শিরকী গান মনে মনে চললে বা মুখে উচ্চারণ করলে ঈমানে কোনো সমস্যা হয় কি?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 8066
Questioner: Rajia Suntana
Question Asked: 06 Nov 2026, 03:06 PM
Reviewed & Published: 06 Nov 2026, 03:28 PM
Views: 67
Tokens: 5,774
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১)ফেসবুকে ঢুকলেই খালি পুজার গান চলতো কয়দিন আগে। সেই গান মাথায় থেকে গেছে। এখন এই গান মনে মনে চলে আসলে কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
২) আমি ভাত খাচ্ছিলাম। খাওয়ার সময় এই গান মনে মনে চলে আসছে। আমার মুখ খোলা ছিল। এখন কি মুখেই উচ্চারণ করে ফেললাম কিনা। তাই আমি জোরে জোরে নিশাস নিয়ে আবার এই শিরকী গান এর লাইন মনে মনে মানে খাওয়ার সাথে বলে বলে চেক করি মুখ হা করে। সাউন্ড হয় কিনা। কিন্তু আমি শুরু নিশ্বাস এর সাউন্ড ই শুনি। এখন এভাবে শিরকি গানের লাইন চেক করার কারনে কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
৩) শিরকী গানের লাইন বিশ্বাস করে না, তাও যদি কেউ উচ্চারণ করে শিরকি গান গেয়ে ফেলে তাহলে কি তার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

Answer

উত্তর

ভূমিকা

প্রশ্নটি তিনটি অংশে বিভক্ত। প্রতিটি অংশের উত্তর নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো। মূলনীতি হিসেবে মনে রাখতে হবে: ঈমান হলো অন্তরের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতি। কোনো কথা বা কাজ কুফর বা শিরক হয় তখনই, যখন তা অন্তরের বিশ্বাস ও স্বীকৃতি থেকে উৎসারিত হয়, অথবা এমন কথা/কাজ হয় যা নিজেই কুফর-শিরকের স্পষ্ট ঘোষণা। শুধু মনের মধ্যে কোনো চিন্তা বা কল্পনা আসা—যা অনিচ্ছাকৃত—তা ঈমানের কোনো ক্ষতি করে না।


১) মনে মনে শিরকী গান চলা কি ঈমানে সমস্যা?

উত্তর: না, ঈমানে কোনো সমস্যা হবে না।

কারণ, ঈমানের মূল কেন্দ্র হলো অন্তরের বিশ্বাস (ইতিকাদ)। মনের মধ্যে কোনো চিন্তা বা স্মৃতি অনিচ্ছাকৃতভাবে ভেসে আসা—এটি ইচ্ছাকৃত বিশ্বাস বা স্বীকৃতি নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

لَا يُكَلِّفُ اللّٰهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
"আল্লাহ কোনো প্রাণকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ اللّٰهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا وَسْوَسَتْ بِهِ صُدُورُهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ بِهِ أَوْ تَكَلَّمْ بِهِ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরে যে ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) আসে তা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা আমলে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে।"
— সহীহ বুখারী: ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম: ১২৭

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন যে, অন্তরে কুফরী খেয়াল আসলে ঈমান যায় না, যতক্ষণ না সে তা নিয়ে সন্তুষ্ট হয় বা মুখে উচ্চারণ করে। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৩-২২৪, দারুল ফিকর)

সারকথা: মাথায় গান ঘুরছে—এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা বা স্মৃতির প্রভাব। এটি ঈমানের ক্ষতি করে না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে সেই গান গাইলে বা তাতে আনন্দ নিলে ভিন্ন কথা।


২) মুখে উচ্চারণ হয়েছে কিনা চেক করার জন্য শিরকী গানের লাইন মনে মনে বলা—এতে ঈমানের সমস্যা হবে কি?

উত্তর: না, ঈমানের কোনো সমস্যা হবে না। তবে এই ধরনের চেক করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

কারণ:

  • আপনি গানটি বিশ্বাস থেকে বলেননি, বরং পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে মনে মনে বলেছেন।
  • মুখে উচ্চারণ হয়েছে কিনা তা যাচাই করতে গিয়ে আপনি শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ শুনেছেন—অর্থাৎ গানের শব্দ বের হয়নি।
  • মুখে উচ্চারণ তখনই ধর্তব্য, যখন শব্দ বের হয় ও তা শ্রবণযোগ্য হয়। শুধু ঠোঁট নড়া বা মনে মনে বলা—এটি উচ্চারণ নয়।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, কুফরী কালাম মুখে উচ্চারণ করলে কুফর হয়, কিন্তু শুধু মনে মনে কল্পনা করলে নয়। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৩)

তবে সতর্কতা: এভাবে বারবার শিরকী গানের লাইন মনে মনে বলা বা চেক করা ওয়াসওয়াসার (শয়তানের কুমন্ত্রণার) লক্ষণ। এতে আপনি অযথা দুশ্চিন্তায় পড়বেন। রাসূল ﷺ ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে শিখিয়েছেন এবং তা উপেক্ষা করতে বলেছেন। (সহীহ মুসলিম: ১৩৪)

পরামর্শ: এই ধরনের চেক করা বন্ধ করুন। মনে গান এলে "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়ুন এবং অন্য কোনো ভালো কাজ বা যিকিরে মনোযোগ দিন।


৩) শিরকী গানের লাইন বিশ্বাস না করে উচ্চারণ করলে কি ঈমানে সমস্যা হবে?

উত্তর: এতে বিস্তারিত تفصيل রয়েছে।

(ক) যদি কেউ শিরকী গান বিশ্বাস না করে, শুধু গান হিসেবে গায় বা মুখে উচ্চারণ করে:

ফুকাহায়ে কেরামের স্পষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী— শিরকী কালাম উচ্চারণ করা নিজেই গুনাহে কবীরা এবং কুফরের কাছাকাছি। তবে ঈমান যায় কি যায়—এতে تفصيل আছে:

  • ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: কেউ যদি কুফরী কালাম মুখে উচ্চারণ করে কিন্তু অন্তরে তা বিশ্বাস না করে, তবে সে কাফির হয় না, তবে গুনাহগার হয় এবং তাওবা করা তার উপর ওয়াজিব। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৩-২২৪)

  • ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে: কুফরী কালাম ইচ্ছাকৃতভাবে উচ্চারণ করা কুফর নয় যদি না তা বিশ্বাস করে; তবে তা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। (ফাতাওয়া আলমগিরি: ২/২৫৮)

  • ইমাম তহাবী (রহ.) আকিদাতুত তহাবিয়্যাহ-তে বলেন: ঈমান হলো মুখের স্বীকৃতি ও অন্তরের বিশ্বাস। শুধু মুখের কথা—যা অন্তরের বিশ্বাসের বিপরীত—তা ঈমান নয়।

(খ) তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:

শিরকী গান শোনা, গাওয়া বা তাতে আনন্দ নেওয়া—সবই হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ
"যখন তারা বাজে কথা শোনে, তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।" (সূরা কাসাস: ৫৫)

وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ
"এবং যারা মিথ্যা (বাজে) কাজে উপস্থিত থাকে না।" (সূরা ফুরকান: ৭২)

রাসূল ﷺ বলেছেন:

لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ
"আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।" (সহীহ বুখারী: ৫৫৯০)

(গ) মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর বক্তব্য:

ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে: শিরকী বা কুফরী কালাম—তা গান হোক বা কবিতা—তা উচ্চারণ করা, শোনা বা গাওয়া জায়েয নয়। যদি কেউ বিশ্বাস না করে শুধু গায়, তবে সে কাফির হবে না, কিন্তু গুরুতর গুনাহগার হবে এবং তাওবা করতে হবে। (ফাতাওয়া উসমানি: ১/২৩৫-২৩৬)

(ঘ) মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর বক্তব্য:

মা'আরিফুল কুরআন-এ সূরা ফুরকান ৭২ নং আয়াতের তাফসীরে তিনি বলেন: "যুর" (মিথ্যা/বাজে কথা) বলতে শিরকী কালাম, অশ্লীল গান-বাজনা সবই অন্তর্ভুক্ত। মুসলমানের উচিত এসব থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। (মা'আরিফুল কুরআন: ৬/৪৩৫)


সারসংক্ষেপ ও করণীয়

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১) মনে মনে গান চলা | ঈমানে সমস্যা নেই—এটি ওয়াসওয়াসা/স্মৃতি | | ২) চেক করার জন্য মনে মনে বলা | ঈমানে সমস্যা নেই, তবে এ ধরনের চেক বন্ধ করুন | | ৩) বিশ্বাস না করে উচ্চারণ | কাফির হবে না, তবে গুরুতর গুনাহগার—তাওবা ওয়াজিব |

করণীয়:

  1. তাওবা করুন—যদি কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে শিরকী গান গেয়ে থাকেন।
  2. ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করুন—মনে গান এলে "আউযুবিল্লাহ" পড়ুন, যিকিরে মনোযোগ দিন।
  3. ফেসবুক/সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শিরকী কন্টেন্ট এড়িয়ে চলুন।
  4. দুশ্চিন্তা করবেন না—আপনার ঈমান নিরাপদ, ইনশাআল্লাহ। শয়তান আপনাকে সন্দেহে ফেলতে চায়।

وَاللّٰهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.