জান্নাতে দুনিয়াবী স্ত্রী ও হুর একসাথে থাকবে কি
Family Life · Hanafi
Question
Answer
জান্নাতে হুরদের সাথে সহবাসের বিধান ও দুনিয়াবী স্ত্রীর অবস্থা
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নটি দুটি দিক নিয়ে: ১. জান্নাতে পুরুষদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত হুরদের সাথে সহবাসের বিধান কী? ২. একই পুরুষের জন্য দুনিয়াবী স্ত্রী ও হুরেরা একসাথে থাকলে দুনিয়াবী স্ত্রীরা কি বিরক্ত বোধ করবে না?
প্রথম অংশ: জান্নাতে হুরদের সাথে সহবাসের বিধান
কুরআনের দলিল
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَحُورٌ عِينٌ • كَأَمْثَالِ اللُّؤْلُؤِ الْمَكْنُونِ "আর থাকবে আয়তলোচনা হুর, আবরণে রক্ষিত মুক্তার ন্যায়।" — (সূরা ওয়াকিয়া: ২২-২৩)
إِنَّا أَنشَأْنَاهُنَّ إِنشَاءً • فَجَعَلْنَاهُنَّ أَبْكَارًا • عُرُبًا أَتْرَابًا "নিশ্চয়ই আমি তাদের (হুরদের) বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তাদেরকে করেছি কুমারী, স্বামী-প্রেমিকা, সমবয়সী।" — (সূরা ওয়াকিয়া: ৩৫-৩৭)
وَلَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُّطَهَّرَةٌ "এবং সেখানে তাদের জন্য থাকবে পবিত্র স্ত্রীগণ।" — (সূরা বাকারা: ২৫)
হাদিসের দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
لِكُلِّ رَجُلٍ مِنْهُمْ زَوْجَتَانِ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ، عَلَى كُلِّ وَاحِدَةٍ سَبْعُونَ حُلَّةً "জান্নাতের প্রত্যেক পুরুষের জন্য থাকবে দুইজন হুর স্ত্রী, প্রত্যেকের পরনে থাকবে সত্তরটি করে পোশাক।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৮৩৩; তিরমিজি, হাদিস নং ২৫৬২)
ফিকহী বিধান (হানাফী মাযহাব)
জান্নাতে হুরদের সাথে সহবাস করা সম্পর্কে ফিকহী বিধান হলো:
১. জান্নাত দারুল জাযা (প্রতিদানের ঘর), দারুল আমল (কর্মের ঘর) নয়। সেখানে শরীয়তের তাকলিফ (দায়িত্ব) নেই। জান্নাতে যা কিছু হবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার ও অনুগ্রহ।
২. জান্নাতে সহবাস হালাল ও বৈধ। ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন যে জান্নাতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দুনিয়ার তুলনায় ভিন্ন প্রকৃতির, তবে তা শরীয়তবিরোধী নয়। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৪৩০-এর প্রসঙ্গ)
৩. জান্নাতে কোনো হারাম নেই, কোনো নিষিদ্ধ কিছু নেই। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَفِيهَا مَا تَشْتَهِيهِ الْأَنفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ "সেখানে থাকবে তা-ই যা আত্মা কামনা করে এবং চোখ যা দেখে তৃপ্ত হয়।" — (সূরা যুখরুফ: ৭১)
৪. হুরদের সাথে সহবাস জান্নাতের বৈধ আনন্দের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম তহাবী (রহ.) «শারহু মা'আনিল আছার»-এ এবং ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর অনুসারী ফুকাহায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত যে জান্নাতের আনন্দসমূহ শরীয়তসম্মত ও পবিত্র।
৫. জান্নাতে সহবাসের প্রকৃতি দুনিয়ার মতো নয়। হাদিসে এসেছে, জান্নাতবাসীরা দুনিয়ার মতো কোনো ক্লান্তি বা অশ্লীলতা অনুভব করবে না। রাসূল ﷺ বলেন:
إِنَّ أَهْلَ الْجَنَّةِ يَأْكُلُونَ وَيَشْرَبُونَ وَلَا يَتَغَوَّطُونَ وَلَا يَبُولُونَ وَلَا يَمْتَخِطُونَ وَلَا يَبْزُقُونَ... وَلَكِنْ يَتَنَفَّسُونَ وَيَتَمَنَّوْنَ "জান্নাতবাসীরা খাবে, পান করবে, কিন্তু পায়খানা-প্রস্রাব করবে না, নাক-থুথু ফেলবে না... বরং তারা নিঃশ্বাস নেবে এবং যা চাইবে তা-ই পাবে।" — (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৮৩৫)
দ্বিতীয় অংশ: দুনিয়াবী স্ত্রী ও হুরেরা একসাথে থাকলে দুনিয়াবী স্ত্রীরা কি বিরক্ত হবে?
মূল নীতি: জান্নাতে কোনো নেতিবাচক অনুভূতি থাকবে না
আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের বর্ণনায় বলেন:
لَا يَمَسُّهُمْ فِيهَا نَصَبٌ وَمَا هُم مِّنْهَا بِمُخْرَجِينَ "সেখানে তাদের কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করবে না এবং তারা সেখান থেকে বেরও হবে না।" — (সূরা হিজর: ৪৮)
لَا لَغْوٌ فِيهَا وَلَا تَأْثِيمٌ "সেখানে কোনো অসার কথা নেই, কোনো পাপ নেই।" — (সূরা তুর: ২৩)
وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِم مِّنْ غِلٍّ "আমি তাদের অন্তর থেকে সমস্ত হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেব।" — (সূরা আরাফ: ৪৩; সূরা হিজর: ৪৭)
ফিকহী ও আকীদাগত ব্যাখ্যা
১. জান্নাতে হিংসা, ঈর্ষা, বিরক্তি, দুঃখ — এসবের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। আল্লাহ তা'আলা স্পষ্টভাবে বলেছেন তিনি জান্নাতবাসীদের অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে দেবেন। (সূরা আরাফ: ৪৩)
২. ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) «তাফসিরে ইবনে কাসির»-এ উল্লেখ করেন: জান্নাতে দুনিয়ার সমস্ত নেতিবাচক অনুভূতি (হিংসা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা) থাকবে না; জান্নাতবাসীরা পরস্পর ভাইয়ের মতো থাকবে।
৩. মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মা'আরিফুল কুরআন»-এ সূরা ওয়াকিয়ার তাফসিরে লেখেন: জান্নাতের হুরগণ দুনিয়াবী স্ত্রীদের প্রতি ঈর্ষা করবে না, আর দুনিয়াবী স্ত্রীরাও হুরদের প্রতি বিরক্ত হবে না; কারণ জান্নাতের প্রকৃতি সম্পূর্ণ পবিত্র ও নেতিবাচক অনুভূতিমুক্ত।
সারসংক্ষেপ ও ফতোয়া
প্রথম প্রশ্নের উত্তর: জান্নাতে হুরদের সাথে সহবাস করা সম্পূর্ণ বৈধ ও হালাল। এটি জান্নাতের আল্লাহ প্রদত্ত পুরস্কারের অন্তর্ভুক্ত। জান্নাতে কোনো তাকলিফ (শরীয়তের দায়িত্ব) নেই, বরং যা কিছু হবে তা আল্লাহর অনুগ্রহ। কুরআন ও হাদিসে হুরদের সাথে জান্নাতবাসীর সম্পর্কের সুস্পষ্ট বর্ণনা এসেছে।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর: জান্নাতে দুনিয়াবী স্ত্রী ও হুরেরা একসাথে থাকলে দুনিয়াবী স্ত্রীরা কখনোই বিরক্ত বা ঈর্ষান্বিত হবে না। কারণ:
- আল্লাহ তা'আলা জান্নাতবাসীদের অন্তর থেকে হিংসা-বিদ্বেষ সম্পূর্ণ দূর করে দেবেন (সূরা আরাফ: ৪৩)।
- জান্নাতে কোনো নেতিবাচক অনুভূতি, দুঃখ, ক্লান্তি বা বিরক্তি থাকবে না (সূরা হিজর: ৪৮)।
- জান্নাতের প্রকৃতি সম্পূর্ণ পবিত্র ও কলুষমুক্ত।
- দুনিয়াবী মুমিন স্ত্রী জান্নাতে হুরদের চেয়ে মর্যাদায় উত্তম হবেন।
সুতরাং জান্নাতে দুনিয়াবী স্ত্রীরা হুরদের প্রতি বিরক্ত হবে না — এটি কুরআন-হাদিসের সুস্পষ্ট ঘোষণা।
তথ্যসূত্র
- সূরা বাকারা: ২৫; সূরা আরাফ: ৪৩; সূরা হিজর: ৪৭-৪৮; সূরা তুর: ২৩; সূরা ওয়াকিয়া: ২২-২৩, ৩৫-৩৭; সূরা যুখরুফ: ৭১
- সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৮৩৩, ২৮৩৫
- তিরমিজি, হাদিস নং ২৫৬২
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ৬
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী), সূরা ওয়াকিয়ার তাফসির
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী), জান্নাতের বর্ণনা অধ্যায়
- তাফসিরে ইবনে কাসির, সূরা আরাফ: ৪৩-এর তাফসির
- আল-আকীদা আত-তহাবিয়্যাহ (ইমাম তহাবী)
- শারহু মা'আনিল আছার (ইমাম তহাবী)