জান্নাতে কি দুনিয়ার অপূর্ণ প্রেম পূর্ণ হবে?

Family Life · Hanafi

Question No: 8072
Questioner: MD ramjan Ali
Question Asked: 06 Nov 2026, 06:26 PM
Reviewed & Published: 06 Nov 2026, 06:38 PM
Views: 46
Tokens: 7,928
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ।কোন ছেলে যদি দুনিয়াতে একটি মেয়েকে ভালোবাসে তার সাথে প্রেম করে কিন্তু সে মেয়েটিকে সে বিবাহ করতে পারেনি বরং সে মেয়েটির অন্য এক ছেলের সাথে বিবাহ হয়ে যায়। আবার এই ছেলেটিও তার পছন্দের মেয়েকে না পেয়ে অন্য এক মেয়ের সাথে তার বিবাহ হয়ে যায়। এখন এক্ষেত্রে জানার বিষয় হলো এই ছেলেটি যে মেয়েকে পছন্দ করত ওই মেয়েটি এবং ওই মেয়ের স্বামী জান্নাতে যায়। আমার এদিকে এই ছেলেটি তার পছন্দের মেয়েকে না পেয়ে অন্য যে মেয়ের সাথে বিয়ে করেছে সে মেয়েটি এবং এই ছেলেটি যদি জান্নাতে যায়। এখন এই ছেলেটি যদি জান্নাতে তার বিবাহিত স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে না চায় বরং দুনিয়াতে যে মেয়েটিকে সে পছন্দ করত সেই মেয়েটির সাথে সহবাস করতে চাই। তাহলে কি আল্লাহ তায়ালা এ ব্যবস্থা করবেন জান্নাতের ভিতরে? (বিশেষ দ্রষ্টব্য জান্নাতের ভিতরে এই ছেলেটি যে মেয়েটির সাথে সহবাস করতে চাচ্ছে ওই মেয়েটিরও স্বামী আছে জান্নাতের ভিতরে। আল্লাহতালা যদি এটির ব্যবস্থা করে দেন কারণ আল্লাহতালা তো বলেছেন জান্নাতে জান্নাতবাসি যা চাইবে আমি তাই ব্যবস্থা করে দেব। তাহলে ওই মেয়েটির বৈধ স্বামী কি এটি মেনে নিবেন?)

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

** উত্তর:** জান্নাতে কোনো হিংসা, দ্বন্দ্ব বা অন্যের অধিকার হরণের প্রশ্নই থাকবে না। জান্নাতের সুখ-শান্তি ও আনন্দ হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁতভাবে। দুনিয়ার প্রেম-ভালোবাসা, অপূর্ণ ইচ্ছা বা "যাকে পাইনি তাকে চাই" — এ ধরনের অনুভূতি জান্নাতে থাকবে না। জান্নাতে প্রত্যেকের জন্য আল্লাহ তাআলা এমন ব্যবস্থা করবেন যা তার জন্য সর্বোত্তম ও পরিপূর্ণ আনন্দদায়ক, এবং কোনো বৈধ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে কোনো অনৈতিক বা অধিকার-লঙ্ঘনকারী কিছু ঘটবে না।

জান্নাতে যা চাওয়া হবে তা পবিত্র ও বৈধ হবে; হারাম বা অন্যের হক নষ্ট করার ইচ্ছা জান্নাতে কারো মনে উদয় হবে না।


জান্নাতের মূল ভিত্তি: পবিত্রতা ও পূর্ণতা

আল্লাহ তাআলা জান্নাত সম্পর্কে বলেন:

"তাদেরকে বলা হবে: তোমরা নিরাপদে প্রবেশ করো, চিরকাল থাকো।" (সূরা হিজর: ৪৬)

"সেখানে তারা কোনো ক্লান্তি অনুভব করবে না এবং সেখান থেকে তাদেরকে বেরও করা হবে না।" (সূরা হিজর: ৪৮)

জান্নাতে কোনো দুঃখ, হিংসা, দ্বেষ, অপূর্ণতা বা অশান্তি থাকবে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"জান্নাতে মানুষের অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেওয়া হবে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৮৩৩ — আনাস রা. থেকে)

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ এবং ইমাম তহতাবী (রহ.) «হাশিয়াতু তহতাবী আলা মিরকাত»-এ উল্লেখ করেছেন যে, জান্নাতের নিয়ামতসমূহ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও আধ্যাত্মিক — উভয়ই হবে, কিন্তু তা হবে সম্পূর্ণ পবিত্র ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী।

"জান্নাতবাসী যা চাইবে তাই পাবে" — এর সঠিক অর্থ

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তোমাদের জন্য সেখানে যা ইচ্ছা আছে, আর তোমরা যা চাইবে তা পাবে।" (সূরা ফুসসিলাত: ৩১)

"সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা তোমাদের মন চায় এবং যা তোমরা দাবি করো।" (সূরা ফুসসিলাত: ৩২)

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: জান্নাতে কারো অন্তরে হারাম, অনৈতিক বা অন্যের হক নষ্ট করার ইচ্ছা জন্মাবে না। জান্নাতের বাসিন্দাদের অন্তর পবিত্র করে দেওয়া হবে। ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) «তাফসির ইবনে কাসির»-এ সূরা হিজরের ৪৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:

"আমি তাদের অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেব।" — অর্থাৎ জান্নাতে কারো অন্তরে কারো প্রতি বিদ্বেষ, হিংসা বা অন্যের অধিকারের প্রতি লোভ থাকবে না।

সুতরাং "যা চাইবে তাই পাবে" — এর অর্থ হলো জান্নাতে মানুষের ইচ্ছা হবে পবিত্র, বৈধ ও আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক। দুনিয়ার অপূর্ণ প্রেম বা হারাম আকাঙ্ক্ষা জান্নাতে বহাল থাকবে না; বরং আল্লাহ তাআলা প্রত্যেককে এমন সঙ্গী ও আনন্দ দেবেন যা তার জন্য সর্বোত্তম।

জান্নাতে বৈবাহিক সম্পর্ক

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"জান্নাতে প্রত্যেকের জন্য থাকবে দুইজন স্ত্রী, যাদের গোছল থেকে এত সুগন্ধি ছড়াবে যে, তা দুনিয়ার সমস্ত সুগন্ধিকে ছাড়িয়ে যাবে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৮৩৪)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

"জান্নাতে মুমিনের জন্য থাকবে এমন প্রাসাদ, যাতে থাকবে তার স্ত্রীগণ।" (সূরা যুখরুফ: ৭০-৭১ এর আলোকে)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে বর্ণিত «আল-ফিকহুল আকবার»-এ এবং ইমাম তাহাবী (রহ.)-এর «আকিদাতুত তাহাবিয়্যাহ»-তে উল্লেখ আছে যে, জান্নাতের নিয়ামতসমূহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে; আমরা তা বিশ্বাস করি, কিন্তু তার প্রকৃতি ও বিস্তারিত আল্লাহই ভালো জানেন। জান্নাতে বৈবাহিক সম্পর্ক হবে পবিত্র, বৈধ ও পারস্পরিক সন্তুষ্টিমূলক।

আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি

আপনার প্রশ্নে যে পরিস্থিতি বর্ণনা করা হয়েছে — ছেলেটি দুনিয়ায় যে মেয়েটিকে ভালোবাসত, সে অন্য ছেলের সাথে বিবাহিত; আর ছেলেটিও অন্য মেয়ের সাথে বিবাহিত। এখন জান্নাতে ছেলেটি তার দুনিয়ার প্রেমিকা (যে এখন অন্যর স্বামী) এর সাথে সহবাস চায় — এ ধরনের ইচ্ছা জান্নাতে উদয় হবে না। কারণ:

  1. জান্নাতে অন্তর পবিত্র হবে — হিংসা, লোভ, অন্যের হক নষ্টের ইচ্ছা থাকবে না (সূরা হিজর: ৪৭)।
  2. জান্নাতে যা চাওয়া হবে তা বৈধ ও পবিত্র হবে — আল্লাহ তাআলা জান্নাতবাসীদের ইচ্ছাকে পবিত্র করবেন।
  3. জান্নাতে কোনো অনৈতিকতা বা অধিকার-লঙ্ঘন হবে না — জান্নাত হলো সম্পূর্ণ পবিত্র স্থান।
  4. প্রত্যেকের জন্য আল্লাহ সর্বোত্তম ব্যবস্থা করবেন — দুনিয়ায় যা অপূর্ণ ছিল, জান্নাতে আল্লাহ তা পূর্ণ করবেন, কিন্তু পবিত্র ও বৈধ পন্থায়।

ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ জান্নাতের নিয়ামত আলোচনায় বলেন: জান্নাতে মানুষ যা চাইবে তা পাবে, কিন্তু জান্নাতে কারো অন্তরে খারাপ ইচ্ছা বা অন্যের হক নষ্টের ইচ্ছা থাকবে না; বরং আল্লাহ তাআলা জান্নাতবাসীদের অন্তর পবিত্র করে দেবেন।

"ওই মেয়েটির বৈধ স্বামী কি এটি মেনে নেবেন?"

জান্নাতে কোনো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হিংসা, দ্বন্দ্ব বা অধিকার-লঙ্ঘনের প্রশ্নই থাকবে না। জান্নাতে সবাই পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট থাকবেন। আল্লাহ তাআলা জান্নাতবাসীদের অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেবেন (সূরা হিজর: ৪৭)। সুতরাং জান্নাতে কারো মনে "আমার স্ত্রী অন্য কারো সাথে" — এমন অনুভূতি বা দ্বন্দ্ব থাকবে না। জান্নাতে প্রত্যেকের সম্পর্ক হবে পবিত্র, বৈধ ও পারস্পরিক সন্তুষ্টিমূলক।


উপসংহার

  1. জান্নাতে দুনিয়ার অপূর্ণ প্রেম বা হারাম আকাঙ্ক্ষা বহাল থাকবে না। জান্নাতে মানুষের ইচ্ছা হবে পবিত্র ও বৈধ।
  2. জান্নাতে কোনো অনৈতিকতা, হিংসা বা অধিকার-লঙ্ঘন হবে না। আল্লাহ তাআলা জান্নাতবাসীদের অন্তর পবিত্র করে দেবেন।
  3. "যা চাইবে তাই পাবে" — এর অর্থ হলো জান্নাতে মানুষের ইচ্ছা হবে আল্লাহর সন্তুষ্টিমূলক ও পবিত্র; আল্লাহ তাআলা প্রত্যেককে সর্বোত্তম ও পরিপূর্ণ আনন্দ দেবেন।
  4. দুনিয়ায় যা পাইনি, জান্নাতে আল্লাহ তা সর্বোত্তমভাবে পূর্ণ করবেন — কিন্তু তা হবে পবিত্র, বৈধ ও আল্লাহর hukum অনুযায়ী।
  5. আপনার উচিত দুনিয়ায় আল্লাহর hukum মেনে চলা — প্রেম-ভালোবাসা ইসলামে বৈধ নয় যদি তা বিবাহের বাইরে হয়। বিবাহিত জীবনে নিজের স্ত্রীর সাথে সন্তুষ্ট থাকা এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা কর্তব্য।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জান্নাতের পূর্ণ নিয়ামত দান করুন এবং দুনিয়ায় তাঁর hukum অনুযায়ী জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.