অটোমেটিক কুরআন তিলাওয়াত উপকারী কি
Family Life · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: পরিবারে ধারাবাহিক সমস্যা, অসুস্থতা ও সম্ভাব্য কালো জাদুর আশঙ্কা; রুকাইয়া সার্ভিস, রুকাইয়ার পদ্ধতি, নিজে করণীয় এবং অটোমেটিক কুরআন তিলাওয়াত (প্লাগ-ইন কুরআন) ব্যবহারের বিধান জানতে চাওয়া হয়েছে।
১. প্রথম কথা: তাকদীর ও পরীক্ষার প্রতি ধৈর্য
মুসলিম হিসেবে আমাদের বিশ্বাস, বিপদ-আপদ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই আসে—তা পরীক্ষা হিসেবে, গুনাহের কাফফারা হিসেবে কিংবা দুনিয়ার পরীক্ষা হিসেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ “আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা। আর সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদেরকে।” (সূরা বাকারা: ১৫৫)
তাই প্রথম করণীয় হলো—ধৈর্য ধারণ, তাওবা-ইস্তিগফার, এবং আল্লাহর উপর ভরসা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ “মুসলিমকে যে কষ্ট, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা গ্লানি পৌঁছে—এমনকি একটি কাঁটা ফুটলেও—আল্লাহ তা দ্বারা তার গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন।” (সহীহ বুখারী: ৫৬৪১; সহীহ মুসলিম: ২৫৭৩)
২. রুকাইয়া সার্ভিস সম্পর্কে
আমাদের (দারুল ইফতার অনলাইন প্ল্যাটফর্মের) সরাসরি কোনো রুকাইয়া সার্ভিস নেই। তবে শরীয়তসম্মত রুকাইয়া করা জায়েয ও সুন্নতসম্মত—শর্ত হলো তা কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক হতে হবে, শিরকি বা বেদআতি পদ্ধতিমুক্ত হতে হবে।
রুকাইয়া কোথা থেকে করাবেন:
- নির্ভরযোগ্য, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারী, শরীয়ত মান্যকারী আলিম/হাফেজ/রাকীদের কাছে করাবেন।
- যারা কুরআন-সুন্নাহর নির্দিষ্ট দোয়া-আয়াত পড়ে, শিরকি মন্ত্র, অশ্লীল বা বোধগম্য নয় এমন বাক্য ব্যবহার করে না, তাদের কাছে।
- যারা জিন-শয়তানের নামে কুরবানি, মুরগি-ছাগল দাবি করে, কবর-মাজার কেন্দ্রিক পদ্ধতি অবলম্বন করে, বা অশ্লীল/নাজায়েয কাজ করতে বলে—তাদের থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন। এসব হারাম ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
শরীয়তসম্মত রুকাইয়ার ভিত্তি: জিবরীল আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে রুকাইয়া করেছিলেন:
بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ “আল্লাহর নামে আমি তোমাকে ঝাড়ছি—প্রতিটি কষ্টদায়ক বস্তু থেকে, প্রতিটি অনিষ্টকারী আত্মা ও হিংসুকের চোখ থেকে। আল্লাহ তোমাকে শিফা দান করুন।” (সহীহ মুসলিম: ২১৮৬)
৩. নিজেরা যা করতে পারবেন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)
রুকাইয়ার সবচেয়ে বড় ও কার্যকর অংশ হলো নিজের আমল। নিম্নলিখিত আমলগুলো নিয়মিত করুন:
(ক) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করা — এটি সবচেয়ে বড় হেফাজত। নামাজ ত্যাগ করা বরকত নষ্ট করে, শয়তানের দরজা খুলে দেয়।
(খ) সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন আযকার — বিশেষত:
- আয়াতুল কুরসী (প্রতিটি ফরজ নামাজের পর ও ঘুমানোর আগে)
- সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস (সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমানোর আগে ৩ বার)
- “بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ” (সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার) — যে পড়বে তাকে কিছুই ক্ষতি করবে না (তিরমিযী: ৩৩৮৮, আবু দাউদ: ৫০৮৮)
- “أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ” (সন্ধ্যায় ৩ বার)
(গ) সূরা বাকারা বাসায় নিয়মিত পড়া বা চালানো — রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ “তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিয়ে ফেলো না। নিশ্চয়ই শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায়, যেখানে সূরা বাকারা পড়া হয়।” (সহীহ মুসলিম: ৭৮০)
(ঘ) নিয়মিত সদকা করা — সদকা বালা-মুসিবত দূর করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “সদকা দিয়ে তোমরা রোগীদের চিকিৎসা করো।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩১০৫—যঈফ, তবে সদকার ফজিলত সহীহ হাদীসে প্রমাণিত)
(ঙ) তাওবা-ইস্তিগফার ও হালাল উপার্জন — গুনাহ ও হারাম উপার্জন বরকত নষ্ট করে, বালা ডেকে আনে।
(চ) চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাহায্য নেওয়া — অসুস্থতার ক্ষেত্রে ডাক্তারি চিকিৎসা নেওয়া সুন্নতসম্মত; রুকাইয়ার সাথে চিকিৎসার কোনো বিরোধ নেই।
(ছ) হিংসা-বিদ্বেষ ও গীবত থেকে বিরত থাকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা।
৪. অটোমেটিক কুরআন তিলাওয়াত (প্লাগ-ইন কুরআন) ব্যবহারের বিধান
এ বিষয়ে কয়েকটি দিক লক্ষণীয়:
(ক) উপকারিতা: ঘরে কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ বরকত আনে, শয়তান দূরে সরে, ফেরেশতা উপস্থিত হয়। হাদীসে এসেছে, যে ঘরে কুরআন পড়া হয় সে ঘর শয়তান থেকে নিরাপদ (সহীহ মুসলিম: ৭৮০)। তাই যন্ত্রের মাধ্যমে হলেও কুরআন তিলাওয়াত চালানো নিঃসন্দেহে কল্যাণকর ও বরকতময়।
(খ) তবে সতর্কতা: কুরআন তিলাওয়াতকে শুধু “যন্ত্রের মন্ত্র” বা “তাবিজের বিকল্প” মনে করা যাবে না; বরং এটি ইবাদত ও বরকতের মাধ্যম। মূল ভরসা আল্লাহর উপর রাখতে হবে, যন্ত্রের উপর নয়।
(গ) তিলাওয়াত চলাকালীন অন্য কাজ: কুরআন তিলাওয়াত চলাকালীন ঘরের স্বাভাবিক কাজকর্ম (রান্না, গৃহস্থালি, পড়াশোনা ইত্যাদি) করা জায়েয। তবে আদব হলো—
- তিলাওয়াতের প্রতি সম্মান রক্ষা করা
- উচ্চৈঃস্বরে অশ্লীল বা অর্থহীন কথা বলা, গান-বাজনা বা কুরআনের আওয়াজের সাথে সাংঘর্ষিক কাজ পরিহার করা,
সারকথা: চুপ করে বসে থাকা বাধ্যতামূলক নয়; তবে সম্মান ও আদব রক্ষা করে স্বাভাবিক কাজ করা যাবে।
৫. উপসংহার ও পরামর্শ
- প্রথমে ধৈর্য, তাওবা ও নামাজ-আযকারে ফিরে আসুন—এটাই সবচেয়ে বড় হেফাজত।
- নির্ভরযোগ্য, শরীয়ত মান্যকারী রাকীর কাছে রুকাইয়া করান; শিরকি-বেদআতি পদ্ধতি থেকে দূরে থাকুন।
- নিজে নিয়মিত সকাল-সন্ধ্যার আযকার, আয়াতুল কুরসী, সূরা বাকারা ও তিন কুল পড়ুন; সদকা করুন।
- অটোমেটিক কুরআন তিলাওয়াত চালানো কল্যাণকর, তবে যন্ত্রের উপর ভরসা নয়—আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন। তিলাওয়াত চলাকালীন স্বাভাবিক কাজ করা যাবে, তবে আদব রক্ষা করুন।
- চিকিৎসার প্রয়োজনে ডাক্তারি চিকিৎসাও চালিয়ে যান।
আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারকে সব ধরনের বালা-মুসিবত, জাদু ও অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন এবং সুস্থতা ও বরকত দান করুন। আমীন।
তথ্যসূত্র (হানাফি কিতাব):
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৬, “الرقى والتمائم” অধ্যায়
- ফাতাওয়া আলমগিরি, “الكراهية” অধ্যায়—তামিমা ও রুকাইয়া প্রসঙ্গ
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), খণ্ড ৪—রুকাইয়া ও তাবিজ সংক্রান্ত
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), খণ্ড ২—রুকাইয়া ও জাদু প্রসঙ্গ
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি), সূরা বাকারা ১৫৫ ও সূরা আরাফ ২০৪-এর তাফসীর
- সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিযী