আন-অফিসিয়াল ফোন কেনা জায়েজ হবে কি না?
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
আনঅফিসিয়াল (ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া) ফোন কেনা ও ব্যবহারের হুকুম
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, এটি হারাম নয় — বরং এ ধরনের ফোন কেনা-বেচা ও ব্যবহার করা ইসলামে নিষিদ্ধ (হারাম) বা অন্ততপক্ষে সন্দেহজনক (মাকরূহ) কাজ। কারণ এতে স্পষ্টভাবে ট্যাক্স ফাঁকি (কর চুরি) জড়িত, যা রাষ্ট্রের সাথে করা প্রতারণা ও আমানতের খিয়ানত। আর ইসলামে প্রতারণা ও চুরি উভয়ই হারাম।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে: যে ফোন ইতিমধ্যে কিনে ফেলা হয়েছে এবং যার মাধ্যমে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া হয়েছে — সেটি ব্যবহার করা কি হারাম? এখানে ফকীহদের মধ্যে বিশ্লেষণ রয়েছে, যা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো।
১. মূলনীতি: ট্যাক্স ফাঁকি = চুরি ও প্রতারণা
কুরআন
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর; আর তোমরা জেনে-বুঝে আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করো না।" — (সূরা আল-আনফাল: ৪৬)
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমানতসমূহ তার যোগ্য ব্যক্তিদের কাছে প্রত্যর্পণ করার নির্দেশ দেন; আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়ের সাথে বিচার করবে।" — (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না..." — (সূরা আন-নিসা: ২৯)
হাদীস
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" — (সহীহ মুসলিম: ১০১)
"যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" — (সুনান আবু দাউদ: ৩৪৫২, শায়খ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন)
"প্রতিটি মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের রক্ত, সম্মান ও সম্পদ হারাম।" — (সহীহ মুসলিম: ২৫৬৪)
ফকীহদের বক্তব্য
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"রাষ্ট্রের সম্পদ (বাইতুল মাল) মুসলিমদের সাধারণ সম্পদ; এটি চুরি করা বা তাতে খিয়ানত করা অন্যের সম্পদ চুরির মতোই হারাম।" — (মাজমূ' আল-ফাতাওয়া, ২৮/২৩০-এর কাছাকাছি)
শায়খ ইবন উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"সরকারের আরোপিত কর (ট্যাক্স) যদি ন্যায়সঙ্গত হয়, তবে তা ফাঁকি দেওয়া প্রতারণা ও খিয়ানত। আর যদি তা যুলুম হয়, তবুও মুসলিমকে প্রতারণার পথ নেওয়া উচিত নয়; বরং বৈধ উপায়ে প্রতিকার চাইতে হবে।" — (ফাতাওয়া নূরুন 'আলাদ-দারব, ট্যাক্স সংক্রান্ত ফাতাওয়া)
শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:
"মুসলিমের জন্য ওয়াজিব হলো রাষ্ট্রের আইন মেনে চলা, যতক্ষণ তা আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ না দেয়। কর ফাঁকি দেওয়া প্রতারণা, আর প্রতারণা হারাম।" — (আল-মুনতাক্বা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান)
২. "সরকার জানে এবং ওপেনলি বিক্রি হয়" — এই যুক্তির বিশ্লেষণ
প্রশ্নে বলা হয়েছে: সরকার এসব ফোন সম্পর্কে অবগত এবং ওপেনলি মার্কেটে বিক্রি হয়, তাই সমস্যা নেই। এই যুক্তি ইসলামী দৃষ্টিতে দুর্বল। কারণ:
-
রাষ্ট্রের সহনশীলতা (tolerance) বৈধতা দেয় না। কোনো কিছু ওপেনলি বিক্রি হওয়া মানে এই নয় যে তা শরীয়তসম্মত। মদও কিছু দেশে ওপেনলি বিক্রি হয়, কিন্তু তা হারাম।
-
সরকার ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ব্লক করার ঘোষণা দিয়েছে — এর অর্থ হলো সরকার এটিকে অবৈধ/অননুমোদিত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সুতরাং এখন কেনা মানে জেনে-বুঝে একটি অননুমোদিত পণ্য কেনা, যা কর ফাঁকির মাধ্যম।
-
আসিম আল হাকিমের বক্তব্য — তিনি কোনো প্রমাণিত ইসলামী ফকীহ নন; তাঁর বক্তব্য শরীয়তের দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামে ফতোয়া গ্রহণ করতে হয় কুরআন, সুন্নাহ ও প্রমাণিত উলামাদের থেকে, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মত থেকে নয়।
৩. এখন (১ জানুয়ারির আগে) কেনা কি হারাম?
এখানে দুটি দিক আলাদা করতে হবে:
(ক) ফোন কেনার কাজটি
যদি ফোনটি ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা হয় এবং আপনি তা জেনে-বুঝে কেনেন, তবে কেনার কাজটি প্রতারণায় সহযোগিতা, যা কুরআনের এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত:
"তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না; বরং নেকী ও তাকওয়ায় সহযোগিতা করো।" — (সূরা আল-মায়িদাহ: ২)
সুতরাং নতুন করে কেনা থেকে বিরত থাকাই তাকওয়ার দাবি।
(খ) ইতিমধ্যে কেনা ফোন ব্যবহার করা
যদি কেউ ইতিমধ্যে কিনে ফেলে থাকেন (অথবা উপহার পেয়েছেন), তবে সেই ফোন ব্যবহার করা — এখানে ফকীহদের মত হলো:
-
শায়খ ইবন উসাইমীন ও শায়খ আল-ফাওযান-এর নীতি অনুযায়ী: হারাম উপায়ে অর্জিত বস্তু যদি ইতিমধ্যে আপনার মালিকানায় আসে এবং তা ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে তা ব্যবহার করা জায়েয হতে পারে, তবে পুনরায় কেনা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। (তবে এটি একটি সূক্ষ্ম মাসআলা; সর্বোত্তম হলো সন্দেহ থেকে দূরে থাকা।)
-
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে, তা ছেড়ে দাও এবং যা সন্দেহমুক্ত তা গ্রহণ কর।" — (সুনান তিরমিযী: ২৫১৮, শায়খ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন)
৪. "সবার জন্য ন্যায্য নয়" — এই অভিযোগের জবাব
আপনার অভিযোগ বৈধ যে নীতিটি সবার জন্য সমান সুবিধাজনক নয়। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে:
-
যুলুমের জবাবে যুলুম করা জায়েয নয়। রাষ্ট্রের নীতি অন্যায় হলেও ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে তার প্রতিকার করা যায় না।
-
মুসলিমকে ধৈর্য ও বৈধ প্রতিকারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন: "হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও।" — (সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৩)
-
প্রয়োজনে সাশ্রয়ী/সস্তা অফিসিয়াল ফোন কেনা, অথবা বাজেট পরিকল্পনা করা — এটাই তাকওয়ার পথ।
৫. উপসংহার ও ব্যবহারিক নির্দেশনা
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | জেনে-বুঝে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া আনঅফিসিয়াল ফোন নতুন করে কেনা | হারাম বা অন্ততপক্ষে মাকরূহ তাহরীমী (প্রতারণায় সহযোগিতা) | | ইতিমধ্যে কেনা ফোন ব্যবহার করা | জায়েয, তবে পুনরায় কেনা থেকে বিরত থাকা উত্তম | | আনঅফিসিয়াল ফোন বিক্রি করা | প্রতারণায় সহযোগিতা হওয়ায় নিষিদ্ধ | | অফিসিয়াল ফোন কেনা | জায়েয ও নিরাপদ |
সর্বোত্তম পথ: আল্লাহর ভয় রাখুন, সন্দেহ থেকে দূরে থাকুন। অফিসিয়াল ফোন কেনার সামর্থ্য না থাকলে সাশ্রয়ী মডেল বেছে নিন, অথবা সঞ্চয় করুন। আল্লাহ বলেন:
"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" — (সূরা আত-তালাক: ২)
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।