মনে মনে শিরকি গান গাইলে কি ঈমানের কোনো সমস্যা হবে?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 8065
Questioner: khusbo KH
Question Asked: 06 Nov 2026, 02:51 PM
Reviewed & Published: 06 Nov 2026, 03:26 PM
Views: 43
Tokens: 4,982
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১)ফেসবুকে ঢুকলেই খালি পুজার গান চলতো কয়দিন আগে। সেই গান মাথায় থেকে গেছে। এখন এই গান মনে মনে চলে আসলে কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
২) আমি ভাত খাচ্ছিলাম। খাওয়ার সময় এই গান মনে মনে চলে আসছে। আমার মুখ খোলা ছিল। এখন কি মুখেই উচ্চারণ করে ফেললাম কিনা। তাই আমি জোরে জোরে নিশাস নিয়ে আবার এই শিরকী গান এর লাইন বলে বলে চেক করি মুখ হা করে। সাউন্ড হয় কিনা। কিন্তু আমি শুরু নিশ্বাস এর সাউন্ড ই শুনি। এখন এভাবে শিরকি গানের লাইন চেক করার কারনে কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
৩) শিরকী গানের লাইন বিশ্বাস করে না, তাও যদি কেউ উচ্চারণ করে শিরকি গান গেয়ে ফেলে তাহলে কি তার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রশ্নের তিনটি অংশের বিস্তারিত উত্তর নিচে দেওয়া হলো। প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি জেনে নিন:

মূলনীতি: ঈমান ভঙ্গ হয় কুফর বা শিরকের বিশ্বাস পোষণ করলে, কিংবা কুফরি/শিরকি কালামকে সম্মান বা স্বীকার করে বলা বা লেখার মাধ্যমে। শুধু মনের ভেতর কোনো চিন্তা বা স্মৃতি আসা—যা ইচ্ছাকৃত নয়—তা ঈমানের কোনো ক্ষতি করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: «لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا» (সূরা বাকারা: ২৮৬)। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: «إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ» (বুখারি: ৫২৬৯; মুসলিম: ১২৭) — "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের ওয়াসওয়াসা (কুচিন্তা) ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ না সে তা আমলে পরিণত করে বা মুখে বলে।"


১) মনে মনে শিরকি গান চলে আসলে ঈমানে সমস্যা হবে কি?

উত্তর: না, ঈমানে কোনো সমস্যা হবে না। মাথায় গান ঘুরপাক খাওয়া বা মনে মনে চলে আসা—এটি ইচ্ছাকৃত নয়, বরং শয়তানের ওয়াসওয়াসা বা স্মৃতির প্রভাব। যতক্ষণ আপনি সেই শিরকি কথাকে বিশ্বাস না করেন, সম্মান না করেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মুখে না বলেন, ততক্ষণ ঈমান অক্ষত থাকে।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ ওয়াসওয়াসা প্রসঙ্গে বলেন, অন্তরে আগত কুচিন্তা যার প্রতি বান্দা অসন্তুষ্ট ও ঘৃণা করে, তা ঈমানের ক্ষতি করে না; বরং তা ঈমানের দৃঢ়তার প্রমাণ। (রাদ্দুল মুহতার: ১/৪৩০ প্রসঙ্গে; দেখুন: ফাতাওয়া উসমানি: ১/১৭৭)

তবে করণীয় হলো: গানটি মনে আসলে সাথে সাথে আল্লাহর নাম স্মরণ করা, «أعوذ بالله من الشيطان الرجيم» পড়া এবং অন্য কোনো ভালো কাজ বা যিকিরে মন ব্যস্ত রাখা।


২) মুখ খোলা ছিল—উচ্চারণ হয়ে গেল কিনা চেক করতে গিয়ে শিরকি গানের লাইন বলা

উত্তর: এখানে দুটি দিক লক্ষণীয়:

(ক) প্রথমত, আপনি নিশ্চিত নন যে খাওয়ার সময় মুখে উচ্চারণ হয়েছিল কিনা। সন্দেহের কারণে কিছুই প্রমাণিত হয় না। ইসলামের মূলনীতি হলো: «الْيَقِينُ لَا يَزُولُ بِالشَّكِّ» — নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না। (আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর; রাদ্দুল মুহতার: ১/১৮৭) সুতরাং শুধু সন্দেহে ঈমানের কোনো ক্ষতি হয়নি।

(খ) কিন্তু দ্বিতীয় যে কাজটি আপনি করেছেন—অর্থাৎ শিরকি গানের লাইন ইচ্ছাকৃতভাবে মুখে উচ্চারণ করে "চেক" করা—এটি ভুল ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি ছিল। কারণ শিরকি কালাম ইচ্ছাকৃতভাবে উচ্চারণ করা ঈমানের জন্য বিপজ্জনক। তবে যেহেতু আপনি তা বিশ্বাস করে বলেননি, বরং পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে এবং অন্তরে ঘৃণা নিয়ে বলেছিলেন, তাই ফুকাহায়ে কেরামের ভাষ্য অনুযায়ী এতে কুফর হয়নি; কেননা কুফরির শর্ত হলো ইচ্ছাকৃতভাবে ও বিশ্বাস/সম্মানসহ বলা। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: «لَا كُفْرَ بِمُجَرَّدِ اللَّفْظِ بِلَا اعْتِقَادٍ» — শুধু শব্দ উচ্চারণে বিশ্বাস ছাড়া কুফর হয় না। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৪; ফাতাওয়া আলমগিরি: ২/২৭৬)

তবে ভবিষ্যতে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। এটি শয়তানের ধোঁকা। মুখে উচ্চারণ হয়েছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ হলে শুধু «أعوذ بالله» পড়ুন এবং কালিমা পড়ে নিন; শিরকি কালাম পুনরায় উচ্চারণ করে যাচাই করা কখনোই উচিত নয়।


৩) বিশ্বাস না করে শিরকি গান গেয়ে ফেললে ঈমানে সমস্যা হবে কি?

উত্তর: এখানে تفصيل (বিস্তারিত) রয়েছে:

  • যদি বিশ্বাস না করে, ঘৃণা ও অসন্তুষ্টি নিয়ে, ভুলবশত বা পরীক্ষার উদ্দেশ্যে উচ্চারণ করে — তাহলে ফুকাহায়ে কেরামের রাহিমাহুমুল্লাহ-এর বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী কুফর হবে না, ঈমান অক্ষত থাকবে। কারণ কুফরের শর্ত হলো ইচ্ছাকৃতভাবে ও বিশ্বাস/সম্মানসহ বলা। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৪; ফাতাওয়া উসমানি: ১/১৭৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩৭৫)

  • তবে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে, জেনে-শুনে, বিনোদন বা আনন্দের উদ্দেশ্যে শিরকি গান গায় — তাহলে তা মারাত্মক গুনাহ এবং ঈমানের জন্য বিপজ্জনক। কারণ শিরকি কালামকে বিনোদনের উপকরণ বানানো কুফরি কালামকে সম্মান করার শামিল হতে পারে। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) ও মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সতর্ক করেছেন যে, কুফরি কালাম ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার বলা ও তাতে আনন্দ নেওয়া ঈমানের জন্য ভয়ংকর। (রাদ্দুল মুহতার: ৪/২২৪; মাআরিফুল কুরআন: ২/৩৫০ প্রসঙ্গে)

সুতরাং সর্বোত্তম পথ হলো: শিরকি গান শোনা, গাওয়া ও স্মরণ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা; মনে আসলে সাথে সাথে আল্লাহর যিকিরে মন ফিরিয়ে নেওয়া এবং তাওবা-ইস্তিগফার করা।


সারসংক্ষেপ ও করণীয়

| বিষয় | হুকুম | |---|---| | মনে মনে গান আসা (ইচ্ছাকৃত নয়) | ঈমানের ক্ষতি নেই | | সন্দেহে মুখে উচ্চারণ হয়েছে কিনা | সন্দেহে কিছু প্রমাণিত হয় না; ক্ষতি নেই | | পরীক্ষার উদ্দেশ্যে শিরকি লাইন বলা (বিশ্বাস ছাড়া) | কুফর হয়নি, তবে ভবিষ্যতে বিরত থাকুন | | বিশ্বাস না করে ভুলবশত উচ্চারণ | ঈমান অক্ষত | | ইচ্ছাকৃতভাবে বিনোদনের জন্য শিরকি গান গাওয়া | মারাত্মক গুনাহ, ঈমানের জন্য বিপজ্জনক—তাওবা জরুরি |

পরামর্শ: ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে নিয়মিত «أعوذ بالله من الشيطان الرجيم» ও কালিমা তাইয়্যিবা পড়ুন, ফেসবুক/সোশ্যাল মিডিয়ায় অপ্রয়োজনীয় ভিডিও এড়িয়ে চলুন, এবং সন্দেহ হলে শিরকি কালাম পুনরায় উচ্চারণ করে যাচাই করবেন না—বরং তাওবা ও ইস্তিগফার করুন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শয়তানের ধোঁকা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.