রিসেলিং বা ড্রপশিপিং ব্যবসা ইসলামে হালাল না হারাম?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 8027
Questioner: Rabeya Mim
Question Asked: 05 Nov 2026, 11:35 PM
Reviewed & Published: 05 Nov 2026, 11:59 PM
Views: 53
Tokens: 4,992
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একটা বিজনেস করতে চাচ্ছি! তবে হাতে এখন মজুদ অর্থনেই!
ড্রপশিপিং বা রিসেলিং যেখানে আমি ওদের ওয়েব সাইট থেকে পন্যর ছবি নিয়ে নিজের পেইজে দিব(নিজের পছন্দমত দাম দিয়ে, যেমন ওরা একটা পন্য ১০ রাখলে আমি ১৫/২০ পছন্দানুযায়ী লাভ করব)!তারপর অর্ডার আসলে ওদের দিব, ওরা প্যাকেজিং, ডেলিভারি সব করবে! আর প্রডাক্ট বাড়তি যে টাকায় বিক্রি করেছি তা আমাকে লাভ হিসেবে দিবে!
এটা কি জায়েজ?

Answer

রিসেলিং/ড্রপশিপিং হালাল না হারাম? — বিস্তারিত ফিকহি বিশ্লেষণ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

আপনার বর্ণিত ব্যবসায়ের পদ্ধতিটিকে আধুনিক ব্যবসায়ের পরিভাষায় ড্রপশিপিং (Dropshipping) বা রিসেলিং (Reselling) বলা হয়।

ফিকহে হানাফী ও আধুনিক ফিকহী গবেষণার প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ আপনার প্রশ্নটির সুনির্দিষ্ট শরঈ ফয়সালা ও হালাল করার সহজ উপায় নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:


১. মূল শরঈ সিদ্ধান্ত (সংক্ষেপে):

আপনি যদি সরাসরি মূল কোম্পানির 'অফিশিয়াল এজেন্ট/রিসেলার' (উকিল - وكيل / দালাল - سمسار) হিসেবে তাদের অনুমতি নিয়ে তাদের পণ্য নিজের পেজে প্রদর্শন করেন এবং তাদের সাথে চুক্তি অনুযায়ী বাড়তি দাম লাভ হিসেবে গ্রহণ করেন, তবে এই ড্রপশিপিং/রিসেলিং ব্যবসা করা শরীআতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে হালাল ও জায়েয।

তবে যদি কোম্পানির সাথে আপনার কোনো প্রতিনিধিত্ব বা বিক্রয়ের আগাম চুক্তি না থাকে এবং পণ্য নিজের মালিকানা বা কবজায় (Possession) না এনেই নিজের নামে সরাসরি কেনাবেচা করেন, তবে তা নাজায়েয হবে।


২. ফিকহী ব্যাখ্যা ও প্রামাণ্য দলীলাদি:

ক. কেন সরাসরি বিক্রি করলে সমস্যা হতে পারে?

ইসলামী শরীআতে ক্রয়-বিক্রয় সহীহ হওয়ার একটি মৌলিক শর্ত হলো—পণ্য নিজের মালিকানায় থাকা কিংবা নিজের আয়ত্তে/কবজায় (Qabd) থাকা। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

«لاَ تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ» (অর্থ: "তোমার কাছে যা (মালিকানায় বা কবজায়) নেই, তা বিক্রি করো না।") (সুনানে তিরমিযী, মুসনাদে আহমাদ; দরসুল ফিকহ ২/২৪৬)।

সুতরাং আপনি যদি পণ্যটি না কিনে বা কোম্পানির সাথে কোনো প্রতিনিধিত্বের চুক্তি না করেই সরাসরি ক্রেতার কাছে মূল বিক্রেতা সেজে বিক্রি করে দেন, তবে তা শরীআতে নিষিদ্ধ 'মা লাইসা ইন্দাক' (মালিকানাহীন বিক্রি)-এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।

খ. শরীআতসম্মত হালাল উপায়ের রূপরেখা (ওকালাত ও সামসারাহ):

আপনার বর্ণিত পদ্ধতিটিকে ফিকহের পরিভাষায় 'ওকালাত বি আল-আজর' (وکالة بأجر - কমিশন/পারিশ্রমিকের বিনিময়ে প্রতিনিধিত্ব) অথবা 'সামসারাহ' (سمسرة - দালালি বা ব্রোকারেজ) বলা হয়।

১. কোম্পানির সাথে প্রতিনিধিত্বের চুক্তি: আপনি যখন ঐ ওয়েবসাইট বা কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হবেন বা তাদের ওয়েবসাইটে 'রিসেলার/ড্রপশিপার' হিসেবে রেজিস্টার্ড হবেন, তখন শরীআতের বিচারে আপনি উক্ত কোম্পানির 'উকিল' বা 'অফিশিয়াল প্রতিনিধি' হিসেবে গণ্য হবেন। ২. অতিরিক্ত দাম লাভ হিসেবে নেওয়া: মূল কোম্পানি আপনাকে পণ্যটি তাদের নির্ধারিত পাইকারি দামে (যেমন: ১০ টাকায়) বিক্রির অধিকার দিচ্ছে এবং আপনাকে স্বাধীনতা দিচ্ছে যে আপনি এর চেয়ে বেশি দামে (যেমন: ১৫ বা ২০ টাকায়) বিক্রি করে বাড়তি টাকা লাভ হিসেবে রেখে দিতে পারবেন। ৩. ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ফতোয়া ও সাহাবাদের আমল: ইমাম বুখারী (রহ.) স্বীয় হাদীস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ও তাবেঈ ইবনে সীরীন (রহ.) এ ধরনের বেচাকেনাকে সম্পূর্ণ হালাল ঘোষণা করে বলেছেন:

«لاَ بَأْسَ أَنْ يَقُولَ: بَعْ هَذَا الثَّوْبَ فَمَا زَادَ عَلَى كَذَا وَكَذَا فَهُوَ لَكَ» (অর্থ: "পণ্যদাতা যদি প্রতিনিধিকে বলে—'তুমি এই কাপড়টি এই নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রি করো, এর চেয়ে অতিরিক্ত যত দামে বিক্রি করতে পারবে তা তোমার'—তবে এতে কোনো শরঈ বাধা নেই; তা সম্পূর্ণ জায়েয।") (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইজারা, বাব আজরিস সামসারাহ; বুহুস ফি কাযায়া ফিকহিয়্যাহ ২/২৬৭)।


৩. ব্যবসাটি হালালভাবে পরিচালনা করার আবশ্যকীয় শর্তাবলী:

১. কোম্পানির স্পষ্ট অনুমতি: ওয়েবসাইট বা মূল কোম্পানির রিসেলিং বা ড্রপশিপিংয়ের স্পষ্ট অনুমতি থাকতে হবে। ২. পণ্যের সঠিক বিবরণ: পেজে ছবি দেওয়ার সময় পণ্যের আসল কোয়ালিটি, সাইজ ও ফেব্রিক সম্পর্কে সত্য তথ্য দিতে হবে; কোনো প্রতারণা বা ধোঁকাবাজির আশ্রয় নেওয়া যাবে না। ৩. সচ্ছল ডেলিভারি ও দায়িত্ব: ডেলিভারি ও প্যাকেজিং কোম্পানি করবে—এতে কোনো বাধা নেই; তবে ডেলিভারিতে পণ্য নষ্ট হলে বা ভুল পণ্য গেলে তা ফেরত নেওয়ার দায়ভার কোম্পানিকে বহন করতে হবে।


সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):

  • বুহুস ফি কাযায়া ফিকহিয়্যাহ মুয়াসারা (২য় খণ্ড):

    • পৃষ্ঠা: ২৬৭, ২৬৮, ২৬৯ (বুহুস ফি কাযায়া ২/২৬৭-২৬৯) (অধ্যায়: 'أجرة السمسار — সামসারাহ বা ব্রোকারেজ, এজেন্টের মাধ্যমে নির্দিষ্ট মূল্যের অতিরিক্ত লাভ গ্রহণ করা সংক্রান্ত হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর হাদীস ও ফতোয়া')।
    • পৃষ্ঠা: ২৭০, ২৭১ (বুহুস ফি কাযায়া ২/২৭০, ২৭১) (অধ্যায়: 'بيع ما ليس عندك — মালিকানাহীন বস্তু সরাসরি বিক্রি না করার শরঈ বিধান') ।
  • দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):

    • পৃষ্ঠা: ২১৯, ২২০ (দরসুল ফিকহ ২/২১৯, ২২০) (অধ্যায়: 'ফরেক্স ও ব্রোকারেজ — দালালি, সামসারাহ (السمسرة) ও এজেন্টের কাজ করার ফিকহী রূপরেখা')।
    • পৃষ্ঠা: ২৪৫, ২৪৬, ২৪৭ (দরসুল ফিকহ ২/২৪৫-২৪৭) (অধ্যায়: 'কবযা ও হস্তগত করার আগে বিক্রয়ের নিষেধাজ্ঞা — بيع ما ليس عندك এবং الخراج بالضمان মূলনীতি')।
  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৬ষ্ঠ খণ্ড - বাংলা সংস্করণ):

    • পৃষ্ঠা: ১৭, ১৮, ৩৫ (হিন্দিয়াহ ৩/৫৬৭, ৪/৪৩) (অধ্যায়: কিতাবুল ওকালাত, ৩য় পরিচ্ছেদ: বিক্রয়ের জন্য উকিল নিয়োগ — 'ওয়াকীল বা এজেন্টের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করা এবং লাভ গ্রহণ করার শরঈ মাসআলা')।
    • পৃষ্ঠা: ৩৬, ৩৭ (হিন্দিয়াহ ৪/৪৪) (অধ্যায়: কিতাবুল ওকালাত — 'মুআক্কিল বা কোম্পানির অনুমতিতে এজেন্টের অতিরিক্ত দামে বিক্রি করে লাভ রাখার বৈধতা')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৬শ খণ্ড):

    • পৃষ্ঠা: ৯৩, ৯৪ (মাহমুদিয়া ১৬/৯৩, ৯৪) (অধ্যায়: কিতাবুল বিয়ূ, বাবুল বিয়ূই বাক্বলা আল-ক্বাবদ্ব — 'মালিকানাহীন মাল নিজের কবজায় আসার পূর্বে বিক্রি করার নিষেধাজ্ঞা ও এজেন্সির ফতোয়া')।
    • পৃষ্ঠা: ১৮২ (মাহমুদিয়া ১৬/১৮২) (অধ্যায়: বাবুল হুকূকুল মুজাররাদা — 'কমিশন ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে উপার্জনের ফিকহী হুকুম')।

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.