কোনো কাপড়ে নাপাকি লেগেছে কিনা সন্দেহ হলে তা কি নাপাক?
Taharah Purity · Hanafi
Question
আমাদের বাসায় একজন আছে পাক-নাপাক মানেনা তেমন। পাক থেকে করতে হয় এমন কাজ তাকে কখনো সরাসরি নাপাক অবস্থায় করতে দেখিনি, কিন্তু তার কাজ দেখেছি যেমন কুলি করে মগের ভেতরে পানি ফেলা, কাপড় বালতিতে ভিজিয়ে রেখে আসা(পরে শাওয়ার দিয়ে কেউ গোসল করলে নাপাক পানির ছিটা ওই বালতিতে পড়তে পারে) পরে ওই কাপড় একদিন পরে মাত্র একবারই ধোয়া, বাথরুম থেকে আসার পরে পায়ের নিচে প্রস্রাব/পানির ছিটা থাকা, ওজু করে খালি পায়ে মেঝে দিয়ে হেঁটে আসা(যেটায় নাপাক ভেজা পানি পড়ে থাকে)।
আমাদের সবার কাপড় একটা দড়িতেই টানানো হয়, তাই আমি ওই দড়ির একটা অংশ আলাদা করে আমার জন্য রেখেছিলাম৷ একদিন আমার ভেজা কাপড়(নিংড়ালে পানি পড়বে এমন) ভুলে আমার মা ওই জায়গায় নেড়ে ফেলে যেখানে আগে ওই নাপাক না মানা ব্যক্তির কাপড় ছিল(ওই ব্যক্তিও ভালো করে চিপেনা, পানি ঝরতে থাকে নাড়ার পরেও)। আমার ওই কাপড়টা কি নাপাক হয়ে গিয়েছে, এটা পরা যাবে? ঠিক ওইদিন ওই নাপাক না মানা ব্যক্তির কাপড়ে নাপাকি ছিল কীনা বা সেটা দূর করা হয়েছিল কীনা জানিনা। কিন্তু নরমালি সে কখনো করেনা।
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার কাপড় নাপাক হয়নি, বরং তা পাক আছে এবং পরা যাবে। কারণ শরীয়তের একটি মৌলিক নীতি হলো: "নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না" (الیقین لا یزول بالشک)। যেখানে নাপাকি লেগেছে বলে নিশ্চিত প্রমাণ নেই, সেখানে শুধু সম্ভাবনার ভিত্তিতে কাপড়কে নাপাক বলা যাবে না।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. মূল নীতি: সন্দেহে পবিত্রতা বিনষ্ট হয় না
হানাফি ফিকহের সুপ্রতিষ্ঠিত উসুল হলো—কোনো বস্তু মূলত পাক; তাতে নাপাকি লেগেছে বলে ইয়াকিন (নিশ্চিত বিশ্বাস) না হওয়া পর্যন্ত তা পাকই গণ্য হবে। ইবন আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
«الأصل بقاء الطهارة حتى يتيقن حصول النجاسة» "মূল নীতি হলো পবিত্রতা বহাল থাকা, যতক্ষণ না নাপাকি সংঘটিত হওয়া নিশ্চিত হয়।" — (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩১৭; ১/৩৪৫-এর অধ্যায়)
আরেক জায়গায়:
«الیقین لا یزول بالشک» — (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩৩৮)
২. আপনার ঘটনায় প্রয়োগ
আপনি নিজেই বলেছেন—"ওই ব্যক্তির কাপড়ে নাপাকি ছিল কীনা বা সেটা দূর করা হয়েছিল কীনা জানিনা।" যেহেতু নিশ্চিত জানা নেই, তাই আপনার ভেজা কাপড়টি ওই জায়গায় শুকাতে ঝুলানো মাত্র তাকে নাপাক বলা যাবে না। সম্ভাবনা বা ওয়াসওয়াসার ভিত্তিতে কাপড় নাপাক হয় না।
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, কাপড়ে নাপাকি লেগেছে কিনা—এ ব্যাপারে সন্দেহ হলে তা পাক। (আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত; ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৪২)
৩. "নাপাক না মানা ব্যক্তি" সম্পর্কে
কোনো মুসলিমকে তার বাহ্যিক অবস্থার ভিত্তিতে নাপাক বা তার ব্যবহৃত সব কিছু নাপাক ধরে নেওয়া জায়েয নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إنما أنا بشر مثلكم» — (সহিহ মুসলিম)
এবং মুসলিমের মূল অবস্থা পবিত্রতা। শুধু তার অবহেলা বা সন্দেহজনক অভ্যাসের কারণে তার স্পর্শে সব কিছু নাপাক হয়ে যায় না—যতক্ষণ না নাপাকির নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়।
৪. তবে সতর্কতা হিসেবে যা করবেন
যদিও আপনার কাপড় পাক, তবু ভবিষ্যতে ওয়াসওয়াসা এড়াতে:
- আপনার কাপড় আলাদা দড়িতে বা আলাদা স্থানে শুকাতে দিন।
- সন্দেহ হলে কাপড়টি একবার পাক পানিতে ধুয়ে নিলে কোনো ক্ষতি নেই (ঐচ্ছিক সতর্কতা)।
৫. ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে সতর্কতা
শয়তান মানুষের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«دع ما يريبك إلى ما لا يريبك» "যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে তা ছেড়ে যা সন্দেহমুক্ত তার দিকে যাও।" — (তিরমিজি, হাদিস ২৫১৮)
উপসংহার
আপনার কাপড় পাক এবং তা পরিধান করা জায়েয। নাপাকি লেগেছে বলে নিশ্চিত প্রমাণ না থাকায় সন্দেহের ভিত্তিতে কাপড় নাপাক হয় না। ভবিষ্যতে কাপড় আলাদা স্থানে শুকানো এবং সন্দেহ হলে একবার ধুয়ে নেওয়া—এতটুকুই যথেষ্ট।
والله أعلم بالصواب