শিশু মারা গেলে শহীদ বলা যাবে কি
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
সংক্ষিপ্ত সারমর্ম
১. নাবালেগ (অপ্রাপ্তবয়স্ক) শিশু মারা গেলে সে জান্নাতে যাবে — এটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকীদা। তবে তাকে কুরআন-হাদীসের পরিভাষায় "শহীদ" বলা যায় না; বরং সে জান্নাতী ও আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত।
২. শিশুর মৃত্যু পিতা-মাতার জন্য জান্নাতে সুপারিশকারী ও নাজাতের মাধ্যম হতে পারে — এটা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, তবে এটা কোনো "স্বয়ংক্রিয় গ্যারান্টি" নয়; পিতা-মাতাকে ইসলামের উপর অটল থাকতে হবে।
৩. বৃহস্পতিবার রাতে বা শুক্রবারে মৃত্যু হলে "কোন হিসাব হবে না" — এমন ধারণা ভিত্তিহীন। হিসাব-নিকাশ আমল অনুযায়ী হবে, দিন-রাত অনুযায়ী নয়।
বিস্তারিত আলোচনা
১. নাবালেগ শিশুর জান্নাতে যাওয়া
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো, মুসলিম নাবালেগ শিশু মারা গেলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী মুশরিকদের নাবালেগ সন্তানদের ব্যাপারেও মত হলো তারা জান্নাতে থাকবে (তবে এ মাসআলায় কিছু تفصيل আছে)।
দলীল:
-
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা বলেন, শিশুদের ব্যাপারে তিনি বলবেন: "আমি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করালাম" — (মুসলিম, কিতাবুল জান্নাহ, হাদীস নং ২৮০৭-এর অধ্যায়ভুক্ত বর্ণনা)।
-
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাত (ইসলাম)-এর উপর জন্মগ্রহণ করে — (বুখারী ১৩৮৫, মুসলিম ২৬৫৮)। সুতরাং নাবালেগ অবস্থায় মৃত্যু হলে সে ফিতরাতের উপরই মৃত্যুবরণ করল।
-
ইমাম তহাবী (রহ.) "আল-আকীদা আত-তহাবিয়্যাহ"-তে বলেন: "আর জান্নাত ও জাহান্নামের ব্যাপারে আমরা তাদের (শিশুদের) ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত টানব না, বরং আমরা বলব: আল্লাহ তাআলা তাদের ব্যাপারে যা ইচ্ছা করেন।" তবে জমহুরের মতে মুসলিম শিশুরা জান্নাতে যাবে — এটাই প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য মত।
ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ (কিতাবুল জানাইয, জান্নাত-জাহান্নাম অধ্যায়) উল্লেখ করেছেন যে, নাবালেগ শিশুর জানাযা পড়া হয় এবং তার জন্য দুআ করা হয়, আর সে জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত।
২. "শহীদ" বলা যাবে কি?
কুরআন-হাদীসের পরিভাষায় "শহীদ" (শাহাদাত)-এর বিশেষ মর্যাদা ও أحكام রয়েছে — যেমন জানাযা না পড়া, গোসল না দেওয়া ইত্যাদি। নাবালেগ শিশুর মৃত্যুতে এসব أحكام প্রযোজ্য নয়; তার জানাযা পড়া হয়, গোসল দেওয়া হয়, কাফন দেওয়া হয়।
তবে হাদীসে কিছু মৃত্যুকে "শাহাদাত"-এর সাথে তুলনা করা হয়েছে (যেমন মহামারীতে মৃত্যু, ডুবে মৃত্যু, আগুনে মৃত্যু, ধসে পড়ে মৃত্যু ইত্যাদি) — এগুলোকে "শহীদে আখিরাত" বলা হয়, যাদের আখিরাতে শহীদের সওয়াব পাওয়ার আশা আছে, কিন্তু দুনিয়ার আহকামে সাধারণ মৃতের মতোই। কিন্তু নাবালেগ শিশুর ক্ষেত্রে "শহীদ" শব্দ ব্যবহার করা শরীয়তের পরিভাষায় সঠিক নয়; বরং বলা যাবে সে জান্নাতী, আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত।
ইমাম তহাবী (রহ.) ও ইবনে আবিদীন (রহ.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী নাবালেগের জানাযা ও দাফন সাধারণ নিয়মেই হবে।
৩. শিশু পিতা-মাতার নাজাতের উসিলা — হাদীসের ভিত্তি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যখন কোনো মুসলিমের তিনটি সন্তান মারা যায়, যারা বালেগ হয়নি, তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তাঁর রহমতের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।" — (বুখারী, কিতাবুল জানাইয, হাদীস ১২৪৮-এর অধ্যায়; মুসলিম ২৬৩২)
অন্য হাদীসে:
"যে ব্যক্তির দুটি সন্তান মারা গেছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" — (মুসলিম ২৬৩২)
আরও বর্ণনায় এসেছে, কিয়ামতের দিন শিশুরা তাদের পিতা-মাতার জন্য সুপারিশ করবে এবং তাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে আবেদন করবে — (মুসলিম ২৬৩৫-এর অধ্যায়ভুক্ত বর্ণনা)।
তবে সতর্কতা: এই ফযীলত সেই পিতা-মাতার জন্য যারা ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট থাকে এবং ইসলামের উপর অটল থাকে। হাদীসে "ইহতিসাব" (আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা করা) শর্ত করা হয়েছে। তাই এটি কোনো "স্বয়ংক্রিয় নাজাতের গ্যারান্টি" নয়; বরং উসিলা ও সুপারিশের মাধ্যম।
৪. পিতা-মাতার করণীয়
১. ধৈর্য (সবর) ও ইহতিসাব: আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা এবং সওয়াবের আশা করা। রাসূল ﷺ বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দার জান-মাল ও সন্তানের مصيبة-তে ধৈর্য ধারণের বিনিময়ে জান্নাত দান করবেন" — (বুখারী ৬৪২৪)।
২. সদকা ও খায়রাত: শিশুর নামে সদকা করা, পানি সরবরাহ করা, দান-খায়রাত করা — এগুলো জায়েয ও মুস্তাহাব। তবে "কুরআন খতম" বা বিশেষ কোনো রীতি শরীয়তে প্রমাণিত নয়; সাধারণ দুআ ও সদকাই যথেষ্ট।
৩. শোক প্রকাশের নিয়ম: ইসলামে তিন দিন পর্যন্ত শোক প্রকাশের অনুমতি আছে (মহিলাদের জন্য), তবে বিলাপ, চিৎকার, বুক চাপড়ানো নিষিদ্ধ। রাসূল ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি চিৎকার করে, গাল চাপড়ায়, কাপড় ছিঁড়ে — সে আমাদের দলভুক্ত নয়" — (বুখারী ১২৯৪, মুসলিম ১০৩)।
৪. শিশুর জানাযা ও দাফন: শরীয়ত অনুযায়ী গোসল, কাফন, জানাযা ও দাফন সম্পন্ন করতে হবে — এটা ফরজে কিফায়া।
৫. বৃহস্পতিবার রাতে বা শুক্রবারে মৃত্যু — "হিসাব হবে না" ধারণা
এই ধারণা ভিত্তিহীন। কুরআন-হাদীসে কোথাও বলা হয়নি যে শুক্রবারে বা বৃহস্পতিবার রাতে মৃত্যু হলে হিসাব হবে না।
দলীল:
-
আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমাদের প্রত্যেকের উপর আমল অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া হবে" — (সূরা নাহল: ১১১; সূরা মুমিনুন: ১০১-১০২)।
-
রাসূল ﷺ বলেছেন: "প্রত্যেক ব্যক্তির আমল তার সাথে থাকবে, আর কিয়ামতের দিন তাকে তার আমল দেখানো হবে" — (বুখারী ৬৪৯৯)।
-
শুক্রবারের ফযীলত সম্পর্কে হাদীসে এসেছে: "শুক্রবারে যে ব্যক্তি মারা যায়, আল্লাহ তাআলা তাকে কবরের আজাব থেকে রক্ষা করবেন" — (তিরমিযী ১০৭৪, ইবনে মাজাহ ১৬৩৪)। তবে এই হাদীসটি দুর্বল (য'ঈফ) হিসেবে চিহ্নিত — ইমাম তিরমিযী (রহ.) নিজেই বলেছেন এটি غريب, এবং মুহাদ্দিসগণ এর সনদকে দুর্বল বলেছেন। তাছাড়া এখানেও "হিসাব হবে না" বলা হয়নি; বরং কবরের আজাব থেকে রক্ষার কথা বলা হয়েছে।
| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | শিশু জান্নাতে যাবে কি? | হ্যাঁ, মুসলিম নাবালেগ শিশু জান্নাতে যাবে — জমহুরের মত | | শহীদ বলা যাবে? | শরীয়তের পরিভাষায় না; বলা যাবে "জান্নাতী" | | পিতা-মাতার নাজাতের উসিলা? | হ্যাঁ, হাদীস দ্বারা প্রমাণিত — তবে সবর ও ইহতিসাবের শর্তে | | পিতা-মাতার করণীয়? | সবর, দুআ, সদকা, জানাযা-দাফন সম্পন্ন করা, বিলাপ বর্জন | | বৃহস্পতিবার রাত/শুক্রবারে মৃত্যুতে হিসাব হবে না? | সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন; আমল অনুযায়ী হিসাব হবে |
তথ্যসূত্র
- আল-কুরআন: সূরা নাহল ১১১; সূরা মুমিনুন ১০১-১০২
- সহীহ বুখারী: ১২৯৪, ১৩৮৫, ৬৪২৪, ৬৪৯৯
- সহীহ মুসলিম: ১০৩, ২৬৩২, ২৬৩৫, ২৬৫৮, ২৮০৭
- সুনানে তিরমিযী: ১০৭৪ (দুর্বল)
- সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৩৪ (দুর্বল)
- আল-আকীদা আত-তহাবিয়্যাহ — ইমাম তহাবী (রহ.)
- রাদ্দুল মুহতার — ইবনে আবিদীন শামী (রহ.), কিতাবুল জানাইয
- ইমদাদুল ফাতাওয়া — মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.)
- ফাতাওয়া উসমানী — মুফতি তাকী উসমানী (রহ.)
- মাআরিফুল কুরআন — মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.)
- ফাতাওয়া আলমগীরী, কিতাবুল জানাইয