"আসতাগফিরুললাহ বলার আগে 'লা' বললে ঈমান ঠিক থাকবে কি? ইচ্ছাকৃত কুফরিসূচক কথা বললে ঈমান নষ্ট হয় কি ?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 8076
Questioner: Salahuddin Ahmed
Question Asked: 06 Nov 2026, 07:16 PM
Reviewed & Published: 06 Nov 2026, 09:04 PM
Views: 54
Tokens: 3,285
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসতাগফিরুললাহ বলার আগে যদি একজন লা বলেছেন তাহলে কি তার ঈমান ঠিক থাকবে? যদি একজন ইচ্ছে করে বলেছেন।

Answer

প্রশ্নের উত্তর

সংক্ষিপ্ত উত্তর: যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বা জেনে-শুনে "লা" (لا) বলে, অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার বিষয়ে অস্বীকার বা কুফরিসূচক কথা বলে, তাহলে তার ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে এবং তাওবা-ইস্তিগফার ছাড়া ঈমান ঠিক থাকবে না। আর যদি ভুলবশত, মুখ ফসকে বা অর্থ না বুঝে বলে ফেলে, তাহলে ঈমান নষ্ট হবে না।


বিস্তারিত আলোচনা

১. মূলনীতি: কুফর ও ঈমানের সীমারেখা

ঈমানের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহ তা'আলাকে এক ও অদ্বিতীয় মেনে নেওয়া এবং তাঁর রাসূল ﷺ-কে সর্বশেষ নবী হিসেবে স্বীকার করা। যে কথা বা কাজ সরাসরি আল্লাহ বা রাসূল সম্পর্কে অস্বীকার বা অবমাননা বোঝায়, তা কুফর। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

وَلَقَدْ قَالُوا كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ

"নিশ্চয়ই তারা কুফরের কথা বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর তারা কাফির হয়ে গেছে।" — (সূরা আত-তাওবা: ৭৪)

এই আয়াত প্রমাণ করে, মুখে কুফরিসূচক কথা উচ্চারণ করলে—যদি তা ইচ্ছাকৃত হয়—ঈমান নষ্ট হয়ে যায়।

২. "লা" বলার বিষয়টি

প্রশ্নে "লা" বলার অর্থ অস্পষ্ট। এখানে দুটি দিক বিবেচনা করতে হবে:

(ক) যদি "লা" দ্বারা আল্লাহ, রাসূল, ইসলাম বা কোনো অকাট্য দ্বীনি বিষয়কে অস্বীকার করা হয় — যেমন কেউ বলে "আল্লাহ নেই" (নাউযুবিল্লাহ), বা "রাসূল সত্য নন", বা "নামায ফরজ নয়" — তাহলে তা স্পষ্ট কুফর। ইচ্ছাকৃতভাবে বললে ঈমান নষ্ট হবে।

(খ) যদি "লা" কোনো সাধারণ পার্থিব বিষয়ে হয় — যেমন কাউকে কিছু দেওয়ার প্রসঙ্গে "লা" (না) বলা, বা কোনো জিনিসের অস্তিত্ব সম্পর্কে "না" বলা — তাহলে তা কুফর নয়, ঈমান অক্ষুণ্ণ থাকবে।

৩. ইচ্ছাকৃত বনাম ভুলবশত

  • ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরিসূচক কথা বলা: ঈমান নষ্ট হবে। তবে তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا

"বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।" — (সূরা আয-যুমার: ৫৩)

  • ভুলবশত বা মুখ ফসকে: রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন:

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ

"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং জোরপূর্বক করানো কাজ ক্ষমা করে দিয়েছেন।" — (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৩; সুনানে আবু দাউদ: ২১৯২)

তবে এখানে সতর্কতা: কুফরের ক্ষেত্রে "ভুলে যাওয়া" বা "ভুল করা"র ব্যাখ্যা অত্যন্ত সংকীর্ণ। কেবল তখনই ঈমান অক্ষুণ্ণ থাকবে যখন ব্যক্তি অর্থ না জেনে, জিহ্বা ফসকে বা একান্ত অসচেতনভাবে বলে ফেলে।

৪. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেন, কুফরিসূচক কথা ইচ্ছাকৃতভাবে বললে ঈমান যায়; আর তাওবা ও কালিমা পুনরায় পড়া wajib হয়ে যায়। তিনি লেখেন:

"কুফরের কথা বললে ঈমান বাতিল হয়ে যায়, তবে তাওবা করলে ফিরে আসে।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৪, কিতাবুল জিহাদ, মাসআলা: মুরতাদ)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কুফর থেকে ফিরে আসার জন্য তাওবা ও কালিমায়ে শাহাদাত পুনরায় পড়া আবশ্যক। (আল-হিদায়া, কিতাবুল জিহাদ)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:

"যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরের কথা বলে, তার ঈমান চলে যায়; তাওবা করলে ফিরে আসে।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ২, কিতাবুল জিহাদ)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) "মা'আরিফুল কুরআন"-এ সূরা তাওবার ৭৪ নং আয়াতের তাফসীরে বলেন, মুখে কুফর উচ্চারণ করা—যদি ইচ্ছাকৃত হয়—তাহলে তা ঈমান বিনষ্টকারী।

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানি"-তে উল্লেখ করেন, কুফরিসূচক কথা ইচ্ছাকৃতভাবে বললে ঈমান যায় এবং তাওবা ও শাহাদাত পুনরায় পড়া wajib।

৫. করণীয়

যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরিসূচক কথা বলে ফেলে:

  1. তাওবা করবে — আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে।
  2. কালিমায়ে শাহাদাত পুনরায় পড়বে — "আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু"।
  3. নামায-রোযা ইত্যাদি ইবাদত পুনরায় শুরু করবে (কিছু ফকীহের মতে, কুফরের পর পুনরায় ইসলামে ফিরলে পূর্বের ইবাদত বাতিল হয়ে যায়, তাই নতুন করে করতে হবে)।
  4. নিকাহ পুনরায় করতে হবে — যদি বিবাহিত হয় এবং কুফর থেকে ফিরে আসে, তবে হানাফি মতে নতুন করে নিকাহ করতে হবে (তাওবা ও শাহাদাতের পর)।

সতর্কতা

"লা" শব্দটি এককভাবে কুফর বা ঈমানের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। প্রশ্নে উল্লেখিত প্রেক্ষাপট স্পষ্ট নয়। যদি "লা" বলার দ্বারা আল্লাহ, রাসূল, কুরআন, ইসলাম বা অকাট্য দ্বীনি বিষয়কে অস্বীকার করা হয় এবং তা ইচ্ছাকৃত হয়—তাহলে ঈমান নষ্ট হবে। অন্যথায় সাধারণ পার্থিব "না" বলায় ঈমানের কোনো ক্ষতি নেই।

পরামর্শ: এ ধরনের সূক্ষ্ম মাসআলায় সরাসরি কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতির সাথে পরামর্শ করা উত্তম, কারণ প্রেক্ষাপট ও নিয়ত জানা ছাড়া চূড়ান্ত ফতোয়া দেওয়া কঠিন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.