাবেই বৈধ নয়। "শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্য" বা "সে খারাপ উদ্দেশ্যে টাকা দিয়েছিল" — এগুলো কোনো ওজর হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামে মন্দ কাজ প্রতিরোধের নামে নিজে মন্দ কাজ করা জায়েয নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ "প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।" (সহীহ বুখারী: ১০)
এখন মূল বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে:
১) মিথ্যা বলে টাকা নেওয়া = প্রতারণা ও হারাম উপার্জন। আপনি মিথ্যা পরিচয় দিয়ে, মিথ্যা ওয়াদা করে টাকা নিয়েছেন। এটা ইসলামে "গাসব" বা "খিয়ানত" হিসেবে গণ্য। মিথ্যা বলা কবিরা গুনাহ। রাসূল ﷺ বলেছেন:
وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ، فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَالْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ "মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকো; কারণ মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।" (সুনানে তিরমিযী: ১৯৭১)
২) তার হক নষ্ট হয়েছে কি না? হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবে নষ্ট হয়েছে। কারণ সে টাকাটি দিয়েছিল একটি নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে (যা আপনি কখনো পূরণ করেননি, বরং মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন)। সুতরাং টাকাটি তার কাছে ফেরত দেওয়া আপনার দ্বায়িত্ব। ইমাম ইবনে আবিদীন রহ. «رد المحتار»-এ মাল-ই-গাসব সম্পর্কে স্পষ্ট বলেছেন যে, গাসবকৃত মাল মালিককে ফেরত দেওয়া ওয়াজিব; ফেরত না দিলে কিয়ামত পর্যন্ত তা তার গলায় বোঝা হয়ে থাকবে।
৩) "সে খারাপ উদ্দেশ্যে টাকা দিয়েছিল" — এতে কি আমার দায়িত্ব কমে? না, কমে না। হ্যাঁ, সে যে ব্যভিচারের উদ্দেশ্যে টাকা দিয়েছিল, সেটি তার নিজের আলাদা গুনাহ—আল্লাহর কাছে তার হিসাব হবে। কিন্তু আপনি তো তার সাথে প্রতারণা করেছেন, মিথ্যা বলেছেন, টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার গুনাহ তার, আপনার গুনাহ আপনার। কেউ কারো গুনাহের বোঝা বহন করবে না (সূরা আনআম: ১৬৪)। তাছাড়া আপনি তো তাকে ব্যভিচার থেকে ফেরাননি—বরং মিথ্যা দিয়ে টাকা নিয়ে তাকে ঠকিয়েছেন। এটা "শিক্ষা" নয়, এটা প্রতারণা।
৪) অপমান করা: কাউকে অপমান করা, বিশেষত মিথ্যা প্রতারণার পর অপমান করা—এটি আরও বড় গুনাহ। রাসূল ﷺ বলেছেন:
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ "মুসলিম মুসলিমের ভাই; সে তার প্রতি জুলুম করবে না, তাকে লাঞ্ছিত করবে না, তাকে তুচ্ছ করবে না।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৬৪)
৫) এখন করণীয় কী?
- সর্বপ্রথম তাওবা করুন — আল্লাহর কাছে আন্তরিক তাওবা, ইস্তিগফার। মিথ্যা, প্রতারণা ও অপমানের জন্য ক্ষমা চান।
- ১৫০০ টাকা তার কাছে ফেরত দিন — এটাই সবচেয়ে জরুরি। যেহেতু সে আপনাকে ব্লক করেছে, তাই কোনো উপায়ে (তার পরিচিত কারো মাধ্যমে, বা নতুন নাম্বার থেকে যোগাযোগ করে, বা তার নাম-ঠিকানা জানা থাকলে সরাসরি) টাকাটি ফেরত পৌঁছে দিন। যদি সত্যিই কোনোভাবেই তাকে খুঁজে না পান বা পৌঁছাতে না পারেন, তাহলে সেই টাকা সদকা করে দিন তার পক্ষ থেকে, এবং আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন তিনি তাকে ক্ষমা করেন ও তার হক আদায় হয়ে যায়।
- তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করুন — অপমানের জন্য। সম্ভব না হলে অন্তত আল্লাহর কাছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
- ভবিষ্যতে এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন — কাউকে "শিক্ষা" দেওয়ার নামে প্রতারণা, মিথ্যা বা টাকা হাতিয়ে নেওয়া ইসলামে কখনো বৈধ নয়। মন্দ কাজের প্রতিবাদ হয় শরীয়তসম্মত উপায়ে (নসীহত, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো ইত্যাদি), প্রতারণা দিয়ে নয়।
সংক্ষেপে: হ্যাঁ, আপনার পাপ হয়েছে; হ্যাঁ, তার হক নষ্ট হয়েছে; এবং হ্যাঁ, আপনি তার কাছে ঋণী। টাকাটি ফেরত দেওয়া এবং আন্তরিক তাওবা করা আপনার কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমিন।